images

হেলথ

হেপাটাইটিসে আক্রান্ত জানেন না ৯০ শতাংশ মানুষ!

মাহফুজ উল্লাহ হিমু

২৮ জুলাই ২০২৪, ১২:৩২ পিএম

রাজধানীর শ্যামলীর বাসিন্দা আবরার হাসান (ছদ্মনাম)। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স অব বিজসেস এডমিনিস্ট্রেশন (এমবিএ) কোর্সে অধ্যয়নরত এই তরুণ সাম্প্রতিক সময়ে একটি বেসরকারি ব্যংকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পান। তবে লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগদানপত্র পেলেও তার চাকরিতে যোগদান করা হয়নি। কারণ চাকরিতে যোগদানের পূর্বে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তার ‘হেপাটাইটিস বি’ ধরা পরে। এ অবস্থায় ব্যংকটি তাকে নিয়োগ দিতে আপত্তি জানায়। 

ঢাকা মেইলকে আবরার বলেন, বিবিএ (ব্যাচেলর অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন) অধ্যায়নকালীন সময়ে থেকেই চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি। মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার পর একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরির লিখিত ও ভাইভায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দেওয়া হয়। তবে নিয়োগের পূর্বে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় হেপাটাইটিস বি ধরা পরায় আমি যোগদান করতে পারিনি। আমি একাধিক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করিয়েছি। আমি এর আগে কখনও রক্ত দেইনি বা আগে পরীক্ষাও করি নি। আমার তেমন কোনো শারীরিক সমস্যাও নজরে আসেনি। এটা আমার জন্য অবাক করা বিষয় ছিল।

 

আবরারের মতো দেশের বেশিরভাগ মানুষই জানেন না তারা হেপাটাইটিসে আক্রান্ত। পর্যাপ্ত স্ক্রিনিং ও সচেতনার অভাবে শুধুমাত্র রক্ত পরীক্ষা বা নানাবিধ স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়া হেপাটাইটিস শনাক্ত হচ্ছে। হেপাটাইটিস বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত। তবে তাদের মধ্যে শতকরা ৯০ শতাংশ মানুষই জানে না তারা মারাত্মক এ রোগে আক্রান্ত। এ বাস্তবতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়৷ দিবসটির উদ্দেশ্য সারাবিশ্বে হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘এখনই সময় কার্যকর প্রদক্ষেপ নেওয়ার’।

দেশে হেপাটাইটিসের বর্তমান পরিস্থিতি

হেপাটোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের তথ্যমতে, বাংলাদেশে হেপাটাইটিস নিয়ে সর্বশেষ জরিপ পরিচালিত হয়েছে ২০১৮ সালে। দেশব্যাপী পরিচালিত সেই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। এর মধ্যে ৮৫ লাখ হেপাটাইটিস বি এবং ১৫ লাখ হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত। হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্তদের মধ্যে ৫৭ লাখ পুরুষ এবং ২৮ লাখ নারী রয়েছেন। এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্স প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের জন্য ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ৮ হাজার ৬৯৩টি মৃত্যু হয়েছে। আর সি ভাইরাসের জন্য ৮ হাজার ২৯৬টি মৃত্যু হয়েছে। 

এ বিষয়ে হেপাটোলজি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. শাহিনুল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, হেপাটাইটিসের পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে তা ২০১৮ সালের। এরপর সারাদেশে কোনো জরিপ পরিচালিত হয়নি। বর্তমানে আমরা এ সংখ্যা কমার দিকে রয়েছি। আমাদের ধারণা অনুযায়ী বর্তমানে ৫ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত। এই সংখ্যাটি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় কম। অর্থাৎ হেপাটাইটিসের ট্রেন্ড কমার দিকে। ১৯৮৩ সালে দেশব্যাপী ১০ শতাংশ মানুষ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত ছিল; বর্তমানে কমে এসেছে। এর কারণ আমাদের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। এর আওতায় সারাদেশে বাচ্চাদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। আমরা ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকা আওতায় নিয়ে এসেছি।

