Dhaka Mail Logo

হেলথ

ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির ধর্মঘট ৭ দিনের জন্য স্থগিত

২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চলমান বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট আগামী সাত দিনের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতি। 

বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যার দিকে সংগঠনের সেন্ট্রাল কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাদল মাতবর সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে, এই পরিস্থিতি নিরসনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর সমিতির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে ধর্মঘট স্থগিতের এই সিদ্ধান্ত নেন।

বাংলাদেশ বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদল মাতবর বলেন, ‘দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম ভোগান্তির কথা চিন্তা করে আমরা মানবিক কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

এদিকে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন জানান, আগামী সাত দিন হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং এরপর পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘হাসপাতাল হচ্ছে রোগীদের মূল সেবাকেন্দ্র। এখানে চিকিৎসাসেবায় কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটুক, তা কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই চায় না।’

উল্লেখ্য, ঢামেক হাসপাতাল চত্বরে অ্যাম্বুলেন্সের স্থায়ী পার্কিংয়ের দাবির প্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে আকস্মিক এই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল মালিক সমিতি। ধর্মঘট স্থগিতের এই সিদ্ধান্তের ফলে আপাতত ঢামেক হাসপাতালে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চলাচল এবং জরুরি রোগী স্থানান্তর প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হচ্ছে।

এর আগে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে পার্কিংয়ের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) থেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকেরা ধর্মঘটের ডাক দেন।

এতে বুধবার (২৮ অক্টোবর) হাসপাতালে আসা রোগীরা অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন।

ধর্মঘটের কারণে বুধবার সকাল থেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও ২ নম্বর ভবনের সামনে অনেক রোগী ও তাদের স্বজনদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। এ কারণে প্রথমদিনও হাসপাতাল প্রাঙ্গণে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে।

অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির ধর্মঘটের কারণে ঢাকা হাসপাতালে আসা রোগীরা অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন।
অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির ধর্মঘটের কারণে ঢাকা হাসপাতালে আসা রোগীরা অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন।

নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা মো. শাহীন জানান, তার ৭০ বছর বয়সী দাদি হালিমা বেগমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয়েছিল। মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে তিনি মারা যান। এরপর মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অ্যাম্বুলেন্স খুঁজেও পাননি তারা।

শাহীন বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে এসেও এমন বিপদে পড়তে হবে, তা কখনো ভাবিনি। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সও চোখে পড়েনি। স্বজন হারানোর শোকের মধ্যে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছি।’

যাত্রাবাড়ী থেকে আসা মোহাম্মদ মনির হোসেন জানান, তার বড় ভাগনে মো. রাসেল (২২) অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে রাসেলের মৃত্যু হয়। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স খুঁজেও পাননি তারা।

মনির হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালের একজন চিকিৎসক আমাদের ভ্যানে করে মরদেহ নিয়ে যেতে বলেছেন। স্বজন হারানোর শোকের মধ্যে মরদেহ নেওয়ার গাড়ি না পেয়ে অসহায়ের মতো বসে আছি। এত বড় সরকারি হাসপাতালে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে, তা কল্পনাও করিনি।’

শুধু মরদেহ পরিবহন নয়, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরেও সংকট তৈরি হয়েছে। খুলনা থেকে গুরুতর আহত শাশুড়িকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন আব্দুল আহাদ। পরে তাকে কিডনি হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু দুপুর থেকে অ্যাম্বুলেন্স খুঁজেও পাননি বলে জানান তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকেই অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে অনেককে অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এমনকি পিকআপভ্যানেও রোগী ও মরদেহ নিয়ে যেতে দেখা গেছে। হাসপাতালের বাইরে থেকে কিছু অ্যাম্বুলেন্স এলেও রোগী ও স্বজনদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা মিলছে না বলে দাবি করেন তারা।

অভিযোগ, হাসপাতাল চত্বরে পার্কিং ব্যবস্থার দাবির আড়ালে, রোগীদের গলাকাটা ‘অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস’ চালুর পাঁয়তারা করছে মালিক সমিতির। কারণ মাসে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার উৎস এই অ্যাপ সার্ভিস বন্ধ হওয়ায় দিশেহারা সিন্ডিকেট।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই ধর্মঘট কর্মসূচির মূলে বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির দুই নেতা। তারা দুজনেই ঢামেকের যুবদল ইউনিটের শীর্ষপদ প্রত্যাশী। অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস থেকে পাওয়া মাসিক ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার ভাগবাটোয়ারাও তারাই করতেন।

এমএএমআর/এএম