সাখাওয়াত হোসাইন
০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম
-
৬০ শতাংশই চিকিৎসার বাইরে
-
বিশ্বমানের চিকিৎসা এখন বাংলাদেশেই
-
মিলছে দাগবিহীন থাইরয়েড সার্জারিও
-
আক্রান্ত পাঁচজনের তিনজন নারী, ঝুঁকিতে শিশুরাও
দেশে ক্রমেই বাড়ছে থাইরয়েড রোগী সংখ্যা। নারী ও পুরুষ উভয়েই আক্রান্ত হচ্ছেন রোগটিতে। শহরের মানুষ কিছুটা সচেতন হলেও গ্রাম পর্যায়ে অজ্ঞতার কারণে রোগীর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে ভুগতে হয় দীর্ঘমেয়াদে। শিশু থেকে বৃদ্ধ বয়সের মানুষই থাইরয়েডের ভুক্তভোগী। এক সময় বাংলাদেশে থাইরয়েডের উন্নত চিকিৎসা পাওয়া গেলেও বর্তমান দেশেই মিলছে আধুনিক সেবা। ফলে স্বস্তি এসেছে চিকিৎসা প্রত্যাশীদের।
৬০ শতাংশই চিকিৎসার বাইরে
অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড্রোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট অব বাংলাদেশের (এসিইডিবি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি তিন জনের একজন কোনো না কোনো থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত। তবে তাদের অধিকাংশই বিষয়টি জানেন না। বাংলাদেশে থাইরয়েডের রোগীর সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। পুরুষদের তুলনায় নারীরা চার-পাঁচগুণ বেশি আক্রান্ত হয়। তাদের ৬০ শতাংশই চিকিৎসার বাইরে। প্রতি পাঁচ জন থাইরয়েড রোগীর তিনজনই নারী। এ ছাড়া প্রতি ২ হাজার ৩০০ শিশুর মধ্যে একজন জন্মগত থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছে।

প্রায় ৫ কোটি মানুষ এই রোগের ঝুঁকিতে
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত থাকতে পারে। অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি মানুষ এই সমস্যার ঝুঁকিতে আছেন বা আক্রান্ত হয়েও থাকতে পারেন। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ জানেনও না তারা রোগে আক্রান্ত, কারণ অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা যায় ধীরে ধীরে।
থাইরয়েডের বিশ্বমানের চিকিৎসা এখন বাংলাদেশেই
চিকিৎসকরা বলছেন, থাইরয়েডের বিশ্বমানের চিকিৎসা এখন বাংলাদেশেই হচ্ছে। দেশে এখন ৩০০ জনেরও বেশি থাইরয়েড বিশেষজ্ঞ রয়েছে। সময়ের ব্যবধানে আধুনিক প্রযুক্তি, অভিজ্ঞ চিকিৎসক এবং সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশেই থাইরয়েড সমস্যারও চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে। থাইরয়েড জনিত রোগে এখন শুধু প্রয়োজন সচেতনতা ও সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা। এই রোগ নিয়ে আগে জনসাধারণের কাছে তেমন উল্লেখ করার মতো তথ্য-উপাত্ত ছিল না। কিন্তু বর্তমানে এ রোগের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে। দেশের সাধারণ মানুষকে সহজ সরল ভাষায় এ রোগ সম্পর্কে জানাতে হবে, সচেতনতা বাড়াতে হবে।
চিকিৎসকরা জানান, থাইরয়েড গ্রন্থি গলার সামনের দিকে প্রজাপতিসদৃশ একটি গ্রন্থি, যা ঘাড়ের সামনের দিকে শ্বাসনালীর চারপাশে আবৃত থাকে। গ্রন্থিটি ছোট হলেও এর কার্যকারিতা ব্যাপক। শরীরে থাইরয়েড হরমোন কম উৎপন্ন হলে বলা হয় হাইপোথাইরয়েডিজম এবং বেশি উৎপন্ন হলে বলা হয় হাইপারথাইরয়েডিজম। থাইরয়েড সমস্যা হলে শরীরে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এ অবস্থায় থাইরয়েডের লাগাম টানতে নবজাতক জন্মের পর দ্রুত থাইরয়েড পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার পক্ষে মত দিয়েছেন তারা।
