মাহফুজ উল্লাহ হিমু
২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:০১ পিএম
দেশে ব্যবহৃত ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। উদ্বেগ আরও বেড়েছে শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের চারটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার তথ্য সামনে আসায়। মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো, পাঁচ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট আকৃতির অদৃশ্য ও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। এগুলো আকারে এতই ছোট যে, অনেক সময় খালি চোখে দেখা যায় না। তবে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখলেও এখনই আতঙ্কিত না হয়ে আরও বৈজ্ঞানিক যাচাই ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) 'মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন টুথপেস্ট: সায়েন্টিফিক এভিডেন্স ফর পলিসি অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাকশন ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে উৎপাদিত ১৯টি প্রধান ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। ভারতের পাঁচটির একটিতে, থাইল্যান্ডের দুটির একটিতে এবং ভিয়েতনামের দুটির দুটিতেই এ উপাদান পাওয়া গেছে। শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের চারটিতে প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মিলেছে।
এই ফলাফলকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখলেও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডেন্টাল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ মনে করেন, গবেষণার তথ্য উদ্বেগ তৈরি করলেও জনমনে অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি করা উচিত নয়। তিনি বলেন, দাঁত ব্রাশ করার সময় টুথপেস্ট সাধারণত গিলে ফেলা হয় না, কুলকুচি করে ফেলে দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক মুখের টিস্যু বা দাঁতে সরাসরি রোগ সৃষ্টি করে—এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে পরিবেশগত ঝুঁকি বড় উদ্বেগের বিষয়। ব্রাশের পর এসব কণা পানির সঙ্গে নদী-নালা ও সমুদ্রে চলে গিয়ে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে।
এই চিকিৎসক বলেন, দাঁত পরিষ্কারের জন্য বর্তমানে Hydrated Silica ও Calcium Carbonate-এর মতো নিরাপদ বিকল্প উপাদান রয়েছে। তাই প্রস্তুতকারকদের ধীরে ধীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে আনা উচিত।
গবেষণায় সর্বোচ্চ মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে ‘মেডিপ্লাস ফ্লোরাইড জেল'-এ, যেখানে প্রতি ১০০ গ্রামে ৩২০টি কণা শনাক্ত হয়েছে। ক্লোজআপ রেড হট ও ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশে পাওয়া গেছে ১৬০টি করে কণা। কোডোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলাতে (স্ট্রবেরি) ১৪০টি, সিগন্যাল গ্রিন টিতে ১২০টি এবং পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট ও হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ারে ১০০টি করে কণা পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে প্যারোডন্ট্যাক্স এক্সপার্ট গাম কেয়ার, সেনসোডাইন ফ্রেশ জেল, কোলগেট অ্যাকটিভ সল্ট, কোলগেট ম্যাক্সফ্রেশ, জেনফ্রেশ, কোডোমো (অরেঞ্জ) এবং প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো)-সহ আটটি নমুনায় শনাক্তযোগ্য মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।
গবেষণার ফলাফলের বিষয়ে এম এইচ শমরিতা মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল ইউনিটের প্রভাষক ডা. তানজিমুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু একজন মানুষ একবার দাঁত ব্রাশ করতে গড়ে আধা গ্রামেরও কম টুথপেস্ট ব্যবহার করেন। সে হিসেবে প্রতি ব্রাশে শরীরে সর্বোচ্চ একটি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা প্রবেশের সম্ভাবনা থাকতে পারে।’
এই চিকিৎসক বলেন, ‘মানুষ প্রতিদিন খাদ্য, বোতলজাত পানি, প্লাস্টিকজাত পণ্য এবং দূষিত বাতাসের মাধ্যমে আরও অনেক বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করছে। সেই তুলনায় শুধু টুথপেস্ট থেকে সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলনামূলক কম। তবে এ গবেষণাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। গবেষণার পদ্ধতি ও ফলাফল স্বাধীনভাবে পুনরায় যাচাই হওয়া প্রয়োজন। কেবল মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া বা না পাওয়ার ভিত্তিতে কোনো টুথপেস্টের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না।’
