সাখাওয়াত হোসাইন
৩০ মার্চ ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
মানুষের জীবন রক্ষায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করেন চিকিৎসকেরা। মহামারি থেকে শুরু করে প্রতিদিনের জটিল স্বাস্থ্য সংকটে তারাই হয়ে ওঠেন মানুষের ‘শেষ ভরসার স্থল’। দেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন ও সংকট মোকাবিলায় তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সীমিত অবকাঠামো, রোগীর অতিরিক্ত চাপ ও নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেও চিকিৎসকরা নিরলসভাবে সেবার মান ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় তাদের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা নতুন করে জাতির সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে। তবে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। দায়িত্বের ভার যতই বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে প্রাপ্য সম্মান, নিরাপত্তা ও কাঠামোগত সুবিধার ঘাটতি। বিশ্ব চিকিৎসক দিবসে তাই শুধু অবদান স্বীকার নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যখাতের বাস্তব চিত্রও সামনে নিয়ে আসে চিকিৎসকদের এই সংগ্রামের গল্প।
মানবতার সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের অবদান, ত্যাগ এবং অদম্য নিষ্ঠাকে সম্মান জানাতে ৩০ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় চিকিৎসক দিবস। বাংলাদেশেও বিশেষ গুরুত্ব সহকারে দিবসটি পালন করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চিকিৎসকদের যথাযথ সম্মান, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে চিকিৎসা পেশায় আগ্রহী করে তোলা এবং মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করাও জরুরি। বিশ্ব চিকিৎসক দিবস তাই শুধু উদযাপনের দিন নয়, বরং স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
বিশেষ ডিউটিতে নেই ভাতা
উৎসব কিংবা দেশের প্রয়োজনে অতিরিক্ত দায়িত্ব কিংবা বিশেষ ডিউটি পালন করলেও চিকিৎসকদের দেওয়া হয় না কোনো ধরনের ভাতা। আলাদা ‘স্পেশাল ডিউটি ভাতা’ নামে স্থায়ী কোনো সুবিধা নেই। অতিরিক্ত কাজ (ডিউটি, নাইট শিফট, ইমার্জেন্সি) সাধারণত বেতনের মধ্যেই ধরা হয়, যার ফলে অসন্তোষ নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন চিকিৎসকরা।
বার্ন ইনস্টিটিউটের একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘মাঝে মাঝে সংকটকালীন সময়ে আমাদের টানা ডিউটি পালন করতে হয়। এছাড়া অন্য সময় তো আমরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করিই। কোনো উৎসব এলে অর্ধেক বা তারও কম লোকবল দিয়ে চলে হাসপাতাল, তখনও দায়িত্বের চাপ সামলাতে হয়।’
আরেক চিকিৎসক বলেন, ‘বিশেষ ডিউটিতে আমাদের ভাতা দেওয়া উচিত। এতে করে দায়িত্বের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। আর আমরা এমনিতেই এই পেশায় এসেছি মানুষের সেবা করার জন্য। বিশেষ ডিউটিতে ভাতা দেওয়া হলে জুনিয়র পর্যায়ের চিকিৎসকরা ব্যাপক আগ্রহ পাবে কাজ করার।’
বেসরকারিতে নেই বেতন কাঠামো
সরকারি চিকিৎসকরা গ্রেড অনুযায়ী বেতন পেলেও বেসরকারি খাতে নেই কোনো ধরনের বেতন কাঠামো। শুরুর দিকে এমবিবিএস বা বিডিএস চিকিৎসকরা বেতন পরিশ্রম অনুযায়ী বেতন কম পান। বেসরকারিতে নবীন চিকিৎসকদের বেতন শুরু হয় ২০ হাজার টাকা থেকে। যার ফলে অনেকেই বেতন-ভাতা নিয়ে হতাশায় ভোগেন। উপায় না পেয়ে ‘বিকল্প উপায়’ বের করেন।
বেসরকারি মেডিকেলে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হাসপাতাল থেকে কোনো ধরনের ভাতা দেওয়া হয় না। ভর্তির সময় ইন্টার্ন ফি বাবদ কেটে রাখা ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা থেকে তাদের প্রতি মাসে ১৫ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়। আর যারা ইন্টার্ন ফি দেন না, তাদের নাম মাত্র ৬ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয় আবার অনেক সময় কোনো ভাতা দেওয়া হয় না।
আরও পড়ুন: চোখ রাঙাচ্ছে হাম, যা জানা জরুরি!
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতের বড় একটি অংশ বেসরকারি খাতের। এই খাতে কর্মরত চিকিৎসকরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাই বেসরকারি খাতে চিকিৎসকদের বেতন কাঠামো থাকা জরুরি। যাতে করে চিকিৎসকরা সন্তুষ্টচিত্তে রোগীদের সেবা দিতে পারেন।
কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা
কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন অনেক চিকিৎসক। ঠুনকো কিংবা ভুলের অজুহাত তুলে যেকোনো সময় মারধরের শিকার হতে পারেন চিকিৎসক। নেই চিকিৎসকদের ওপর হামলার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। ফলে কর্মস্থলে হামলার শিকার হচ্ছেন চিকিৎসকরা। এসব হামলায় অরক্ষিত তাদের কর্মস্থল। প্রতিটি ঘটনা শেষে সাময়িক কিছু কর্মসূচি ও প্রতিবাদের পর স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা নিরব হয়ে যাওয়ায় নিয়মিত বিরতিতে ঘটেই চলেছে চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনা। রোগীর স্বজনদের হামলায় চিকিৎসকের প্রাণ হারানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। সেইসঙ্গে অনিয়মিতভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছেন বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসকরা।
চিকিৎসকরা বলছেন, যুগোপযোগী একটি চিকিৎসক ও রোগী সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন করা অতীব জরুরি। তারা চান এটা দ্রুত বাস্তবায়ন হোক। অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এই আইন বাস্তবায়ন করা হলে কোনো রোগীকে দেশের বাইরে যেতে হবে না, দেশের স্বাস্থ্যসেবা গণমুখী হবে।
জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দেশের সার্বিক উন্নতি করতে হলে স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজাতে হবে। চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে এবং ভালো রাখতে হবে। যাতে তারা ভালোভাবে মানুষের সেবা দিতে পারেন। সেইসঙ্গে স্বাস্থ্যখাতের অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। তাতে চিকিৎসক এবং দেশ উভয়েরই উপকার হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সুরক্ষা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। কর্মস্থল অনিরাপদ হওয়ার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। জবাবদিহিতার জন্য বিএমডিসি, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরো উদ্যাগী হতে হবে। চিকিৎসকরা যদি ভয়ের মধ্যে থাকেন, তাহলে ঠিকমতো সেবা দিতে পারবেন না। সেইসঙ্গে চিকিৎসক নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেই সেটি বিচার করতে হবে। আর চিকিৎসকের কোনো ভুল থাকলেও তাকে শাস্তি আওতায় আনতে হবে।’
এসএইচ/এমআর