Dhaka Mail Logo

হেলথ

অসুস্থ হলেই পকেট খালি: চিকিৎসা ব্যয়ে সার্কে সবচেয়ে চাপে বাংলাদেশ

মাহফুজ উল্লাহ হিমু

০২ জুলাই ২০২৬, ০৬:০২ এএম

● মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯.৩ শতাংশই আসে রোগীর নিজস্ব পকেট থেকে।
● সরকারি অর্থায়ন মাত্র ১৪.৪৮ শতাংশ; সার্কের অধিকাংশ দেশের চেয়ে কম।
● চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে প্রতি বছর বহু পরিবার দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ছে।
● স্বাস্থ্য বাজেট বেড়েছে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কার্যকর বাস্তবায়ন।

রাজধানীর পাশের জেলা গাজীপুরের বাসিন্দা আরিফ ইসলাম (ছদ্মনাম) একটি বেসরকারি স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন। দীর্ঘদিন কিডনি ও লিভারের জটিলতায় ভোগার পর তিনি মারা যান। এর কয়েক বছর আগে দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে মারা যান তার স্ত্রীও। তবে এই দম্পতির একমাত্র ছেলে শরিফুল ইসলাম শুধু বাবা-মাকেই হারাননি, চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে হারিয়েছেন পরিবারের প্রায় সব সঞ্চয় ও পৈতৃক সম্পদ।

শরিফুল জানান, প্রথমে মায়ের চিকিৎসার জন্য বাবা বছরের পর বছর জমানো অর্থ ব্যয় করেন। পরে বিক্রি করতে হয় বাবা ও মায়ের দিক থেকে পাওয়া পৈতৃক সম্পদের বড় একটি অংশ। টানা ৪০ দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা চললেও মাকে বাঁচানো যায়নি।

মায়ের মৃত্যুর প্রায় এক বছর পর অসুস্থ হয়ে পড়েন তার বাবাও। প্রথমে লিভারের জটিলতা ধরা পড়ে, পরে বিকল হয়ে যায় দুটি কিডনি। নিয়মিত ডায়ালাইসিস, লিভারের চিকিৎসা, হাসপাতালে ভর্তি, আইসিইউ এবং ওষুধের ব্যয় মেটাতে শেষ সম্বল, শহরের পৈতৃক বাড়িটিও বিক্রি করে দিতে হয় পরিবারটিকে।

শরিফুল ইসলাম বলেন, 'আব্বার শেষ সময়ে শুধু আইসিইউ, ডায়ালাইসিস আর ওষুধের পেছনেই দিনে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০ লাখ টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছে। শেষদিকে ঋণ করেও চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারিনি। বাধ্য হয়ে আব্বার সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছেও সাহায্য চেয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবা-মাকে হারিয়েছি, হারিয়েছি আমাদের সব সম্পদও।'

শরিফুলের পরিবারের গল্পটি ব্যতিক্রম নয়। দেশে উচ্চ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় (আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার) অনেক পরিবারকে চিকিৎসার পাশাপাশি আর্থিক বিপর্যয়ের মুখেও ঠেলে দিচ্ছে। অনেকের কাছে অসুস্থতা মানেই শুধু জীবন-মৃত্যুর লড়াই নয়, আজীবনের সঞ্চয় ও সম্পদ হারানোর শঙ্কাও।

আরও পড়ুন: নিরাপদ কর্মস্থলসহ ১৭ দফা প্রস্তাবনা বিসিএস হেলথ ক্যাডারদের

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও স্বাস্থ্যখাতে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি বাংলাদেশের মানুষ। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বাংলাদেশ। কারণ, চিকিৎসা ব্যয়ের সিংহভাগই বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে নিজস্ব পকেট থেকে।

একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগও প্রতিবেশী অধিকাংশ দেশের তুলনায় অনেক কম। ফলে অসুস্থতা শুধু স্বাস্থ্যগত সংকট নয়, বহু পরিবারের জন্য আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ (২০২৩) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩০ শতাংশই রোগী ও তার পরিবারের সরাসরি পকেট থেকে আসে। অর্থাৎ চিকিৎসকের ফি, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা হাসপাতালে ভর্তি- সব মিলিয়ে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় চার-পঞ্চমাংশই জনগণকে নিজস্ব অর্থে বহন করতে হয়।

সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এটি সর্বোচ্চ। আফগানিস্তানে এ হার ৭৭ দশমিক ১ শতাংশ, পাকিস্তানে প্রায় ৫৬ শতাংশ, নেপালে প্রায় ৫১ শতাংশ, ভারতে ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় প্রায় ৩৮ শতাংশ, ভুটানে প্রায় ১৯ শতাংশ এবং মালদ্বীপে মাত্র ১৪ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় যত বেশি হয়, চিকিৎসাজনিত কারণে দারিদ্র্যে পড়ার ঝুঁকিও তত বাড়ে এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জন তত কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুর হামিদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘যখন স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়ে যায় এবং নিজ পকেট থেকে তা বহন করতে হয়, তখন অনেকের পক্ষে প্রয়োজনীয় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। ফলে একটি বড় অংশ ফরমাল বা মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়। তারা ভালো হাসপাতাল বা দক্ষ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারে না; পরিবর্তে ওষুধের দোকান, গ্রাম্য চিকিৎসক, কবিরাজ বা পীর-দরবেশদের কাছে যায়। এতে খরচ হয় ঠিকই, কিন্তু মানসম্মত সেবা পাওয়া যায় না। অর্থাৎ এটি মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে বড় বাধা সৃষ্টি করে।’

