Dhaka Mail Logo

হেলথ

প্রতিবন্ধীদের নামে হচ্ছে পৃথক ফাইল, বদলে যাবে জীবনমান

সাখাওয়াত হোসাইন

১৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:২২ পিএম

  • প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ
  • প্রতিটি প্রতিবন্ধী নাগরিকের নামে থাকবে পৃথক ফাইল
  • বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য নতুন স্বাস্থ্য প্রকল্প
  • ১০টি মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সমন্বয়ে
  • দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৪৬ লাখ

দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে জন্মগত প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা। অথচ অধিকাংশ শিশুই বেড়ে ওঠে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও পরিচর্যার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে। অনেক পরিবারে প্রতিবন্ধিতা হয়ে ওঠে এক কঠিন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। এমন প্রেক্ষাপটে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এবার প্রতিটি প্রতিবন্ধী শিশুর নামে পৃথক ফাইল খোলা হবে, যেখানে সংরক্ষিত থাকবে তার প্রয়োজনীয় তথ্য, চিকিৎসা ও সেবার ইতিহাস। এই তথ্যভাণ্ডারের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সেবা পৌঁছে দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিবন্ধী শিশুদের জীবনমান উন্নয়ন, অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সমাজের মূলধারায় তাদের অন্তর্ভুক্তির পথ আরও সুগম হবে।

জানা গেছে, প্রতিটি প্রতিবন্ধী নাগরিকের জন্য পৃথক ফাইল খোলা হবে। কেন্দ্রীয় ডাটাভেজে থাকার পাশাপাশি এই ফাইল দেশের প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে সংরক্ষিত থাকবে এবং যার যা অসুবিধা তা সংরক্ষিত থাকবে এই ফাইলে। অসুবিধা ও চাহিদা অনুসারে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব সুযোগ-সুবিধা পাবে তারা। সেইসঙ্গে নিজেদের প্রতিভা বিকশিত করার সুযোগ পাবে প্রতিবন্ধীরা। তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করবে সরকার।

image

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা ও সেবা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার বিষয়গুলোর অন্যতম। দেশের ৫০০ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করতে একসঙ্গে ১০টি মন্ত্রণালয় কাজ করছে, এরসঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। কোনো নাগরিককেই অবহেলা নয়, সবার জন্য সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে চায় সরকার।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুনিশ্চিত করে তাদের মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা কেবল মানবিক দায়িত্বই নয়, বরং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম শর্ত। দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল খাতের বাইরে রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন অসম্ভব। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, কর্মবান্ধব পরিবেশ এবং সমান সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে তাদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন গতির সঞ্চার হবে। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাই পারে একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, তিন বছর আগে দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ৪৬ লাখ। দেশের মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ৮ শতাংশ প্রতিবন্ধী। সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধিতা শারীরিক, এ হার ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এরপর আছে যথাক্রমে দৃষ্টি ও শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা। সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি পাওয়া গেছে খুলনা বিভাগে, ৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে যথাক্রমে রংপুর (৩ দশমিক ৫৪) ও রাজশাহী বিভাগে (৩ দশমিক ৩০)।

image

এছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, মোট ১২ ধরনের প্রতিবন্ধিতা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অটিজম, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, বাক্‌প্রতিবন্ধিতা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণ-দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা।

সমাজসেবা অধিদফতরের তথ্য বলছে, প্রতিবন্ধিতার ধরন বিবেচনায় অটিজম ৯০ হাজার ৮১৮ জন, শারীরিক প্রতিবন্ধী ১৮ লাখ ৪১ হাজার ৬৪৮ জন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধী ১ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭৫ জন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৫৬৫ জন, বাক প্রতিবন্ধী ২ লাখ ১ হাজার ৩৬৯ জন, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৪ জন, শ্রবণ প্রতিবন্ধী ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৫ জন, শ্রবণ-দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ১৫ হাজার ১৪৪ জন, সেরিব্রাল পালসি ১ লাখ ৩১ হাজার ৭৩৪ জন, বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী ২ লাখ ৪৬ হাজার ২৯০ জন, ডাউন সিনড্রোম ৭ হাজার ১৪৪ জন ও অন্যান্য প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২০ হাজার ২৪৫ জন।

এদিকে বাংলাদেশের সংবিধানে সব নাগরিকের সমঅধিকার, মানবসত্তার মর্যাদা, মৌলিক মানবাধিকার ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে তাদের ৯৮ শতাংশ কোনো না কোনো সময় বৈষম্যমূলক আচরণ ও নিগ্রহের শিকার হন। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি দুর্ব্যবহারের শিকার হন প্রতিবেশীর কাছ থেকে। এ হার ৯১ শতাংশ। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, ইউপি চেয়ারম্যান বা প্রতিবেশীর কাছে নিগ্রহের অভিযোগ করেও প্রতিকার না পাওয়ার হার ৪২ শতাংশ।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম ঢাকা মেইলকে বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষ উদ্যোগে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে জুবায়দা রহমানের সাম্প্রতিক ‘শিশু স্বর্গ’ কার্যক্রমের আদলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। চলতি বছরই প্রাথমিকভাবে ২০ থেকে ২৫টি উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু হবে এবং পরবর্তী বছর থেকে এটি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হবে শিশুদের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, দৃষ্টি বা শ্রবণশক্তির সমস্যা কিংবা সিপির (সেরিব্রাল পালসি) মতো জটিলতাগুলো দ্রুততম সময়ে শনাক্ত (আইডেন্টিফাই) করা। শনাক্তকরণের পর শিশুদের প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যাসিস্টেড ডিভাইস যেমন—হুইলচেয়ার কিংবা হাঁটার সরঞ্জাম দেওয়া হবে, পাশাপাশি নিয়মিত ফিজিওথেরাপি দেওয়া হবে। এছাড়া চোখের সমস্যা থাকলে অপারেশন ও চশমা এবং কানের সমস্যার জন্য হিয়ারিং এইডের ব্যবস্থা করা হবে।

অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম বলেন, পরবর্তী ধাপে এই শিশুরা যাতে বড় হয়ে স্বাবলম্বী হতে পারে, সে ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। এই প্রকল্পের প্রোটোকল ও প্রজেক্ট প্রপোজাল (প্রকল্প প্রস্তাব) ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হয়েছে এবং বাজেট পাসসহ অন্যান্য সরকারি দাফতরিক প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এর কাজ মাঠে নামবে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, সরকারি ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। নতুন নির্মিতব্য ৫০০ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র‌্যাম্প, লিফট ও অন্তত একটি বিশেষ টয়লেটের ব্যবস্থা রাখতে হবে। কোনো প্রকল্প অনুমোদনের আগে সেটি প্রতিবন্ধীবান্ধব কি না, তা কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎচালিত ইভি বাস চালুর উদ্যোগেও প্রতিবন্ধীদের সুবিধার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে পরিচালিতব্য এসব বাসে হুইল চেয়ার ব্যবহারকারীরা যাতে সহজে ওঠানামা করতে পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এসএইচ/জেবি