তবে শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নুর উদ্দিন তালুকদার । ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘শিশুরা দাঁত ব্রাশ করার সময় টুথপেস্ট গিলে ফেলার প্রবণতা বেশি থাকায় মাইক্রোপ্লাস্টিকযুক্ত টুথপেস্ট তাদের জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয়।’
নুর উদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘সাম্প্রতিক গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিককে অন্ত্রে প্রদাহ, উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের কার্যক্রমে বিঘ্ন, রোগ প্রতিরোধক্ষমতার পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগ, প্রজনন স্বাস্থ্য ও স্নায়ুতন্ত্রের সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। শিশুদের বেড়ে ওঠার সময় এসব বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় শিশুদের জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত টুথপেস্ট নিশ্চিত করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক শ্বাসতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা, হৃদ্রোগ-সংবহনতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। এর সম্ভাব্য প্রভাবের মধ্যে রয়েছে প্রদাহ, অঙ্গের ক্ষতি, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, প্রজননক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ভ্রূণের বিকাশে বিরূপ প্রভাব। একই সঙ্গে ২ হাজার ৭৬০ জনের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৪২ শতাংশ মানুষ কখনোই মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে শোনেননি।
ইএসডিওর মহাসচিব শাহরিয়ার হোসেনের অভিযোগ, কাঁচামালের খরচ কমাতে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করা হতে পারে। এটি ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। তবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারে নির্দিষ্ট কোনো বিধিনিষেধ নেই।
গবেষণায় ইউনিলিভার বাংলাদেশের নয়টি পণ্যের আটটিতে এবং স্কয়ার টয়লেট্রিজের ছয়টি নমুনার সবগুলোতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। তবে ইউনিলিভার এক লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছে, তাদের সব পণ্য কঠোর বৈশ্বিক মান ও স্থানীয় বিধিমালা মেনেই উৎপাদিত হয় এবং ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপদ। তারা গবেষণার পদ্ধতি ও পরীক্ষার বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।
অন্যদিকে স্কয়ার টয়লেট্রিজের হেড অব মার্কেটিং জেসমিন জামান বলেন, তাদের পণ্যে এমন উপাদান থাকার কোনো কারণ নেই। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব কারিগরি দল এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি পরীক্ষা করছে। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গবেষণার পর বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) জানিয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশের বিদ্যমান মানে টুথপেস্টে ব্যবহারযোগ্য ৮১টি উপাদানের তালিকায় মাইক্রোপ্লাস্টিক নেই। তবে এ বিষয়ে সরাসরি কোনো বিধিনিষেধও নেই। তাই ইএসডিওর গবেষণার পূর্ণাঙ্গ তথ্য, পরীক্ষাপদ্ধতি ও কাঁচা উপাত্ত চাওয়া হয়েছে।
বিএসটিআই জানিয়েছে, তারা নিজ উদ্যোগে বাজার ও কারখানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দেশি বা বিদেশি স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পুনঃপরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে। যদি প্রমাণিত হয় কোনো প্রতিষ্ঠান অনুমোদনহীন উপাদান ব্যবহার করেছে বা বাংলাদেশ মান লঙ্ঘন করেছে, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক যাচাই ছাড়া কোনো ব্র্যান্ডকে অনিরাপদ ঘোষণা করাও সমীচীন হবে না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এদিকে ইএসডিওর সুপারিশ হলো, বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও গ্রহণযোগ্য সীমা নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক পরীক্ষাপদ্ধতি চালু, জাতীয় বিধিমালা প্রণয়ন এবং ধাপে ধাপে টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করা। গবেষকদের মতে, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ—উভয় দিক বিবেচনায় এখনই কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।
এমএইচ/জেবি