Dhaka Mail Logo

বিনোদন

সমু চৌধুরীকে নিয়ে আতঙ্কে থাকেন মা, অর্থের অভাবে আটকে আছে চিকিৎসা 

মো. ইনামুল হোসেন

২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৬ পিএম

পর্দায় সিনিয়র সিটিজেনের চরিত্রে অভিনয়ে ব্যস্ত সময় কাটানোর কথা ছিল তার। ক্যামেরার বাইরেও জনপ্রিয়তা উপভোগের পাশাপাশি সুস্থ জীবন যাপন করাটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সেটি হচ্ছে না জনপ্রিয় অভিনেতা সমু চৌধুরীর ক্ষেত্রে। সামাজিক মাধ্যমে চোখ রাখলেই বিভিন্ন ভিডিওতে অসংলগ্ন অবস্থায় ধরা পড়েন তিনি। কখনও দেখা যায় হেনস্তা হতে। আচরণ দেখে মনে হয় মানসিকভাবে একেবারেই ঠিক নেই সমু চৌধুরী। 

অভিনেতার বর্তমান অবস্থা বিস্তারিত জানতে গতকাল সোমবার যশোর শহরের বেজপাড়া নলডাঙ্গা সড়কে নতুন বাজার এলাকায় অভিনেতার বাড়িতে ঢুঁ মারা। স্থানীয়দের সাহায্য নিয়ে খুঁজে পেতে অসুবিধা হলো না। দুই তলা বাড়ি। ওপরের তলায় পাওয়া গেল অভিনেতার মা জয়নব চৌধুরীকে। তখন সকাল দশটার মতো। সমু চৌধুরীকে পাওয়া গেল না। অভিনেতার মা জানালেন, ভোরে বেরিয়েছেন। তখনও ফেরেননি। জয়নব চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল মানসিকভাবে অসুস্থ অভিনেতা। ছেলের এই ভারসাম্যহীনতা বর্ষীয়ান জয়নব চৌধুরীর জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আতঙ্কের এক কারণ। 

সকালের ঘটনা তুলে ধরলেন। ভোরে মায়ের দরজায় সমু চৌধুরী কড়া নাড়লেও আতংকে খোলেননি জয়নব চৌধুরী। পরে দোতলার মূল দরজায় তালা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েন অভিনেতা। ঘণ্টা খানেক পর বাড়ির নিচ থেকে দোতলার ব্যালকনিতে মা-কে দেখে বলতে শুরু করেন, ‘হায় হায় আমি কী করেছি! আমি আমার মাকে তালাবন্দি করে এসেছি!’ দৌড়ে ওপরে উঠে তালা খুলে দেন। ঢাকা মেইলকে সমু চৌধুরীর মা জানালেন এই মুহূর্তে অভিনেতার প্রয়োজন চিকিৎসা। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি অর্থের অভাবে নিজেও ওষুধ খাচ্ছেন না বর্ষীয়ান এই নারী। 

মা জয়নব চৌধুরীর সঙ্গে সমু চৌধুরী l ছবি: সংগৃহীত
মা জয়নব চৌধুরীর সঙ্গে সমু চৌধুরী l ছবি: সংগৃহীত

সমু চৌধুরীর মা জানান, প্রায় বছর দেড়েক আগে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের একটি মাজারে গামছা পরা অবস্থায় পাওয়া যায় অভিনেতাকে। তখন থেকেই মানসিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি শুরু। জয়নব চৌধুরী বলেন, ‘ময়মনসিংহে ওই অবস্থায় উদ্ধারের পর থেকে পরিস্থিতি অবনতি হতে থাকে সমুর। আচরণে অসংলগ্নতা বাড়তে থাকে। স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গেও সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। এখন যা অবস্থা তা অনেকটাই আয়ত্তের বাইরে।’

সমু চৌধুরীর অসুস্থতার কারণ জানতে চাইলে মা জয়নব চৌধুরী জানালেন মাত্রাতিরিক্ত মাদকাসক্তির প্রভাব এবং একসঙ্গে বাবা-বোনকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারানোর শোক হজম করতে না পারায় মানসিকভাবে ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে থাকেন সমু। তিনি বলেন, ‘ও (সমু চৌধুরী) মাত্রাতিরিক্ত নেশায় আসক্ত। যা তার অসুস্থতার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় একইসঙ্গে বাবা-বোনকে হারানর ধাক্কা সইতে পারেনি। ১৯৯৩ সালে আমার ছোট মেয়ে ও স্বামী অর্থাৎ সমুর ছোট বোন রোজিনা চৌধুরী রুবি এবং বাবা পুলিশ কর্মকর্তা বাবা আবুল কাশেম চৌধুরী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তখন থেকেই আস্তে আস্তে ভারসাম্য হারাতে শুরু করে। তবে তা নিয়ন্ত্রণে ছিল। সম্প্রতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। উদভ্রান্ত জীবন যাপন করছে।’ 

জয়নব চৌধুরী জানালেন, ছেলের যেন তার ওপর ক্ষোভ বেশিই। বাবা-বোনের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার জন্যও মাকে অভিযুক্ত করেন। করেন অস্বাভাবিক আচরণ। জয়নব চৌধুরী বলেন, ‘আমি ওকে নিয়ে আতংকে থাকি। কারণ ও মনে করে আমার জন্যই ওর বাবা-বোন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। মাঝে মাঝেই বলে তুই আমার বাপ-বোনকে খেয়েছিস। এমনিতে আপনি করে কথা বলে। নিয়ন্ত্রণ হারালে তুই-তোকারি করে আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করে। আমি ভয়ে ওর সঙ্গে বাদানুবাদ করি না। টাকা-পয়সা যখন যা চায় দিয়ে দেই। না করি না। কেননা কখন আবার মেজাজ হারায়! ওকে নিয়ে আমি ভীষণ আতংকে থাকি।’ 

