images

হেলথ

ডায়াবেটিস হতে পারে জীবনকে নতুনভাবে শুরু করার একটি সুযোগ

ফিচার ডেস্ক

২৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:৩৫ এএম

আপনি কি জানেন? বাংলাদেশে প্রতি ১০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় ১ জন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আরও আশ্চর্যের বিষয়—এই আক্রান্তদের অনেকেই জানেনই না যে তারা ইতিমধ্যেই এই রোগের ভেতরে ঢুকে পড়েছেন!

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস এখন এক নীরব মহামারি। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) ২০২৪ সালের তথ্যমতে, দেশে প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ কোন না কোনভাবে ডায়াবেটিসে ভুগছেন। শহর হোক বা গ্রাম—অফিসের কর্মব্যস্ত মানুষ থেকে শুরু করে ঘরে থাকা গৃহিণী, ঝুঁকিতে রয়েছেন সবাই।

BeFunky-collage_(14)
মো. আব্দুল মুকিত

ডায়াবেটিস আসলে কী?

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষ শক্তি পায় গ্লুকোজ থেকে। এই গ্লুকোজ কোষের ভেতরে ইনসুলিন ঢুকতে সাহায্য করে। ইনসুলিন একটি হরমোন, যা শরীরে অগ্ন্যাশয় তৈরি করে। যখন ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তখন গ্লুকোজ রক্তে জমে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি করে – যা ডায়াবেটিস হিসেবে পরিচিত।

আরও পড়ুন: ডায়াবেটিস চিকিৎসায় ৫৬ হাজার রোগীর জন্য একজন বিশেষজ্ঞ

ডায়াবেটিসের সাধারণ কিছু লক্ষণ হলো; ঘন ঘন প্রস্রাব, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, চোখ ঝাপসা হওয়া, ক্লান্তি, ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া ইত্যাদি। এই লক্ষণগুলো সাধারণ মনে হলেও বিপজ্জনক। তাই, নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ করানো খুব জরুরি, যাতে করে প্রাথমিক অবস্থাতেই রোগ সনাক্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।

_115501356_1d83c8bf-a3f0-4e5e-87fa-86652cfcfc73

কেন বাংলাদেশে ডায়াবেটিস বাড়ছে?

আমাদের জীবনযাপনের ধরনটাই হয়ে উঠেছে ‘ডায়াবেটিস-বান্ধব’। অফিসের কাজ মানেই সারাদিন বসে থাকা, বাইরে বের হলেই চা-সিগারেট, ফুচকা, চিপস বা অন্যান্য ফাস্টফুড খাওয়া, বাড়ি ফিরে বিভিন্ন ডিভাইজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার মধ্যেও আমাদের দৈনন্দিন জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে করে আমাদের বডি মুভমেন্ট কমে যাচ্ছে, ক্যালোরি ও ওজন বেড়ে যাচ্ছে। ডায়াবেটিস হওয়ার জন্য এই কারণগুলোই যথেষ্ট।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার ১১% থেকে বেড়ে প্রায় ১৪% দাঁড়িয়েছে। এর মূল কারণ; ওজন ও পেটের চর্বি বৃদ্ধি, অধিক পরিমাণে চিনি ও প্রসেসড খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, মানসিক চাপ বৃদ্ধি, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ইত্যাদি। তবে এর সবগুলোই নিয়ন্ত্রণযোগ্য, শুধু প্রয়োজন স্বদিচ্ছা এবং নিয়ম মেনে চলার মানসিকতা।  

1200-675-22518814-thumbnail-16x9-dia

প্রি-ডায়াবেটিক পর্যায় মানেই শেষ নয়!

