বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

তামাক পণ্যের দাম বাড়লে রাজস্ব আয় আসবে ৮৫ হাজার কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

তামাক পণ্যের দাম বাড়লে রাজস্ব আয় আসবে ৮৫ হাজার কোটি টাকা

তামাকজাত দ্রব্যে উচ্চ হারে কর আরোপ করা হলে সরকারের রাজস্ব আয় বছরে ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তামাকের ব্যবহার কমে আসবে, লাখো মানুষ ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবে এবং অকালমৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হবে বলেও দাবি করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রস্তাবিত নতুন তামাক কর কাঠামো বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর কনফারেন্স রুমে বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) আয়োজিত ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে তামাকজাত দ্রব্যে উচ্চ কর আরোপ: সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।


বিজ্ঞাপন


সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশ সরকার তামাক ব্যবহারজনিত রোগ, অকালমৃত্যু এবং বহুমাত্রিক ক্ষতি কমাতে তামাক নিয়ন্ত্রণে অঙ্গীকারাবদ্ধ। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮(১) অনুযায়ী জনস্বাস্থ্যের উন্নতি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে এবং এর আলোকে আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। এছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রেও তামাক নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং তা ৭ম ও ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বক্তারা বলেন, তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও করহার বৃদ্ধি করে পণ্যটিকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নেওয়া তামাক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বিশেষ করে তরুণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো তামাকজাত দ্রব্য তুলনামূলকভাবে সস্তা হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য একটি প্রস্তাবিত তামাক কর কাঠামো তুলে ধরা হয়। এতে সিগারেটের বিদ্যমান চারটি মূল্যস্তর কমিয়ে তিনটিতে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে এবং সব স্তরে অভিন্নভাবে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে সিগারেটের ওপর মোট করভার দাঁড়াবে ৮৩ শতাংশ। এছাড়া প্রতি ১০ শলাকায় ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবে বলা হয়, প্রিমিয়াম, মধ্যম ও নিম্ন—এই তিনটি স্তরে সিগারেটের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হবে, যাতে বাজারে মূল্য বিভাজন কমে আসে এবং কর ব্যবস্থাও সহজ হয়। ধাপে ধাপে এই তিন স্তরকে এক স্তরে নিয়ে আসার পরিকল্পনাও উল্লেখ করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


বিড়ির ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন বিভাজন তুলে দিয়ে একক কাঠামো চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। ২০ শলাকার বিড়ির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ করে ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল থাকবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২০-২১ অর্থবছরের পর থেকে বিড়ির দাম না বাড়ায় মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় এনে এই নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য—যেমন জর্দা ও গুল—এর ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৬০ টাকা এবং গুলের ৩০ টাকা নির্ধারণ করে উভয় ক্ষেত্রেই ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল থাকবে।

তামাক পাতা রপ্তানির ক্ষেত্রেও নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে শূন্য শতাংশ শুল্ক থাকলেও তা বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। বক্তারা বলেন, শূন্য শুল্ক তামাক চাষকে উৎসাহিত করছে, যা জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

সভায় আরও বেশ কিছু নীতিগত পদক্ষেপের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—তামাকজাত পণ্যে সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ, সিগারেটের মূল্যস্তর কমিয়ে আনা, নিয়মিত কর বৃদ্ধি করে তামাকের সহজলভ্যতা কমানো, তামাক কোম্পানির ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা বাতিল, তামাক ও সংশ্লিষ্ট কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ, সব তামাক কোম্পানিকে করজালের আওতায় আনা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তামাক কর সেলকে শক্তিশালী করা।

এছাড়া বাজারে নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যে পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করা এবং তামাক কর ব্যবস্থাকে একটি সুসংহত কাঠামোর মধ্যে আনতে একটি শক্তিশালী জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।

বিএনটিটিপি’র হিসাব অনুযায়ী, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবে এবং ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবে। পাশাপাশি ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৩ লাখ ৭২ হাজার মানুষের জীবন তামাকজনিত অকালমৃত্যু থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫০০ জন বর্তমান প্রাপ্তবয়স্ক এবং সমসংখ্যক তরুণ রয়েছে।

এএইচ/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর