সাখাওয়াত হোসাইন
০৩ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৯ এএম
দেশের স্বাস্থ্যখাতে যুগ যুগ ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে বেসরকারি খাত। তবে বর্তমানে নানা সংকটে রয়েছে এ খাতে। দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা আলোচনা-সমালোচনা হলেও অধিকাংশ মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসা বেসরকারি খাত। অথচ এ খাতে পর্যাপ্ত নীতিগত সহায়তা ও সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে অব্যবস্থাপনা ও নানা অনিয়মও রয়েছে। যত্রতত্র গড়ে উঠছে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সুশাসন ও জবাবদিহির আওতায় আনা গেলে দেশের মানুষের কাছে এ খাত আরও আস্থার জায়গায় পরিণত হতে পারে। সরকারি সঠিক ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অপেক্ষায় রয়েছে বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত।
বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের ব্যয় নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। একেক হাসপাতালে সেবার মান ও খরচে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। একদিকে সরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতকে আরও সম্ভাবনাময় করে তুলতে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত শুধু মানুষের স্বাস্থ্যসেবাই দিচ্ছে না; চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর কর্মসংস্থানেরও বড় একটি ক্ষেত্র এটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের মানোন্নয়নের বিকল্প নেই। প্রয়োজনের আলোকে সরকারকে এ খাতে সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে বিকাশের সুযোগ, অবদানের স্বীকৃতি, কঠোর নজরদারি এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলা, জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৬৩৯টি। এর মধ্যে রয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা ও সদর হাসপাতাল, মাতৃ ও শিশুসদন, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল। এসব হাসপাতালে মোট শয্যাসংখ্যা ৬৭ হাজার ৭৩৫। অন্যদিকে নিবন্ধিত বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের সংখ্যা ৫ হাজার ৫৭৭টি। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট শয্যাসংখ্যা ৯৪ হাজার ৩৯০। এ ছাড়া সারাদেশে নিবন্ধিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা রোগনির্ণয় কেন্দ্র রয়েছে ১০ হাজার ৭২৭টি এবং ব্লাড ব্যাংক রয়েছে ১৪০টি। তবে ধারণা করা হয়, নিবন্ধনবিহীন আরও অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার দেশে পরিচালিত হচ্ছে, যেখান থেকে মানুষ চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে।
গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৭৫ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে দেওয়া হয়। বাকি ২৫ শতাংশ সেবা দেয় সরকারি খাত। জনগণের চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই সরাসরি নিজেদের পকেট থেকে (আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার) বহন করতে হয়। বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে চিকিৎসক, নার্সসহ প্রায় ১২ লাখ কর্মী কর্মরত আছেন।
দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ মানুষের জন্য আরও সহজলভ্য ও জনবান্ধব করতে বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে সরকারের নীতিগত সহযোগিতা ও ভর্তুকি প্রয়োজন বলে মনে করেন ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এম. এ. শামীম। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, বর্তমানে একটি হাসপাতালের জন্য নানা ধরনের লাইসেন্স নিতে হয় এবং সেগুলোর জন্য বিভিন্ন দফতরে যেতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে আমরা দাবি জানিয়ে আসছি, ইপিজেডের মতো ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালু করা হলে একটি জায়গা থেকেই সব সেবা পাওয়া যাবে এবং কাজ অনেক দ্রুত সম্পন্ন হবে।
লাইসেন্সের মেয়াদ ও নবায়ন প্রক্রিয়ার জটিলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘লাইসেন্সগুলোর মেয়াদ মাত্র এক বছর। একটি লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করার পর সেটি হাতে পেতেই প্রায় এক বছর লেগে যায়। ফলে লাইসেন্স পাওয়ার পরপরই আবার নবায়নের আবেদন করতে হয়। সরকার মেয়াদ দুই বছর করার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে এখনো তার কোনো অগ্রগতি হয়নি।’
বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের বিকাশে সরকারের বিশেষ প্রণোদনা ও সহায়তার ওপর জোর দিয়ে ডা. এম. এ. শামীম বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতকেও একটি সম্ভাবনাময় ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। নতুন হাসপাতাল নির্মাণের জন্য কম সুদে ব্যাংক ঋণ, কর রেয়াত এবং স্বল্প মূল্যে সরকারি জমি বরাদ্দ দেওয়া হলে বেসরকারি খাত আরও এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, সরকারি খাত একা দেশের সব মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারবে না। তাই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা থাকবেই। সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলে বেসরকারি খাতে চিকিৎসার ব্যয়ও কমে আসবে। বেসরকারি খাতে চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এ খাতে কোনো সরকারি ভর্তুকি নেই। সম্পূর্ণ ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে এবং উচ্চ সুদ পরিশোধের শর্তে হাসপাতাল পরিচালনা করতে হয়। এ ছাড়া দেশে এখনো কার্যকর স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে আকস্মিক চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে মানুষকে হিমশিম খেতে হয়। সরকার যদি স্বাস্থ্য বীমা চালু করে এবং কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে ভর্তুকি দেয়, তবে সাধারণ মানুষ আরও কম খরচে উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবেন।
জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করে ডা. এম. এ. শামীম বলেন, ‘নীতিগতভাবে সরকারকে আরও এগিয়ে আসতে হবে এবং আমাদের সঙ্গে বসতে হবে। সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে বসে নতুন নীতি ও নিয়মকানুন প্রণয়ন করলেই সাধারণ মানুষের জন্য একটি সাশ্রয়ী ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। দুটি খাতকে একে অপরের প্রতিযোগী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে হবে।’
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় বেসরকারি খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার এবং স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ—উভয় ক্ষেত্রেই সরকারি ও বেসরকারি খাতকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শুধু নির্দেশনাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। চিকিৎসার মান বাড়াতে বিকল্প পথও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতকে বিকশিত করতে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ হেলথ কমিশন গঠন করে মান নিয়ন্ত্রণ, অ্যাক্রেডিটেশন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) সম্প্রসারণ, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবায় কর-প্রণোদনা, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা চালুর মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতকে একই কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।
অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড (ইএইচআর) ও রোগ নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু এবং বিভাগীয় ও আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিকেন্দ্রীভূত তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সুশাসন, স্বচ্ছতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং যথাযথ প্রণোদনার সমন্বয়েই একটি শক্তিশালী ও জনবান্ধব বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত গড়ে তোলা সম্ভব।
বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা একটি আইনি কাঠামো তৈরি করছি, যা বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে নিয়ন্ত্রণ এবং যৌক্তিক ব্যয়ে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।’
এসএইচ/এএস