অনেকে বলেন, ‘আমার তো ডায়াবেটিস নেই, একটু-আধটু সুগার বেশি থাকে।’ এটাই হলো প্রি-ডায়াবেটিক অবস্থা, অর্থাৎ, এখনই পদক্ষেপ না নিলে যেকোন মুহুর্তে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশ্বব্যাপি বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, শুধুমাত্র লাইফস্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রি-ডায়াবেটিক অবস্থা থেকে পুরোপুরি সুস্থ অবস্থায় ফেরা সম্ভব।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধের জন্য ছোট ছোট পরিবর্তন

১. প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করা – অফিসে লিফট বাদ দিয়ে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিট দাঁড়ান, ঘোরাঘুরি করুন।

২. শরীরে চিনি কমানো, ফাইবার বাড়ানো – চা-কফিতে চিনি বাদ দিন, কোমল পানীয় বন্ধ করুন। খাবারে রাখুন ডাল, শাকসবজি, ওটস, ব্রাউন রাইস।

৩. প্রসেসড খাবার গ্রহণ কমানো – প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ফাস্ট ফুড, কেক-পেস্ট্রি—এসব যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।

৪. মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত ঘুমানো – মানসিক চাপ বাড়লে শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়ে, যা ইনসুলিনের কাজ বাধাগ্রস্ত করে। প্রতিদিন ৭-৯ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করুন।

৫. নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা – বিশেষ করে যদি পরিবারের কারও ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে তিন মাসে একবার এইচবিএ১সি পরীক্ষা করুন।

একজন ফিটনেস কোচের দৃষ্টিতে

আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক ক্লায়েন্টকে দেখেছি যারা প্রিডায়াবেটিস থেকে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছেন—কেউ শুধুমাত্র হাঁটা ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণে, কেউ বা এক্সারসাইজ (স্ট্রেন্থ ট্রেনিং) যোগ করার মাধ্যমে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ মানে “ডায়েটিং” নয়; বরং এটি স্মার্ট লাইফস্টাইল – যেখানে খাবার, ব্যায়াম, ঘুম, মানসিক প্রশান্তি—সবকিছু একসাথে কাজ করে। আপনি যদি নিয়মিত নিজের শরীরকে নাড়াতে পারেন, নিজের প্লেটে একটু সচেতন হতে পারেন, তাহলে ডায়াবেটিস আপনাকে ছুঁতেও পারবে না।

ডায়াবেটিস মানে জীবন শেষ নয়

ডায়াবেটিস আক্রান্ত অনেক মানুষ আজ সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। শুধু ওষুধ নয়, সঠিক অভ্যাসই মূল চাবিকাঠি। একটু ভাবুন—প্রতিদিন মাত্র আধঘণ্টা সময় নিজেকে দেওয়া কি এত কঠিন? যে শরীর আপনাকে এত কিছু দিয়েছে, তাকে প্রতিদিন একটু ভালোবাসা দেওয়াটাই তো প্রাপ্য!

ডায়াবেটিস একটি ‘লাইফস্টাইল ডিজিজ’ অর্থাৎ, আপনার লাইফস্টাইল থেকেই এর সৃষ্টি। তাই লাইফস্টাইল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

প্রতিবছর নভেম্বর মাসকে ডায়াবেটিস অ্যাওয়ারনেস মাস হিসেবে উদযাপন করা হয়। তাই আসুন, পরিবর্তনের শুরুটা এই মাস থেকেই হোক। আসুন আমরা সহজ ৩টি বিষয় মেনে চলার চেষ্টা করি; ১) প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটবো; ২) মিষ্টি জাতীয় খাবার গ্রহণ কমাবো এবং ৩) শরীর-মন দুটোই যথাসম্ভব সচল-সতেজ রাখবো। মনে রাখবেন— ডায়াবেটিস মানে জীবন শেষ নয়, বরং এটি হতে পারে জীবনকে নতুনভাবে শুরু করার একটি সুযোগ।

লেখক:

মো. আব্দুল মুকিত

ফিটনেস কোচ ও প্রতিষ্ঠাতা, SHUSTHO

mukit@shustho.life