সমু চৌধুরী
সমু চৌধুরী

আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরলেন সমু চৌধুরীর মা। দুই তলা বাড়ির নিচতলায় দুটি দোকান ও একটি পরিবার ভাড়া থাকে। ওপর তলায় বাস সমু চৌধুরীর। আরও থাকেন তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী-কন্যা এবং অভিনেতার মা। সমুর ছোট ভাই ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। দোকান ও বাসা ভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ এবং ছোট ছেলের বেতনের টাকায় কষ্টে সৃষ্টে সংসার চলে জয়নব চৌধুরীর। অথচ এক সময় সুদিন ছিল। সমু চৌধুরীর অসুস্থতার সঙ্গে সঙ্গে অনটন জেঁকে বসেছে বলে জানালেন অভিনেতার মা।

বললেন, ‘একসময় ব্যস্ত অভিনেতা ছিল সমু। তখন কোনো অভাব ছিল না আমাদের। দুই হাত ভরে টাকা দিত আমার ছেলে। কোনো কার্পণ্য করত না। এই যে বাড়ি সংসার সব তার হাতে গড়া। অসুস্থতার কারণে তার কাজ নেই। আমাদেরও দিন কাটছে অভাব অনটনে।’

ছেলের সোনালী দিনগুলোর স্মৃতিগুলো আজও ধরে রেখেছেন জয়নব চৌধুরী। অভিনেতার ঘরে আসবাব বলতে একটি খাট ও ওয়ার্ডরোব। সেটি খুলে দেখালেন। নজরকাড়া পোশাকাদিতে ভর্তি। একসময় সেসব পরে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতেন। এখনও সেসব জয়নব চৌধুরী আগলে রেখেছেন যক্ষের ধনের মতো। 

প্রায় বছর দেড়েক আগে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে এভাবেই পাওয়া যায় অভিনেতাকে
প্রায় বছর দেড়েক আগে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে এভাবেই পাওয়া যায় অভিনেতাকে

অর্থের অভাবে থমকে আছে সমু চৌধুরীর চিকিৎসা। অভিনেতাকে সুস্থ করে তুলতে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হয়েছিল পরিবার। এরকম উল্লেখ করে জয়নব চৌধুরী বলেন, ‘ময়মনসিংহ থেকে উদ্ধারের পর সমুকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। কিন্তু ও পরিচিত মানুষ। তাই রাজি হননি চিকিৎসকরা। তাদের আশঙ্কা ভালো থেকে মন্দ কিছু হলে চিকিৎসকদের ভোগান্তি পহাতে হবে।’ এরপরও হাল ছাড়েনি পরিবার। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক দুর্দশা। জানালেন ভাড়া ও ছোট ছেলের আয় দিয়ে কোনোমতে চলে সংসার। তাই ইচ্ছা থাকলেও সমু চৌধুরীর চিকিৎসা সম্ভব হচ্ছে না। 

জয়নব চৌধুরীর কথায় পরিবারের অর্থনৈতিক হাড় জিরজিরে অবস্থা উঠে এলো। জানালেন অর্থের অভাবে নিজেও খাচ্ছেন না ওষুধ। বললেন, ‘সাত-আট বছর আগে ব্রেন স্ট্রোক হয় আমার। তারপর থেকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে সংসার চালানোই কষ্টকর। চার-পাচ মাস ধরে তাই নিজেও ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।’ 

তবে সামর্থ্য না থাকলেও সমুর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ত্রুটি নেই অভিনেতার মায়ের। জানালেন অভিনয় অঙ্গনের কেউ যোগাযোগ না করলেও তারা যোগাযোগ করেছেন। দিন দশেক আগে ছোট পর্দার অভিনয় শিল্পীদের সংগঠন অভিনয় শিল্পী সংঘের যোগাযোগ করেছেন তারা। এদিকে জয়নব চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই বাড়ি ফেরেন সমু চৌধুরী। তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে শুরুতে স্বাভাবিক আচরণ করলেও পরে অনেকটা আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করায় কথা বলা সম্ভব হয়নি প্রতিবেদকের পক্ষে। 

Somu_chawduri-768x402

এদিকে অভিনয় সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ঢাকা মেইলকে জানালেন কিছুদিন আগে অভিনেতার পরিবার যোগাযোগ করে তাদের সঙ্গে। বললেন, ‘সমু চৌধুরীর ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। ওনার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। আমরা ওনার চিকিৎসার জন্যও প্রস্তুত। পরিবারের সম্মতি পেলেই শুরু করব।’

সংঘের সম্পাদক আরও বললেন, ‘গফরগাঁওয়ে সমু চৌধুরীকে অসংলগ্ন অবস্থায় পাওয়া গেলে অভিনয় সংঘ থেকেই ওনাকে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সে সময়-ই আমরা সমুদার চিকিৎসার ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার পরিবার রাজি হয়নি।’ 

কিছু প্রতিবন্ধকতাও তুলে ধরলেন অপু। বললেন, ‘সমু চৌধুরীর যে বয়স সেক্ষেত্রে তাকে রিহ্যাবে নেওয়া কিংবা চিকিৎসা করানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। যা কোনো সংগঠনের পক্ষে সম্পূর্ণরূপে সম্ভব না। পরিবারকেও সঙ্গে থাকতে হবে। তারপরও আমরা ওনার চিকিৎসার ব্যাপারে প্রস্তুত। যত খরচই হোক করতে রাজি। এরইমধ্যে কাজ শুরু করেছি। ওনার পরিবার অনুমতি দিলেই  বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’ 

আরআর