তারা বলছেন, নবজাতক শিশুদেরও থাইরয়েডের হরমোন ঘাটতিজনিত সমস্যা হতে পারে এবং তার হার ১০ হাজার জীবিত নবজাতকের মধ্যে দুই থেকে আটজনের হতে পারে। আবার বাড়ন্ত শিশুদের থাইরয়েড হরমোন ঘাটতিতে ভুগতে পারে, যা শিশুদের দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং পরবর্তী সময়ে মেধার উন্নতি করা সম্ভব হয় না। আবার হরমোনের পরিমাণ স্বাভাবিক থেকেও থাইরয়েডের গ্রন্থি ফুলে যেতে পারে। সাধারণত আয়োডিনের অভাবে গলাফোলা রোগ হয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, থাইরয়েড রোগ অনেক সময় নীরবে শরীরের ক্ষতি করে এবং দেরিতে ধরা পড়লে জটিলতা বাড়ে। নিয়মিত স্ক্রিনিং ও চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে এ রোগ সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
জানতে চাইলে থাইরয়েড রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী ঢাকা মেইলকে বলেন, আয়োডিনযুক্ত লবণ খাওয়া ও রেডিয়েশন থেকে মুক্ত থাকতে হবে, বিশেষ করে গর্ভাবস্থায়। হাইপার, হাইপো বা থাইরয়েড প্রদাহজনিত কোনো লক্ষণ দেখা দিলে শিগগিরই রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা নেয়া জরুরি। সেইসঙ্গে ঘ্যাগ বা অন্য কোনো কারণে থাইরয়েড বড় হয়ে গেলে বা ক্যান্সার হলে সার্জারির মাধ্যমে কেটে ফেলা উচিত।
ফজলুল বারী বলেন, যাদের বংশগত থাইরয়েড সমস্যার ইতিহাস আছে, তাদের চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা থাকতে হবে। পাশাপাশি কোনো শিশুর বা বয়স্কদের অবর্ধন শারীরিক ও মানসিক, ঠাণ্ডা বা গরম সহ্য করতে না পারা, বুক ধড়ফড় করা, খাওয়া ও রুচির সঙ্গে ওজন কমা ইত্যাদি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সেইসঙ্গে বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে থাইরয়েড পরীক্ষা ও সময়মতো চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এতে শুধু মায়ের নয়, অনাগত শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎও নির্ভর করে।
মিলছে দাগবিহীন থাইরয়েড সার্জারিও
বর্তমানে বাংলাদেশে থাইরয়েডের ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায় বিষয়টি এমন নয়, আধুনিক বিশ্বে প্রচলিত দাগবিহীন থাইরয়েড সার্জারিও করা যায় দেশে। বছর তিনেক আগে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো দাগবিহীন থাইরয়েড সার্জারি করা শুরু করেন নাক, কান ও গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুব আলম। এখন পর্যন্ত তিনি শতাধিকেরও বেশি রোগীকে এই সার্জারি করেছেন।
জানতে চাইলে মাহবুব আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা নেওয়া সবাই সুস্থ এবং ভালো আছেন। এই পদ্ধতি চিকিৎসা নিয়ে রোগীরাও খুঁশি। নতুন এই পদ্ধতিতে একটি সার্জারি করতে সময় লাগে সাড়াই থেকে তিন ঘণ্টা।
ডা. মাহবুব আলম বলেন, এখন বেশ ভালোই রোগীদের সাড়া পাচ্ছি। মানুষের মধ্যেও একটা সচেতনতা এসেছে, তারা নতুন পদ্ধতিতে চিকিৎসা নিতে চায়। প্রথম শুরু করার সময় অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। নতুন পদ্ধতির সার্জারি কেমন হবে, এ নিয়ে মানুষের মধ্যে ভীতি ছিল। কিন্তু অপারেশনের পর দেখেছেন, এই পদ্ধতিতে গলায় দাগ থাকে না। ঠোটের নিচের ফুঁটো করা দাগটাও কিছুদিন পর মিশে যায়। তাতে মানুষ সত্যি আনন্দিত হয়। দিন দিন দেশের মানুষের মধ্যে এই সার্জারি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। থাইরয়েডের রোগীরা এখন চিকিৎসকের কাছে গেলে, জিজ্ঞেস করে আপনারা দাগবিহীন করবেন নাকি কেটে করবেন? সবার মধ্যে একটি খবর চলে গেছে বাংলাদেশেই দাগবিহীন সার্জারি করা সম্ভব।
এসএইচ/ক.ম