নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম
বাংলাদেশে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ই-সিগারেটের ব্যবহার। আমদানি নিষিদ্ধ থাকলেও আইনি শূন্যতার সুযোগে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে প্রকাশ্যে বিক্রি ও আগ্রাসী বিপণন চলছে এই পণ্যের। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আমদানি নিয়ন্ত্রণ নয়, ই-সিগারেট, ই-লিকুইড এবং অন্যান্য উদীয়মান তামাকজাত পণ্য নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পৃথক ও কার্যকর আইন প্রণয়ন না হলে নতুন প্রজন্ম নিকোটিন আসক্তির বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলের সম্মেলন কক্ষে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি) আয়োজিত 'বাংলাদেশে ই-সিগারেটের ক্রমবর্ধমান হুমকি: ৮টি বিভাগীয় শহরে প্রাপ্যতার প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ' শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
টিসিআরসি’র প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ফারহানা জামান লিজার সঞ্চালনায় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিসিআরসি’র প্রকল্প কর্মকর্তা মো. জুলহাস আহমেদ।
গবেষণাটি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে পরিচালিত হয়। কেবোটুলবক্স ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নমালার মাধ্যমে সরাসরি পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় মোট ২৮৯টি ই-সিগারেট বিক্রয়কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, পর্যবেক্ষণ করা ২৮৯টি বিক্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ১৯৫টি বা ৬৭ শতাংশই রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত। বাকি বিক্রয়কেন্দ্রগুলো চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল ও ময়মনসিংহে ছড়িয়ে রয়েছে। বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৭৫ শতাংশ স্থায়ী এবং ২৫ শতাংশ অস্থায়ী। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশই ছিল শুধুমাত্র ই-সিগারেট বিক্রির জন্য নির্ধারিত ডেডিকেটেড দোকান। এছাড়া ঘড়ি ও চশমার দোকান, সিগারেটের দোকান, গিফট শপ এবং প্রসাধনীর দোকানেও প্রকাশ্যে ই-সিগারেট ও ই-লিকুইড বিক্রি হতে দেখা গেছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, ৯৯ শতাংশ দোকানে ডিসপোজেবল ও নন-ডিসপোজেবল উভয় ধরনের ই-সিগারেট দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করা হচ্ছিল। ৯৮ শতাংশ দোকানে ই-লিকুইড এমনভাবে রাখা হয়েছিল যাতে ক্রেতাদের সহজেই নজরে পড়ে। ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে ই-সিগারেটের পণ্যগুলো শিশু-কিশোরদের চোখের সামনেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে, যা তাদের আকৃষ্ট করার একটি সুপরিকল্পিত বিপণন কৌশল।
গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ১৯ শতাংশ দোকানে '১৮ বছরের নিচে বিক্রয়যোগ্য নয়' সংক্রান্ত সতর্কবার্তা ছিল। যে ৫৪টি দোকানে এ ধরনের সতর্কবার্তা পাওয়া গেছে, তার ৮৯ শতাংশই ছিল ডেডিকেটেড ভ্যাপ শপ। বিশ্বব্যাপী কিশোর ও তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে ই-সিগারেট আমদানি নিষিদ্ধ থাকলেও ২০১৬ সালের সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধান বাদ পড়ায় স্থানীয় উৎপাদন, বিক্রি ও বাজারজাতকরণে একটি বড় আইনি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগেই বাজারে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এসব পণ্য।
শহরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ১২৫টি ডেডিকেটেড ই-সিগারেট দোকানের মধ্যে ১০৯টিই ঢাকায়। চট্টগ্রামে রয়েছে ১১টি, সিলেটে ৩টি এবং খুলনা ও রংপুরে একটি করে ডেডিকেটেড বিক্রয়কেন্দ্র শনাক্ত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের (বাটা) সমন্বয়কারী সাইফুদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী ও নীতি বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, সেতু'র প্রকল্প পরিচালক শাগুফতা সুলতানা, গবেষক আমিনুল ইসলাম বকুল, ভাইটাল স্ট্রাটেজিসের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার আমিনুল ইসলাম সুজন, ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদসহ অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ।
বক্তারা বলেন, ই-সিগারেট, ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ইএনডিএস), ইলেকট্রনিক নন-নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ইএনএনডিএস), হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট (এইচটিপি) এবং অন্যান্য উদীয়মান তামাকজাত পণ্য নিষিদ্ধে পৃথক ও শক্তিশালী আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সীমান্ত, কাস্টমস ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে অবৈধ আমদানি, উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি অনলাইন ও অফলাইনে এসব পণ্যের বিক্রি, বিজ্ঞাপন ও প্রচার-প্রচারণা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, বাজার তদারকি বৃদ্ধি এবং শুধু কর আরোপের মাধ্যমে এসব পণ্যের বৈধতা দেওয়ার যেকোনো উদ্যোগ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা আরও বলেন, শুধু আমদানি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ই-সিগারেটের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হয়নি। শিশু-কিশোরদের দৃষ্টিসীমা থেকে এসব পণ্য সরিয়ে রাখা, বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং নতুন প্রজন্মকে নিকোটিন আসক্তির ঝুঁকি থেকে রক্ষায় এখনই কার্যকর আইন প্রণয়ন ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বক্তারা বলেন, প্রচলিত সিগারেটের মতো তীব্র দুর্গন্ধ না থাকায় এবং বিভিন্ন আকর্ষণীয় সুগন্ধ ও স্বাদে পাওয়া যাওয়ায় ই-সিগারেট খুব সহজেই শিশু-কিশোর ও তরুণদের আকৃষ্ট করছে। এ কারণে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এর ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ই-সিগারেটের বিক্রি, বিপণন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন।
তারা বলেন, বাংলাদেশে একসময় গাঁজার ব্যবহার বৈধ ছিল। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে পরবর্তীতে সরকার সেটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। একইভাবে সরকার ও জনগণ চাইলে ই-সিগারেটও সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা সম্ভব। নতুন প্রজন্মকে নিকোটিন আসক্তি থেকে রক্ষা করতে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এএইচ/এমআই