যেভাবে মানুষের দেহে এলো এইচআইভি এইডস 

নিশীতা মিতু
প্রকাশিত: ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:৪৪ এএম
যেভাবে মানুষের দেহে এলো এইচআইভি এইডস 

হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (এইচআইভি) এক আতঙ্কের নাম। এই  ভাইরাস থেকেই সৃষ্টি হয় এইডস। একজন সুস্থ ব্যক্তিকে মৃত্যুর দুয়ারে নিয়ে যায় রোগটি। প্রতি বছর ডিসেম্বরের ১ তারিখ বিশ্ব এইডস দিবস পালিত হয়। ১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালন করা হয়। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৮-১০ মিলিয়ন মানুষ এইডস বয়ে বেড়াচ্ছেন। সংক্রমণের ফলে সৃষ্ট এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই দিবসটি পালন করা হয়।

সর্বপ্রথম এইডস শনাক্ত করা হয় গত শতকের ৮০’র দশকে। এরপর শুরু হয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা, চলে নানা বিতর্ক। কোথায় রোগটির সূচনা হয়েছে কিংবা কীভাবে তা ছড়িয়েছে তা নিয়ে চলে নানা গবেষণা, আলোচনা। ইতিহাস অনুযায়ী এইডস রোগের সূচনা ঘটে মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার আদিবাসীদের মধ্যে।

শুরু যেভাবে

১৯৮১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলেসে সর্বপ্রথম এইডস শনাক্ত হয়। এশিয়ায় রোগটি প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৮৪ সালে থাইল্যান্ডে। এরপর ১৯৮৬ সালের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশ ও মায়ানমারে এর সংক্রমণ ঘটে।

এইচআইভি (HIV) এবং এসআইভির (SIV) সংযোগ

এইচআইভি এক ধরনের লেন্টিভাইরাস। এটি মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় আক্রমণ করে। অন্যদিকে সিমিয়ান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস বা এসআইভি শিম্পাঞ্জি বা বানরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় আক্রমণ করে। গবেষণায় এই দুটি ভাইরাসের মধ্যে অনেক মিল পাওয়া গেছে। শিম্পাঞ্জির শরীর থেকে পাওয়া এসআইভি-এর ধরনের সঙ্গে এইচআইভি-১ এর মিল পাওয়া গেছে। আবার সুটি মাঙ্গাবি বানরের শরীর থেকে পাওয়া এসআইভি-এর ধরনের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে এইচআইভি-২ এর।

aids

তবে কি এইচআইভি বানর থেকে এসেছে?

এইচআইভি মানুষের দেহে কী করে এলো, তার উত্তর খোঁজেন গবেষকরা। তারা ১৯৯৯ সালে শিম্পাঞ্জির শরীরে পাওয়া এসআইভির সঙ্গে মানুষের শরীরে পাওয়া এইচআইভির মধ্যে একটি মিল খুঁজে পান যা প্রায় একইরকম। তারা এটি প্রমাণেও সফল হয়েছে যে এইচআইভি-১ এর উৎস ছিল শিম্পাঞ্জি। ধারণা করা হয় কোনো এক সময় ভাইরাসটি শিম্পাজি থেকে মানুষের দেহে প্রবেশ করে।

>> আরও পড়ুন : মানসিক রোগ মানেই ‘পাগল’ নয়
 
বিজ্ঞানীরা আরও গবেষণা চালান যে কীভাবে শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে এসআইভি বিকশিত হয়েছে। জানা যায়, শিম্পাঞ্জিরা দুটি ছোট ছোট প্রজাতির বানর শিকার করে খেত। এই বানরগুলো থেকেই শিম্পাঞ্জিরা এসআইভির ভিন্ন দুটি ধরণ দ্বারা সংক্রমিত হয়েছিল। এই দুটি ভিন্ন ধরন মিলে তৃতীয় একটি ভাইরাস গঠন করে যার নাম এসআইভিসিপিজেড (SIVCPZ) যা শিম্পাঞ্জিদের সংক্রমিত করেছিল। এই ধরনটিই পরবর্তীতে মানুষকে সংক্রমিত করে।

শিম্পাঞ্জি থেকে মানুষের মধ্যে এলো কীভাবে?

