Dhaka Mail Logo

বিনোদন

বাচ্চুকে এক নজর দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম: মানাম আহমেদ 

রাফিউজ্জামান রাফি

১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১০ পিএম

চলে যাওয়ার আট বছর পরও অষ্টপ্রহর শুভানুধ্যায়ী ও সহকর্মীদের হৃদয়ে দাপুটে বিচরণ আইয়ুব বাচ্চুর। বছর ঘুরে ১৮ অক্টোবর এলে তা প্রকট হয়। আজ গায়কের মৃত্যুবার্ষিকীতে সামাজিক মাধ্যমে চোখ রাখলেই বোঝা যাচ্ছে তা। এ ব্যান্ড তারকার প্রয়াণের দিনে তাকে নিয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন বিখ্যাত সুরকার-সংগীত পরিচালক এবং জনপ্রিয় ব্যান্ড মাইলসের অন্যতম সদস্য মানাম আহমেদ। 

আইয়ুব বাচ্চুর আচমকা চলে যাওয়ার খবর সেদিন স্তব্ধ করে দিয়েছিল মানাম আহমেদকে। তিনি বলেন, ‘আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। কখনও ভাবিনি এরকম সংবাদ শুনব। কী বলব, কী করব, কাকে ফোন দিয়ে জানতে চাইব কীভাবে কী হলো—বুঝতে পারছিলাম না। পরে মাথা ঠান্ডা করে সম্ভবত পার্থ বড়ুয়া কিংবা শামীমকে (এলআরবির শব্দ প্রকৌশলী) ফোন করে নিশ্চিত হই। এরপর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম— কখন বাচ্চুকে এক নজর দেখব।’

আইয়ুব বাচ্চু ও মানাম আহমেদ একই পাড়ায় থাকতেন। দুজনের সখ্যতাও ছিল গভীর। তার কথায়, ‘বাচ্চুর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল বন্ধুর মতো। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুর চেয়েও বেশি। একজন আরেকজনের যেকোনো সৃষ্টিকর্ম নিয়ে অ্যাপ্রিশিয়েট করতাম। কোনটা ভালো হয়েছে, কী স্টাইলে করা হয়েছে, কেমন লাগছে— আলোচনা করতাম। একই পাড়ায় থাকতাম। আমার ছেলেরাও তাকে দেখেই তারা গিটারে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। আমার বড় ছেলে জাহিন; সেও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে প্রায় সাত-আট বছর। জাহিনকে প্রথম ইলেক্ট্রিক গিটার কিনে দিলাম। সে সঙ্গে সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চু চাচার কাছে গেল। তাকে দেখাল। বাচ্চুও তাকে একটু লেসন-টেসন দিল, খুব আদর করল। আমার ছোট ছেলে জেরিফকে সে গিটার গিফট করেছিল। ওকে কোথাও বাজাতে দেখে গিফট করেছিল। বুঝতেই পারছো, কতটা আপন হলে একজন আরেকজনের জন্য এতটা অনুভব করে!’ 

manam_20251009_184821864

মানাম আহমেদের মতে আইয়ুব বাচ্চুর সংগীত ছিল বৈচিত্র্যময়। তার কথায়, ‘মিউজিশিয়ান হিসেবে আইয়ুব বাচ্চুর মধ্যে অনেক বৈচিত্র্যতা ছিল। গিটারিস্ট হিসেবে সে ওয়াইড রেঞ্জ কভার করে ফেলেছিল। স্টেজে বিভিন্নভাবে গিটার বাজিয়েছে। অনেকরকম স্টাইল, জনরা নিজের দখলে নিয়েছিল। তার রক কেন্দ্রিক ফ্লেভার বেশি ভালো ছিল। এর বাইরেও সে অনেক রকম গান করেছে। যেমন তপন চৌধুরী, আবিদুর রেজা জুয়েল, আলম আরা মিনুর জন্য গান করেছে। তেমনই কানিজ সুবর্ণার জন্যও গান করেছে। নাটক, সিনেমার বিভিন্ন রকম গান করেছে। তার মধ্যে যে বৈচিত্র্যতা ছিল, সেটা কল্পনাতীত। মিউজিশিয়ান হিসেবে আমি মনে করি একজন মিউজিশিয়ানের জন্য— গিটারিস্ট হিসেবে বিভিন্ন রকম জঁনরাকে দখলে আনা, সুরকার হিসেবে বিভিন্ন রকম গান করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করা বিরাট চ্যালেঞ্জ।’ 

