নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০৬ পিএম
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সিগারেটে আসক্তির সংখ্যা। আসক্ত হয়ে পড়ছে শিশুরাও। শিশুদের কেউ কেউ ই-সিগারেটে আসক্ত। আবার মডার্ন লাইফ হিসেবে ই-সিগারেট খাচ্ছেন, এমতাবস্থায় ই-সিগারেট নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘নিয়ন্ত্রণহীন ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ: শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হুমকি’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন তারা।
সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট, বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি), বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল এডভোকেটস (বিটিসিএ), বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফাউন্ডেশন (বিএসএএফ), সিটিজেন ফর সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট, পাবলিক হেলথ ল'ইয়ারস নেটওয়ার্ক (পিএইচএল) ও তামাক বিরোধী নারী জোট (তাবিনাজ)।
সিটিজেন ফর সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্টের আহ্বায়ক এ কে এম মাকসুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিটিসিএ মডারেটর ফারহানা জামান লিজা।
সেমিনারে বক্তব্য রাখেন বিটিসিএর আহ্বায়ক ইকবাল মাসুদ, বিএনটিটিপির সদস্য বজলুর রহমান, চিলড্রেন ওয়াচ ফাইন্ডেশনের চেয়ারম্যান শাহ ইসরাত আজমেরী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ শাগুফতা সুলতানা, তাবিনাজের সমন্বয়ক সীমা দাস সীমু ও পাবলিক হেলথ ল'ইয়ারস নেটওয়ার্কের সদস্য অ্যাডভোকেট উম্মে হাবিবা কুমকুম প্রমুখ।
সেমিনারে বক্তারা জানান, গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন বিল ২০২৬ পাশ করা হয়েছে। বিলটি পাশের ক্ষেত্রে ইমার্জিং টোবাকো প্রোডাক্ট (ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট) ইত্যাদি দ্রব্যকে ধারা ২(গ) সংজ্ঞা হতে বাদ দেওয়ার পাশাপাশি নিষিদ্ধ সংক্রান্তি বিধান ও বিলুপ্ত করা হয়েছে।
এই বিলুপ্তির প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অনুসরণ করেনি, ফলে এই নতুন দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে কার্যত বাংলাদেশে কোনো আইন রইল না। ইমার্জিং টোবাকো প্রোডাক্টের মতো নেশা দ্রব্য শিশু-কিশোরদের নিকট বিক্রিতে দোকানদারদের কোনো বাধা নেই।
এ অবস্থায় দেশের শিশু কিশোর নতুন নেশা পণ্যের দ্বারা নিকোটিনে আসক্ত হওয়ার সম্ভব ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলো। দোকানদারেরা যে কোনো বয়সের কাছে এই নেশাদ্রব্য বিক্রি করবে।
সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশে ইমাজিং টোবাকো প্রোডাক্ট (ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ, হিটেডের টোবাকো) ব্যবহার নেই বললেই চলে; সরকারের গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭ অনুসারে এর ব্যবহার ০.০২ শতাংশ। বাংলাদেশে অনলাইনে এবং বিভাগীয় শহরগুলোর নির্দিষ্ট কিছু দোকানে এ সকল পণ্য বিক্রি হয়।
দেশে ২০১৭ সালের অর্থ আইনে এইচআর কোডে প্রথম ই-সিগারেট আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি হতে দেশে ই-সিগারেট আমদানি নিষিদ্ধ করে সরকার। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ), সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৬ ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ, হিটেড টোবাকো প্রডাক্ট আমদানি, রপ্তানি, উৎপাদন, ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। সম্প্রতি সংসদে পাশ করা বিলে অধ্যাদেশের এই বিধান বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
বক্তারা জানান, ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ, হিটেড টোবাকো প্রডাক্ট বাংলাদেশে প্রসারের ক্ষেত্রে দুটি বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণ পন্থা রয়েছে। এক, আমদানি আদেশের আওতায় এ দেশে ই-সিগারেট আমদানি নিষিদ্ধ রয়েছে। দুই, মহামান্য আপিল বিভাগের নির্দেশনা রয়েছে। আপিল বিভাগ, সিভিল আপিল নং, ২০৪-২০৫/২০০১ মামলায় ০১/০৩/২০১৬ তারিখে প্রদত্ত এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে বাংলাদেশে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন।
একই রায়ে দেশে নতুন কোনো তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন না দেওয়া, এবং বিদ্যমান তামাক কোম্পানিগুলোকে বিকল্প পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। ফলে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ, হিটেড টোবাকো প্রডাক্ট প্রসারের প্রচেষ্টা আপিল বিভাগের নির্দেশনার পরিপন্থি।
