Dhaka Mail Logo

হেলথ

নীরবে বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ, আক্রান্তদের বড় অংশ তরুণ-যুবক

সাখাওয়াত হোসাইন

০১ আগস্ট ২০২৬, ১১:১৫ এএম

দেশে নীরবে বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা। একসময় এই সংক্রমণ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এখন যাদের এইচআইভি শনাক্ত হচ্ছে তাদের বড় একটি অংশই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ-যুবক।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার ঘাটতি, ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক-নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে এই সংক্রমণ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রা, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের দুর্বলতা, নৈতিক ও স্বাস্থ্য সচেতনতার ঘাটতি তরুণদের অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনিরাপদ সম্পর্ক, একাধিক সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং যৌনস্বাস্থ্য বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব এই সংক্রমণের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তাদের মতে, বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের একটি অংশ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির শিকার হন। পরে দেশে ফিরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে অজান্তেই তাদের মাধ্যমে স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

AIDS-2
রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ে এইচআইভি সংক্রমণ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল এইডস/এসটিডি কন্ট্রোলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে ২৩টি জেলা। প্রতি বছরই নতুন করে আক্রান্ত শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে। অতীতে এই সংক্রমণ প্রবাসী কর্মী, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী এবং নির্দিষ্ট উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমানে তা তরুণ সমাজ ও সাধারণ পরিবারগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে কক্সবাজারেই রয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, কক্সবাজারের আক্রান্তদের মধ্যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মাত্র ১৭০ জন। বাকি আক্রান্তদের বড় অংশ উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর।

এ ছাড়া প্রতি বছর নতুন করে শনাক্ত হওয়া রোগীদের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ-যুবক। এ পরিসংখ্যান তরুণদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধির বিষয়টি স্পষ্ট করছে।

জাতিসংঘের এইডস বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইডসের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের একটি বড় অংশ এখনো শনাক্তের বাইরে রয়েছে। ফলে তারা নিজেদের অজান্তেই ভাইরাস বহন করছেন এবং অন্যদের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করছেন।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য বলছে, অধিকাংশ এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে সিলেট, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে। বাংলাদেশের ৬৪ জেলায়ই এইডস আক্রান্তরা ছড়িয়ে আছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে এ বিষয়ে নজরদারির সুযোগ সীমিত। এরমধ্যে অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে এইচআইভির সংক্রমণ বেশি এবং তা আরও বাড়ছে।

aids
এইচআইভি নিয়ে সচেতনতামূলক ব্যাজ।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের এআরটি (অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি) সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বড় ঢলের পর সেখানে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। শুধু ২০২৫ সালেই নতুন করে ২১৭ জন এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন, যাদের সবাই রোহিঙ্গা। এর আগের বছর ২০২৪ সালে শনাক্ত হয়েছিলেন ২১৫ জন।

বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি মানুষের রক্ত পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ২০ জনের শরীরে এইচআইভি সংক্রমণ শনাক্ত হয়। শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জন শিক্ষার্থী।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ২০৪ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১১ জনের রিপোর্ট পজিটিভ আসে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, এসব রোগীর বেশিরভাগই পুরুষের সঙ্গে পুরুষের যৌনসম্পর্কে যুক্ত ছিলেন। একজন আক্রান্ত ব্যক্তির স্ত্রীর শরীরেও সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।

পাবনা জেলাতেও শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে এইচআইভি বা এইডস সংক্রমণের ঝুঁকি। জেলায় এখন পর্যন্ত মোট ১৬ জনের শরীরে এইচআইভি এইডস শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭ জনই সমকামী। জেলায় সমকামী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১,৬১৫ জন। ফলে জেলাটিতে এইডস রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে আশঙ্কাজনক হারে।

rohingya-camps
কক্সবাজারে এইডসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা

তথ্য অনুযায়ী, জেলায় উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৯০৮ জন পুরুষ যৌনকর্মী, ৭৬৫ জন নারী যৌনকর্মী, ৪৮৪ জন শিরায় মাদক গ্রহণকারী এবং ১১০ জন হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্য রয়েছেন।