এক মঞ্চে অসংখ্যবার কনসার্ট করেছে এলআরবি-মাইলস। ফলে গ্রিনরুমে জমেছে আড্ডা। সে প্রসঙ্গে বলেন, ‘এক মঞ্চে আমরা অনেকবার বাজিয়েছি। গ্রিনরুমে অনেক ধরণের হাসিঠাট্টা হতো। অনেক কথা হতো। বাচ্চু সব ব্যাপারে খুব সিরিয়াস হয়ে যেত। অনেক ইচ্ছা, অনেক চিন্তাভাবনা শেয়ার করত। আমরা অনেক পরিকল্পনা করতাম। যদিও ব্যস্ততার কারণে সেসব গ্রিনরুমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। দুজন মিলে ইন্সট্রুমেন্টাল বানানোর বিষয়ে কথা হয়েছিল। আমি কিবোর্ড বাজাব, সে গিটার বাজাবে। কিন্তু আমরা অন্য কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে আর হয়ে ওঠেনি।’ 

দেশের ব্যান্ড সংগীত আনাচকানাচে ছড়িয়ে দিতে যাদের অবদান রয়েছে তাদের একজন আইয়ুব বাচ্চু। তবে মানাম আহমেদ তা বিশ্লেষণ করলেন বিস্তৃত পরিসরে। তার কথায়, ‘ব্যান্ড সংগীত সমষ্টিগত মুভমেন্ট। যেটা উচ্চারণ, স্পন্দন, সোলস থেকে শুরু হয়েছিল। সে (আইয়ুব বাচ্চু) সোলসে থাকা অবস্থায় একটা অবদান ছিল। আমরা যারা আশির দশকের ব্যান্ড সোলস, মাইলস, ফিডব্যাক— তখন থেকে মুভমেন্ট শুরু। এলআরবি নিয়ে বাচ্চু পরে এসেছে। ব্যান্ড মিউজিকের অ্যাসোসিয়েশন বামবা গঠনের পর আমরা প্রত্যেকে নিজেদের জায়গা থেকে কাজ করেছি। শুধু বাচ্চুকে নিয়ে বললে বিষয়টি অন্যরকম হয়ে যাবে। মাইলস, এলআরবি, নগরবাউল, ফিডব্যাক, অবসকিউর, উইনিং— প্রত্যেক ব্যান্ডই ব্যান্ড সংগীতকে সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে অবদান রেখেছে। বাচ্চুকে নিয়ে এককভাবে বললে, সে বিভিন্ন ধরনের গান করেছে, যেগুলো শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়েছে।’ 
 LRB_Ayub_Bachchu

সম্প্রতি আইয়ুব বাচ্চুর গান কণ্ঠে তুলে সমালোচিত হয়েছেন অনেকে। একটি গোষ্ঠী তার গান অন্যের কণ্ঠে শুনতে নারাজ। এ সংগীতজ্ঞ বললেন, ‘আইয়ুব বাচ্চু থাকা অবস্থায়ও অনেকে তার গান কভার করত। এটা করা যায়। কিন্তু যে কারও গান গাইতে হলে সঠিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। যার বা যাদের সৃষ্টি তাদের অনুমতি নিতে হবে। নইলে এটা বেআইনি। যদিও আমাদের এখানে এসব কখনও ছিল না। আজকাল চর্চাটা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বাচ্চুর কিছু গান কভার করে একটি অ্যালবাম করা হয়েছিল। সেখানে যারা পারফর্ম করেছেন তারা কিছু গান নিজেদের মতো করেছেন, যা অনেকের ভালো লাগেনি। আমার কাছেও কিছু গানের ক্ষেত্রে এরকম মনে হয়েছে। আমি মনে করি এ ধরনের প্রজেক্ট করা যাবে না তা। তবে এমন একজন প্রডিউসার থাকতে হবে যিনি মিউজিকটা বোঝেন। ঠিকমতো গাইড না করলে কভার করা উচিত না।’ 
 
এ সংগীতজ্ঞ মনে করেন একটি গান সৃষ্টির সময় সুর-সংগীতে শিল্পী তার সমস্ত আবেগ নিংড়ে দেন। সেই গভীরতা ও আবেদন অক্ষুণ্ণ রেখেই তাতে হাত দেওয়া উচিত।

আরআর