বিটিসিএর আহ্বায়ক ইকবাল মাসুদ বলেন, সিগারেট কোম্পানিগুলো এ ধরনের নেশা পণ্যকে নিরাপদ এবং ধূমপান ত্যাগে সহায়ক বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। অথচ তারা ভিন্ন স্থানে ভেপিং মেলা করার মাধ্যমে যুবকদের ধূমপানে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।
নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা চালাচ্ছে। যে কোনো ব্যক্তির নিকট ই-সিগারেট বিক্রয় করছে। এ সকল বিক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণ বা মনিটরিং করতে কোনো ধরনের কর্তৃপক্ষ বা ব্যবস্থা নেই। কিছু দেশে এ পণ্য রেগুলেটেড বলে ব্যাপকভাবে দেশে প্রচলনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার 'গ্লোবাল টোব্যাকো এপিডেমিক-২০২১' রিপোর্ট অনুযায়ী, ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম আসক্তি তৈরি করে এবং এটা মোটেও নিরাপদ নয়, যে কারণে ইতোমধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইরান, ইরাক, ওমান, কাতারসহ বিশ্বের মোট ৪৭ টি দেশে ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম/ই-সিগারেট বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অ্যাডভোকেট উম্মে হাবিবা কুমকুম বলেন, আমদানি আদেশে নিষিদ্ধ, অধ্যাদেশে নিষিদ্ধ, মাহমান্য আপিল বিভাগের নির্দেশনা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশে এই দ্রব্যের ব্যবহার কম থাকার পরও দেশের অর্থনীতির কথা বলে এই নতুন নেশা পণ্য নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দেশে বাজার সৃষ্টি করার সুযোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। বাংলাদেশে ইমাজিং টোবাকো প্রোডাক্ট-র ব্যবহার নেই বললেই চলে।
দেশের অর্থনীতির দোহাই দিয়ে এ বিধান বাতিল সত্যিই দুঃখজনক এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। এই নেশা পণ্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা হলে, দেশের যুব সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে এবং নতুন নেশায় আক্রান্ত হবে। বর্তমানে আইনের সংজ্ঞা হতে যেভাবে ই-সিগারেট বাতিল করা হয়েছে, তাদের এ নেশা পণ্য শিশুদের হাতে পৌঁছাতে বেশি দিন সময় লাগবে না।
সিটিজেন ফর সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্টের আহ্বায়ক এ কে এম মাকসুদ জানান, বাংলাদেশে তরুণদের আকৃষ্ট করতে ই-সিগারেট দোকান গুলো বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক (তথা আশেপাশে) গড়ে তোলা হয়েছে। তরুণদের আকৃষ্ট করতে তারা অবৈধভাবে বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন তৈরি করছে। ইউটিউব, ফেসবুক, ওয়েবসাইট ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করছে।
এছাড়াও তারা তাদের নিজস্ব কিছু চিকিৎসকের মাধ্যমেও যারা ধূমপান ছাড়তে চায় তাদেরকে প্রচলিত সিগারেটের বদলে ই-সিগারেট ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। তামাক কোম্পানিগুলো পরিকল্পিত অপকৌশলের মাধ্যমে তরুণদের আবার ই-সিগারেটের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে, যা উদ্বেগজনকভাবে বাংলাদেশে দ্রুত বিস্তার লাভ করছিল। তবে বিগত এক বছর নিষিদ্ধ থাকায় এ প্রবণতা বহুলাংশে হ্রাসে পেয়েছে।
চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শাহ ইসরাত আজমেরী বলেন, শিশুরা এখন সিগারেট খায়। অনেকেই ই-সিগারেটে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এখনই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তরুণ প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাবে। ই-সিগারেট খাওয়াটা শিশুদের মডার্ন লাইফের মধ্যে চলে আসছে। শিশুরা অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম নষ্ট হয়ে গেলে মানব সভ্যতা টিকবে না।
তামাক বিরোধী নারী জোটের (তাবিনাজ) সমন্বয়ক সীমা দাস সীমু বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী কথা বললে মনে হয় অর্থমন্ত্রী কথা বলছে। তিনি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। তিনি সিগারেট কোম্পানির হয়ে কাজ করছেন। ই-সিগারেট ও যাবতীয় পণ্য নিষিদ্ধ করতে হবে। ই-সিগারেট মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ শাগুফতা সুলতানা বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির সুবিধা দিতে গিয়ে আমরা কী পাচ্ছি? ই-সিগারেটে আমাদের তরুণ প্রজন্ম নষ্ট হচ্ছে। তামাক কোম্পানিকে সুবিধা দিলে আমাদের তরুণ প্রজন্ম ধ্বংস হচ্ছে। সেইসঙ্গে দেশের মানুষ স্বাস্থ্যও নষ্ট হচ্ছে। দেশের মানুষের জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো কাজ সরকার করবে না, এটাই আশা করি।
এসএইচ/এআরএম