আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ০২:৪৫ পিএম
বাংলাদেশি শরণার্থীদের নাগরিকত্ব ইস্যুতে মুখ খুলেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। দেশটির প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় এ প্রশ্ন তুলেছেন যে “বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের যখন অনেক বেশি লম্বা সীমান্ত রয়েছে, তাহলে শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য কেন আসামকে বেছে নেওয়া হলো?”
সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ জানতে চেয়েছে, ‘ভারতের নাগরিকত্ব আইনের ৬এ ধারা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আসামে আসা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়া হলেও কেন পশ্চিমবঙ্গে আসা শরণার্থীদের বাদ দেওয়া হলো।’
ভারতের প্রধান বিচারপতি বলেন, “শরণার্থী সমস্যা শুধু সংস্কৃতিতে সঙ্কট আনে না, রাজ্যের সম্পদের ওপরেও চাপ সৃষ্টি করে। কোথাও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে বলে সেখানে এক রকম ব্যবস্থা হয়েছে, অন্য জায়গায় সেই সুবিধা দেওয়া হলো না— এটা মেনে নেওয়া যায় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সবার জন্য সমান অধিকারই হওয়া উচিত।”
আরও পড়ুন: ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে অজানা ভয়ঙ্কর রোগ!
তার মতে, “এমন কোনো তথ্য আছে কি যে, পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশের সংখ্যা নগণ্য তাই আমরা শুধু আসাম নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি? পশ্চিমবঙ্গ কীভাবে অবৈধ শরণার্থীদের সমস্যা সামলাচ্ছে?”
দেশ ভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহু শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় চলে আসেন। কিছু সমীক্ষার হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যাটি এক কোটিরও বেশি। সব চেয়ে বেশি শরণার্থী এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু সকলেই বাংলা ভাষাভাষী হওয়ায় এ দেশে সংস্কৃতির সংঘাতটি অসমিয়া অধ্যুষিত আসামের মতো তীব্র হয়নি। কিন্তু ‘আসাম চুক্তি’-এর পরে আসামে যাওয়া শরণার্থীদের একাংশকে কেন্দ্র নাগরিকত্বের সুবিধা দেওয়ায় প্রশ্ন তুলেন বাংলার শরণার্থীরা। মতুয়া সম্প্রদায় দীর্ঘ দিন ধরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা তাদের সম্প্রদায়ের লোকেদের নাগরিত্বের দাবিতে আন্দোলন করছেন। গোটা পশ্চিমবঙ্গে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) এর বিরুদ্ধে আন্দোলন হলেও মতুয়ারা এই আইনের পক্ষে শুধু পথেই নামেননি, ঢেলে ভোট দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপিকে। তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার দাবির পক্ষে মতুয়ারা বারবার ‘আসাম চুক্তি’ এবং ৬এ ধারার প্রসঙ্গ তুলেছেন।
নাগরিকত্ব আইনের ৬এ ধারার সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে আসামের কিছু সংগঠন যে মামলা করেছে, তার শুনানিতেই প্রসঙ্গক্রমে পশ্চিমবঙ্গের অনুপ্রবেশ পরিস্থিতি উঠে এসেছে সর্বোচ্চ আদালতে। বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় কেন্দ্র কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা-ও সবিস্তার জানতে চেয়েছেন বিচারপতিরা। হলফনামা দিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে এসব তথ্য জানাতে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আজ ছিল মামলার তৃতীয় শুনানি।