এই বিষয়টি নিয়ে নানা মতবাদ রয়েছে। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ধারণা হলো, মানুষ যখন শিম্পাঞ্জি বা বানর শিকার করে এর মাংস খেত তখন কোনো এক সময় অথবা শিকারকৃত প্রাণীর রক্ত শিকারিদের ক্ষতস্থানের সংস্পর্শে আসে। আর তা থেকেই মানুষ এই ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়ে থাকে। সাধারণত শিকারির শরীর এসআইভির সঙ্গে লড়াই করে। কিন্তু ভাইরাসটি তার নতুন মানব ধারকের মধ্যে কয়েকবার পরিবর্তনের মাধ্যমে মানিয়ে নিয়ে পরিণত হয় এইচআইভি-১ এ। 

aids

এইচআইভির ধরন প্রধানত চারটি (M, N, O, P)। এর প্রতিটি জীনগতভাবে সামান্য ভিন্ন ধরনের। শিম্পাঞ্জির দেহ থেকে এসআইভি ভিন্নভাবে মানব শরীরে প্রবেশ করে এবং প্রত্যেকবার সামান্য ভিন্ন ধরন তৈরি করে। যা থেকে পরিষ্কার হয়, এইচআইভি-১ ছাড়াও এর একাধিক ধরন রয়েছে। তবে পুরো বিশ্বে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়ী এইচআইভি-১ ধরনটি।

এইচআইভি-২ এলো যেভাবে

গবেষণায় দেখা যায় সুটি মাঙ্গাবি বানর থেকে এসআইভিএসএমএম মানুষের শরীরে এসে এইচআইভি-২ তে রূপান্তরিত হয়। ধারণা করা হয় বানরের মাংস বিক্রয় এবং খাওয়ার মাধ্যমে মানবদেহে এর সংক্রমণ হয়। তবে এটি খুব দুর্লভ এবং এইচআইভি-১ থেকে কম সংক্রামক। যার কারণে খুব কম মানুষ এইচআইভি-২ তে আক্রান্ত হয়। পশ্চিম আফ্রিকার কয়েকটি দেশ যেমন মালি, মৌরিতানিয়া, নাইজেরিয়া ও সিয়েরা লিওনে এর সংক্রমণ দেখা যায়।

মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম এইচআইভির উপস্থিতি দেখা যায় কবে, কোথায়?

১৯৫৯ সালে কঙ্গোর রাজধানী কিনসাসা নিবাসী এক ব্যক্তির রক্ত পরীক্ষার নমুনা থেকে প্রথম এইচআইভির উপস্থিতি জানা যায়। পরবর্তীতে যা আরও ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে এইচআইভি শনাক্ত করা হয়। ইতিহাস অনুযায়ী, এসআইভি থেকে এইচআইভির প্রথম সংক্রমণ ঘটে ১৯২০ সালে কঙ্গোর রাজধানী কিনসাসায়। বিশ্বে সর্বাধিক এইচআইভি জীনগত বৈচিত্র্যের ধারা এই অঞ্চলেই দেখা যায়।

কিনসাসা থেকে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে এইডস?

কিনসাসা শহরটির আশপাশের অঞ্চলে সড়ক, রেলপথ ও জলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিল। তাই এখানে বিভিন্ন স্থান থেকে জনসমাগম ঘটত। যে সময় এইডস ছড়িয়ে পড়ছিল তখন এই অঞ্চলে যৌন ব্যবসাও বেড়ে গিয়েছিল। অভিবাসীদের সংখ্যা বেশি থাকায় এবং পতিতাবৃত্তির ফলে এখানে এইডস আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছিল। ১৯৩৭ সালের মধ্যে সংক্রমণের মাধ্যমে রোগটি কিনসাসার প্রায় ১২০ কিলোমিটার পশ্চিমে ব্রাজাভিলে পৌঁছে যায়। সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা কম থাকায় সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। কিন্তু ১৯৮০ সাল নাগাদ কঙ্গোতে সংক্রমণের প্রায় অর্ধেক ছিল কিনসাসাতে, যা বিশ্বকে মহামারির আভাস দিচ্ছিল।

কঙ্গো থেকে হাইতিতে

১৯৬০ সালে হাইতিতে এইচআইভি ধরা পড়ে। ১৯৬০ এর দশকে অনেক হাইতিয়ান পেশাদার যারা কঙ্গোতে কাজ করছিলেন তারা হাইতিতে ফিরে আসেন। ধারণা করা হয় তাদের মাধ্যমেই রোগটি হাইতিতে পৌঁছায়। এখান থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে এইচআইভি-১ এর উপপ্রধান ধারা M পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৭৫ মিলিয়ন মানুষ ২০১৪ সাল নাগাদ এই উপপ্রধান ধারাটি দিয়ে সংক্রমিত হয়েছিল। 

>> আরও পড়ুন : রোগ প্রতিরোধে পেয়ারার পুষ্টিগুণ জানুন

২০২১ সালে এইচআইভি এইডসের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রাণ হারান প্রায় ৬ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষ। রোগটিতে নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা ১.৫ মিলিয়ন। এইডস সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, হিস্টোরি ডটকম, দ্য গার্ডিয়ান

/এনএম