images

হেলথ

ক্যানসার চিকিৎসায় আশার আলো, নতুন ওষুধে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমছে টিউমার 

ঢাকা মেইল ডেস্ক

০২ জুন ২০২৬, ১১:০৯ এএম

অবশেষে মরণব্যাধী ক্যানসার চিকিৎসায় দেখা যাচ্ছে আশার আলো। এই রোগের ‘অদৃশ্যতার চাদর’ ভেদ করতে নতুন এক ওষুধ তৈরি করেছেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডভিত্তিক গবেষকরা। জিআরডব্লিউডি৫৭৬৯ (GRWD5769) নামের পরীক্ষামূলক এই ওষুধ ব্যবহারে আশাব্যঞ্জক ফল পেয়েছেন আক্রান্ত রোগীরা।  

গবেষকদের দাবি, এই ওষুধ ব্যবহারে বিশ্বের ছয়টি সাধারণ পর্যায়ের ক্যানসারের রোগীদের টিউমার অন্তত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সঙ্কুচিত হয়েছে। 

এটি ক্যানসার কোষকে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে যেতে বাধা দেয়। ফলে কোষগুলোকে সহজে শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে ইমিউনোথেরাপি।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন ও অস্ট্রেলিয়ায় পরিচালিত এক পরীক্ষায় জরায়ুমুখ, মূত্রথলি, লিভার, অন্ত্র, ফুসফুস এবং মাথা ও গলার ক্যানসারে আক্রান্ত ৮৩ জন রোগীকে এই ওষুধের সঙ্গে সেমিপ্লিম্যাব (Cemiplimab) নামের ইমিউনোথেরাপি দেওয়া হয়।

গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারের ক্রিস্টি এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের গবেষকেরা জানান, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৬ জনের টিউমারের আকার কমেছে। এর মধ্যে ১৫ জনের ক্ষেত্রে টিউমার অন্তত ৩০ শতাংশ সঙ্কুচিত হয়েছে।

Untitled-1
ক্যান্সার চিকিৎসায় জিআরডব্লিউডি৫৭৬৯ (GRWD5769) নামের পরীক্ষামূলক ওষুধ তৈরি করেছেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডভিত্তিক এই গবেষকরা

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব রোগীই আগে প্রচলিত চিকিৎসায় সাড়া দেননি। অনেকের ক্ষেত্রেই চিকিৎসার কার্যকর কোনো বিকল্প অবশিষ্ট ছিল না। বিশেষ করে ইমিউনোথেরাপি তাদের ক্ষেত্রে কাজ করেনি বা কার্যকারিতা হারিয়েছিল।

গবেষকদের মতে, নতুন ওষুধটি টিউমার কোষের ওপর থাকা ‘অদৃশ্যতার চাদর’ সরাতে সক্ষম। ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার টি-সেলগুলো ক্যানসার কোষকে শনাক্ত করতে পারে এবং ইমিউনোথেরাপি আরও কার্যকরভাবে কাজ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের বৃহত্তম ক্যানসার সম্মেলন আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (এএসসিও)-এর বার্ষিক সভায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, ছয় ধরনের ক্যানসারেই ওষুধটি ব্যবহারের ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। জরায়ু ক্যানসারের ১৮ শতাংশ, লিভার ক্যানসারের ৩২ শতাংশ, মূত্রথলির ক্যানসারের ৩৬ শতাংশ, মাথা ও গলার ক্যানসারের ৩৮ শতাংশ, অন্ত্রের ক্যানসারের ৫১ শতাংশ এবং ফুসফুস ক্যানসারের ৫৫ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে অন্তত ছয় মাস রোগের অগ্রগতি থামিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে ওষুধটি।

গবেষণার প্রধান গবেষক ও চিকিৎসা অনকোলজিস্ট অধ্যাপক ফিওনা থিসলথওয়েট বলেন, ট্যাবলেট আকারে গ্রহণযোগ্য একটি ওষুধের জন্য এ ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণা। আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। তবে নতুন কার্যপদ্ধতির এই ওষুধটি ইমিউনোথেরাপিকে আরও কার্যকর করতে সক্ষম বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

অক্সফোর্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্রেওলফ থেরাপিউটিকস ওষুধটি তৈরি করেছে। রোগীরা এটি ঘরে বসেই ট্যাবলেট হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন এবং এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। বর্তমানে পরীক্ষাটি চলমান রয়েছে।   

বিশেষজ্ঞরা জানান, ইমিউনোথেরাপি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার টি-সেলকে সক্রিয় করে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করে। কিন্তু প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোগীর ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা কার্যকর হয় না, কারণ ক্যানসার কোষ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছ থেকে নিজেদের আড়াল করতে সক্ষম হয়।

গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যানসার কোষ ইআরএপি১ (ERAP1) নামের একটি এনজাইমের কার্যক্রম পরিবর্তন করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেয়। নতুন ওষুধ GRWD5769 এই এনজাইমকে বাধাগ্রস্ত করে ক্যানসার কোষকে আবারও দৃশ্যমান করে তোলে।

অধ্যাপক থিসলথওয়েট বলেন, ইমিউনোথেরাপি ক্যানসার চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু এখনো তুলনামূলক কমসংখ্যক রোগী এর সুফল পাচ্ছেন। এই গবেষণার সবচেয়ে উৎসাহব্যঞ্জক দিক হলো, কঠিন ও চিকিৎসা-প্রতিরোধী ছয় ধরনের ক্যানসারে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে, অথচ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই কম। এত প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণায় এমন ফল সাধারণত দেখা যায় না।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি এখনো প্রথম ধাপের (ফেজ-১) গবেষণা। ওষুধটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও বৃহৎ পরিসরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। তবুও প্রাথমিক ফলাফল ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান
 
এআরএম