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সওয়াল করা সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাকে আজ প্রধান বিচারপতি বলেন, নাগরিকত্ব আইনের ৬এ ধারা অনুযায়ী ১৯৬৬-এর ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ পর্যন্ত আসামে অনুপ্রবেশ করা বাংলাদেশিদের নাগরিকত্বের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কতজন এই সুবিধা পেয়েছেন এবং কতজন পাননি, তাদের ক্ষেত্রে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা হলফনামায় জানাতে হবে। ১৯৭১-এর পরে অনুপ্রবেশ পরিস্থিতি কেমন, তা-ও জানাতে হবে। জবাবে মেহতা যুক্তি দেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে অনুপ্রবেশের ফলে আসামিয়া সংস্কৃতি ও ভূমিপুত্রের অধিকার নিয়ে সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ায় আসামে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। সে জন্য কেবল মাত্র আসাম রাজ্যের জন্যই নাগরিকত্ব আইনের ৬এ ধারাটি তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৩-এর পরে সেটি আর কার্যকর নেই। পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তরিত হওয়ার পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে ঘোষণা করেছিলেন, ১৯৭১-এর পরে দেশ ছেড়ে যাওয়া সবাইকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। সেই জন্যই ৬এ ধারায় ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য ১৯৭১-এর ২৫ মার্চকে বেছে নেওয়া হয়, কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ।
প্রধান বিচারপতির মন্তব্য— “আমরা কোনো স্বৈরাচারী দেশে নেই। একটা গণতান্ত্রিক দেশে আইনের শাসন মেনে চলতে হয়। সেটা না হলে বৈধ বাসিন্দাদেরও ধরে দেশের বাইরে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।”
আরও পড়ুন: যেভাবে ভারতে উজবেক নারীদের অনৈতিক কাজে নামানো হয়
আসামে অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পরে ১৯৮৫-তে ভারত সরকার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে হওয়া ‘আসাম চুক্তি’-এর অঙ্গ হিসাবে নাগরিকত্ব আইনের ৬এ ধারা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এই মামলার আবেদনকারীদের বক্তব্য— ‘আসামে চুক্তি’-কে ২৫৩ ধারার অধীনে বৈধতা দেওয়ার জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সংসদ। সুতরাং আসাম চুক্তিরই বৈধতা নেই। শুনানিতে অংশ নিয়ে আবেদনকারীদের আইনজীবী কে এন চৌধুরী বলেন, “দ্বৈত নাগরিকত্ব ভারতে বৈধ নয়। কিন্তু ৬এ ধারায় নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের কেউ তাদের পূর্বতন দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করার মুচলেকা জমা দেননি। সেই অর্থে তারা এখনও দুই দেশের নাগরিক। রাজনৈতিক স্বার্থে করা নাগরিক আইনের বিশেষ এই ৬এ ধারার ফলশ্রুতিতে ভারত সরকার নিজের নাগরিকদের মূল্যে শরণার্থীদের সুরক্ষা দিচ্ছে!”
বুধবার শুনানির দ্বিতীয় দিনে ভারতের প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড় মন্তব্য করেছিলেন, “আসাম আন্দোলনের উত্তাল পরিস্থিতি সামলাতে ও পূর্ব পাকিস্তান থেকে অত্যাচারিত শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে সংসদের যা উচিত মনে হয়েছিল করেছে। শরণার্থীর বোঝা বহন করতে ও তাদের নাগরিকত্ব দিতে বাধ্য নয় সংসদ।” এর জবাবে আবেদনকারীদের আইনজীবীরা বলেছিলেন, “বাস্তব পরিস্থিতি ও ফলশ্রুতি বিবেচনা না করে যেভাবে ৬এ ধারা প্রণয়ন করা হয়েছে, তা হঠকারী ও অসাংবিধানিক। তিব্বতি, চাকমা, তামিল ও রোহিঙ্গাদের জন্যও কেন্দ্রের শরণার্থী নীতি রয়েছে। কিন্তু কোনো নীতিতেই শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না, যা আসামে করা হয়েছে।”
প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চে অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি এম এম সুরেশ, বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্র। যে সব প্রশ্ন সর্বোচ্চ আদালত করেছেন, সোমবার ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে হলফনামা দাখিল করে তার জবাব দিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতিরা। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে জবাব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সলিসিটর জেনারেল মেহতা।
সূত্র : এবিপি
এমইউ