আরও পড়ুন: স্বাভাবিক ডেলিভারির জন্য প্রতিটি ওয়ার্ড-ইউনিয়নে থাকবে হেলথ কেয়ার ইউনিট

দারিদ্র্য বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে অনেক পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৫ শতাংশ পরিবার শুধু স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়। অঞ্চলভেদে এর তারতম্যও রয়েছে। যেমন বরিশাল অঞ্চলে এ হার গড়ে ৭ শতাংশ বা তারও বেশি।’

সরকার স্বাস্থ্যখাতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ) ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সরকারগুলো স্বাস্থ্যখাতকে নিজেদের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে না। এ কারণেই স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত বাজেট দেওয়া হয় না। যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তারও পুরোটা ব্যয় হয় না। সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের ব্যবস্থা থাকে না। ফলে রোগীদের বাইরে থেকে এসব কিনতে হয়। এর ফলেই মানুষের নিজের পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়ে যায়।’

স্বাস্থ্যে বিনিয়োগে তলানিতে বাংলাদেশ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল হেলথ এক্সপেন্ডিচার ডাটাবেজ (২০২৩) অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের মাত্র ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ সরকার বহন করে। বিপরীতে ভুটান ও মালদ্বীপে সরকারি অর্থায়নের অংশ প্রায় ৭৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় প্রায় ৫২ শতাংশ, ভারতে প্রায় ৫১ শতাংশ, পাকিস্তানে প্রায় ৩২ শতাংশ এবং নেপালে প্রায় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ সার্কের অধিকাংশ দেশেই সরকার স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশের ব্যয় বহন করায় জনগণের ব্যক্তিগত আর্থিক চাপ তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশে সরকারি বিনিয়োগ কম থাকায় সেই চাপ সরাসরি পরিবারগুলোর ওপর এসে পড়ছে।

জিডিপির তুলনায় স্বাস্থ্য ব্যয়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করছে জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ। পাকিস্তানে এ হার প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ, ভারতে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, ভুটানে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, নেপালে ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং মালদ্বীপে প্রায় ১০ শতাংশ।

জনবল ও অবকাঠামোতেও সংকট

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছেন প্রায় ৭ জন। একই সূচকে ভারতে প্রায় ১০ জন, পাকিস্তানে ১১ জন, নেপালে ৯ জন, শ্রীলঙ্কায় ১২ জন এবং মালদ্বীপে ১৯ জন চিকিৎসক রয়েছেন। সংখ্যাগত ঘাটতির পাশাপাশি চিকিৎসকদের শহরকেন্দ্রিক অবস্থান গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

হাসপাতালের শয্যা প্রাপ্যতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। দেশে প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে হাসপাতালের শয্যা রয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ২টি। ভারতে এ সংখ্যা প্রায় ১৫টি, শ্রীলঙ্কায় ৩৯ দশমিক ৩টি, ভুটানে ২১ দশমিক ৬টি এবং মালদ্বীপে ৪৫ দশমিক ৬টি। তুলনামূলকভাবে উন্নত সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও অধিক বিনিয়োগের কারণে এসব দেশে হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ অনেক বেশি।

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্যসেবার পরিধি গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছাতে কাজ করছি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

এ বিষয়ে অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রায় ১৯ কোটি মানুষের তুলনায় হাসপাতালের শয্যা অত্যন্ত কম। একটি উপজেলায় তিন থেকে পাঁচ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ৩১টি শয্যা রয়েছে। একটি জেলায় আট থেকে ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে শয্যা থাকে ১০০ থেকে ২০০টি। আবার ঢাকা শহরে দুই থেকে আড়াই কোটি মানুষের জন্য সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মিলিয়ে শয্যার সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।’

নতুন সরকারের বাজেটে আশা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি সরকার স্বাস্থ্যখাতে বড় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয়। এর প্রতিফলন দেখা গেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। এতে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং প্রস্তাবিত বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি। মোট বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশও বেড়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের সমালোচনা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুর হামিদ বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ১ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু বাজেটের আকার বাড়ালেই হবে না, তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’

অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান বিএনপি সরকার স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলছে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশ সরকারি হাসপাতাল থেকেই দেওয়া হবে এবং উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা আরও সম্প্রসারণ করা হবে। এসব বাস্তবায়ন করা গেলে মানুষের নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় কমবে। তবে শেষ পর্যন্ত সরকার বাস্তবে কতটুকু ব্যয় বাড়াতে পারে, তার ওপরই এর সাফল্য নির্ভর করবে।’

এমএইচ