আরও পড়ুন

‘স্বাস্থ্যের বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যবহার করলে অনেক কিছু করা সম্ভব’

আক্রান্তের হার কমলেও সন্তুষজনক না জানিয়ে তিনি বলেন, হেপাটাইটিসে আক্রান্তের হার ৪ থেকে ৬ শতাংশে আটকে আছি। এর থেকে কমানো সম্ভব হচ্ছে না। ২০১৪ সালে থেকে আমরা এই অবস্থায় আটকে আছি। আক্রান্তের ট্রেন্ড আগে যে হারে কমেছে, বর্তমানে তাও সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে আমাদের সবথেকে বড় সফলতা ৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে প্রাদুর্ভাবের হার এক শতাংশে নামিয়ে আনা। অর্থাৎ সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট গোল (এসডিজি) আমরা অর্জন করতে পেরেছি। এটা ২০০৬-০৭ সালে দুই শতাংশের মতো ছিল। আমাদের লক্ষ্য ২০৩০ এর মধ্যে হেপাটাইটিস বি ও সি-কে নির্মূল করা। 

সংকট ও কুসংস্কার

ডা. শাহিনুল আলম বলেন, আমাদের কিছু সংকট রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্স আমাদের জন্য কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেছে। ডিসেম্বর ২০২২ এ প্রকাশিত কোয়ালিশন ফর গ্লোবাল হেপাটাইটিস এলিমিনেশনের মতে প্রতিবন্ধকতাগুলো হলো, আমাদের পর্যপ্ত পরিসংখ্যান নেই। আমরা নির্মূলের পরিকল্পনা করেছি কিন্তু জাতীয়ভাবে বি ও সি ভাইরাসকে কিভাবে দূর করবো এ বিষয়ক কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। আবার আমরা জাতীয় কোনো গাইডলাইন তৈরি করতে পারিনি। আমাদের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা বা অ্যাকশন প্ল্যান নেই। তারা বলছে, আমারা টার্গেট নির্ধারণ করেছি তবে অ্যাকশন প্ল্যান করিনি। হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা ও চিকিৎসায় আমাদের আর্থিক সহায়তা সীমাবন্ধ। আমরা করোনার ভ্যাকসিন বিনামূল্যে দিচ্ছি কিন্তু বি ভাইরাসের ক্ষেত্রে তা দেওয়া হয় না। সি ভাইরাসের ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে দেওয়া হয়। 

তিনি আরও বলেন, আমাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা বেশিরভাগ মানুষ জানে না তাদের হেপাটাইটিস রয়েছে। এক কোটি মানুষের মধ্যে ৯০ লাখই তাদের রোগের বিষয়ে জানেন না। ফলে আক্রান্তদের রোগের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা তা জানে না। তারা নানাভাবে অন্যদের মাধ্যে তা ছড়াচ্ছে।  

কুসংস্কার ও বৈষম্যের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, হেপাটাইটিস বি ভাইরাস নির্মূলে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা কুসংস্কার ও বঞ্চনা। আমাদের দেশে এটি নিয়ে কখনও আলোচনা হয় না। হেপাটাইটিসে আক্রান্তদের চাকরিতে আনফিট করা হচ্ছে। এটা ঠিক নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আমাদের দেশের শ্রমিকদের এ কারণে নেওয়া হচ্ছে না। যা কোনোভাবেই বৈজ্ঞানিক না। এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট ও চীনে বৈষম্য বিরোধী আইন পাশ করা হয়েছে। চাকরির শারীরিক পরীক্ষা থেকে বি ও সি ভাইরাস পরীক্ষাকে তারা তুলে দিয়েছে। এ ভাইরাসে আক্রান্তরা এন্ডোস্কোপি ও সার্জারি করতে গিয়ে বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। এটা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে কাজ হচ্ছে। আমাদের দেশেও কাজ হওয়া প্রয়োজন। 

এমএইচ/এমএইচএম