সাখাওয়াত হোসাইন
১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৭ পিএম
- বন্ধ হবে অনৈতিক লেনদেন, গতি আসবে চিকিৎসকদের কাজে
- যোগ্যরা পাবেন মর্যাদা
- জ্যেষ্ঠতা ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে চিকিৎসকদের পদায়ন
- সুযোগ থাকবে না তদবির ও সুপারিশের
দেশের স্বাস্থ্যখাতে আমূল পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অটোমেশন হচ্ছে চিকিৎসকদের বদলি, পদোন্নতি ও পদায়ন। এর ফলে বন্ধ হবে দুর্নীতি, অনৈতিক তদবির ও লেনদেন। সেইসঙ্গে গতি আসবে মন্ত্রণালয়ের দাফতরিক বিভিন্ন কাজে।
জানা গেছে, নতুন এই পদায়ন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবেন মেধাবী ও যোগ্য চিকিৎসকরা। এতদিন মেধা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অনাকাঙ্ক্ষিত নানামুখী প্রভাবে অনেকে উপযুক্ত পদে পৌঁছাতে পারতেন না। কিন্তু এখন থেকে চিকিৎসকদের দক্ষতা, কর্মস্থল, জ্যেষ্ঠতা ও পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পদায়ন নির্ধারিত হবে। সেইসঙ্গে নির্দিষ্ট মেয়াদে নির্দিষ্ট কর্মস্থলে সন্তোষজনক পারফরম্যান্স দেখালেই জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে যথাসময়ে পদায়ন হবে। এর ফলে চিকিৎসকদের মধ্যে কাজের নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে এবং কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অসন্তোষ ও হতাশা অনেকাংশে কমে আসবে। সেইসঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নিখাদ স্বচ্ছতা ফিরে আসবে।
বদলি ও পদায়নের এই স্বচ্ছতা পরোক্ষভাবে দেশের প্রান্তিক ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসবে। সঠিক স্থানে সঠিক চিকিৎসক পদায়িত হলে এবং বদলি প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা দূর হলে চিকিৎসকরা আরও নিশ্চিন্তে সেবা দিতে পারবেন। ফলে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকার চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতেও সেবা ঘাটতি পূরণ হবে এবং দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যখাতে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্যখাতের বড় সংকট কাঙ্ক্ষিত পদায়ন কিংবা বদলি নিয়ে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন এবং উচ্চপর্যায়ের তদবির সংস্কৃতি। এতে বিরক্ত স্বয়ং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও। কর্মকর্তারা কোনো ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও তাদের অপবাদ সহ্য করতে হয়। তাতে নষ্ট হয় কাজের স্পৃহা ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে বন্ধ হবে প্রভাবশালীদের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সুপারিশ। এছাড়া পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় এবং নির্দিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ ও দুর্নীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
>> আরও পড়ুন
তারা আরও বলছেন, চিকিৎসকদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এই সিস্টেমে প্রতিটি চিকিৎসকের যোগদানের তারিখ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিশেষ প্রশিক্ষণ, পূর্ববর্তী কর্মস্থল, দুর্গম অঞ্চলে সেবাদানের সময়কাল এবং কাজের সামগ্রিক মূল্যায়নের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকবে। সফটওয়্যারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো চিকিৎসকের বদলি বা পদায়নের যোগ্যতা নির্ধারণ করবে, যা মানবীয় হস্তক্ষেপের সুযোগ একবারে কমিয়ে আনবে।
এর আগে স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে অটোমেশন পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করেছিল অন্তর্তীকালীন সরকারের আমলে গঠিত স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন। বিষয়টি আমলে নিয়েছে বর্তমান সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারকরাও চান স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ও গতি আনতে। স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও। ইতোমধ্যে নানা পদক্ষেপও নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই অটোমেশন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হতে হবে দেশের গ্রাম ও প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক সংকট দূর করা। ইতিপূর্বে তদবিরের জোরে বড় বিভাগীয় শহর কিংবা শহরভিত্তিক হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের ভিড় বাড়লেও পদ খালি পড়ে থাকত মফস্বলের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে। নতুন নিয়মে পদায়নে এমন নির্দিষ্ট শর্ত রাখতে হবে যোগ্যতা প্রমাণ করা ছাড়া কেউ সুবিধাজনক স্থানে বদলি হতে না পারে।
তারা বলছেন, যখনই চিকিৎসকরা দেখতে পাবেন যে, পদায়ন, পছন্দের স্থানে বদলি কিংবা পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে, তখনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। ফলে বাইরে থেকে অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও কমে আসবে।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বদলি ও পদায়নে অটোমেশন ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু অটোমেশন দিয়ে দুর্নীতি দূর করা বা কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ নীতিমালা, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর জবাবদিহি। যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা, জনবলের প্রয়োজন ও মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনার পাশাপাশি আপিলের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
>> আরও পড়ুন
ঘরে ঘরে জ্বর-সর্দি, ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব
বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ডা. আহমেদ আহসানুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কমিশনের পক্ষ থেকে ৩০টিরও বেশি মূল সুপারিশ জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো— বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতিতে অটোমেশন পদ্ধতি চালু করা। মেধাভিত্তিক সমাজ তৈরির অংশ হিসেবে সরকার মেধাভিত্তিক অটোমেশন পদ্ধতিতে পদায়নের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কিছুটা জটিল হতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত তদবির ও দুর্নীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে নানা বাধা অতিক্রম করতে হবে। তবে সরকার ধাপে ধাপে যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে, তা সঠিক দিক নির্দেশ করে।
দুর্নীতি রোধের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়া চালু হলে বদলি ও পদায়ন কেন্দ্রিক দুর্নীতির অভিযোগ প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সমাধান হয়ে যাবে। মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় যেমন কঠোর নিয়মের কারণে এখন আর কেউ তদবির বা দুর্নীতি নিয়ে চিন্তা করে না, তেমনই বদলি-পদায়নেও স্বচ্ছতা থাকলে দালাল চক্রের প্রভাব স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে।
>> আরও পড়ুন
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু কারিগরি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এলেও সরকার যদি কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা বজায় রাখতে পারে, তবে এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও মাইলফলক পদক্ষেপ হিসেবে পরিগণিত হবে।
তারা মনে করছেন মনে করছেন, এ ধরনের সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে শুধু সরকারি চিকিৎসকদের মানসিক কর্মপরিবেশই উন্নত হবে না, বরং সার্বিকভাবে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। চিকিৎসকরা দুশ্চিন্তামুক্ত পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পেলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর সেবার মান ও ব্যবস্থাপনায় দ্রুত লক্ষণীয় পরিবর্তন আসবে।
এসএইচ/এএস