কুমিল্লাতেও বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ। ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে জেলায় সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৭ জন। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে বর্তমানে ১৫ জেলার ৫৪৬ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে কুমিল্লার বাসিন্দা ৩৮৫ জন। আক্রান্তদের বেশিরভাগই পুরুষ সমকামী ও যৌনকর্মী।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কুমিল্লা এআরটিতে ২০১৯ সালে পরীক্ষায় ১৫ জন, ২০২০ সালে আটজন, ২০২১ সালে ১৪ জন, ২০২২ সালে ২১ জন, ২০২৩ সালে ৪৮ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৭২ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়। চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৬৭২ জনের পরীক্ষায় ৩৭ জনের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে।

যশোরেও বাড়ছে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৩১০ জন এইচআইভি পজিটিভ ব্যক্তি নিয়মিত কাউন্সেলিং ও অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল (এআরটি) চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে নয়জন মারা গেছেন এবং ১১ জন চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন ২৯০ জন।

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে- চলতি বছরেই নতুন করে ৪৮ জন শনাক্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩৫ জনই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এবং সমকামী সম্পর্কের মাধ্যমে এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন বলে যশোর স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে। বাকি ১৩ জন বিদেশফেরত।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত জেলায় ১৩৯ জন এইচআইভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯২ জনই সমকামী, যা মোট আক্রান্তের ৬৬.১৮%। একই সময়ে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ৭৯৪ জনে।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের আট জেলায় এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে বগুড়ায় ১০৯ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২১ জন, জয়পুরহাটে ৩৭ জন, নওগাঁয় ৬৫ জন, নাটোরে ৪৩ জন, পাবনায় ৭৮ জন, রাজশাহীতে ১৩১ জন এবং সর্বোচ্চ ৩১০ জন আক্রান্ত সিরাজগঞ্জ জেলায়।

untitled-3
ত্বকের স্পর্শে ছড়ায় না এইচআইভি

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল বিপ্লব মানুষের জীবনকে সহজ করলেও তরুণদের জন্য তৈরি করেছে নতুন কিছু ঝুঁকি। ডেটিং অ্যাপস, অনিয়ন্ত্রিত পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং নামপরিচয় গোপন রেখে সামাজিক যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ তরুণদের খুব সহজেই অনৈতিক ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কে জড়াতে সহায়তা করছে। এর ফলে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকে, সে সম্পর্কে চিন্তা করার পরিপক্বতা অনেক তরুণের মধ্যেই থাকছে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আলী নুর মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, ‘রক্ত ও যৌনতার মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণ ছড়াই। সংক্রমণ থেকে বাঁচতে রক্ত আদান-প্রদানের সময় ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে এবং যৌন সচেতনতা বাড়াতে হবে।’

বশির আহমেদ বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, রোগ সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি, সামাজিক সংকোচ এবং গোপন নেটওয়ার্কের কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠছে। এর মধ্যে গোপন নেটওয়ার্ক বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এদের শনাক্ত করা মুশকিল।’

এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, এইচআইভি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধ সরকারিভাবে বিনামূল্যে দেওয়া হয়। যদি কারও এ ধরণের লক্ষণ দেখা দেয়, দ্রুত পরীক্ষা করা উচিত।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বাংলাদেশে তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে এইচআইভি বা এইডস সংক্রমণের বর্তমান পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও আশঙ্কাজনক। অতীতে এই ব্যাধি কেবল নির্দিষ্ট কিছু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বা বিদেশফেরতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তরুণ সমাজ এবং সাধারণ পরিবারগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, একাধিক সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ এবং আক্রান্তদের একটি বড় অংশ শনাক্তের বাইরে থেকে যাওয়া এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বিশাল জনমিতিক সম্ভাবনা মারাত্মক স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, ‘এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তরুণদের মধ্যে সঠিক যৌন স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক-নৈতিক শিক্ষা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক জীবনযাত্রার ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণের পাশাপাশি সামাজিক, ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধ চর্চার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে দূরে থাকতে হবে। এ ছাড়া প্রবাসীদের বিদেশ গমনাগমন ও দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় সঠিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতনতামূলক কাউন্সেলিং প্রদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রক্তের নিরাপত্তা যাচাই ও ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

এসএইচ/এমআর