রাফিউজ্জামান রাফি
১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ পিএম
আজ ১৮ অক্টোবর। ২০১৮ সালের এই দিনে কিংবদন্তি ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে নড়ে ওঠে দেশ। শোকে স্তব্ধ হয় বাংলা ভাষাভাষীরা। আট বছর পরও শোকের দাগ শুকায়নি। দিনটিতে অন্যদের মতো হারানোর যন্ত্রণায় পোড়েন নন্দিত গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গী।
সংগীতাঙ্গনে আইয়ুব বাচ্চু যাদের স্নেহভাজন ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম বরেণ্য এই গীতিকার। ‘আজ যে শিশু’, ‘হৃদয় কাদামাটির কোনো মূর্তি নয়’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের রচিয়তা বরেণ্য এ গীতিকবির গান দিয়ে গায়ক বাচ্চুর যাত্রা শুরু। রক আইকনের চলে যাওয়ার দিনে তাকে নিয়ে ঢাকা মেইলের কাছে স্মৃতিচারণ করেছেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী।
আইয়ুব বাচ্চু মৃত্যুতে যখন গোটা দেশ কাঁদছিল শহীদ মাহমুদ জঙ্গী তখন যুক্তরাষ্ট্রে। সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে শোক আক্রান্ত করেছিল তাকে। ট্রমায় চলে গিয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আমেরিকা ছিলাম। আচমকা খবরটা পাই। প্রস্তুত ছিলাম না। এমন না যে বাচ্চু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিল। তাই সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। আমি তিন চারদিন ট্রামায় ছিলাম। ও চলে যাওয়ার ১০ দিন পর দেশে ফিরি। ততদিনে ওকে সমাহিত করা হয়েছে।’
_20261018_120015977.jpg)
জঙ্গি মনে করেন অবেলায় চলে গেছেন বাচ্চু। নইলে সংগীত অঙ্গন আরও সমৃদ্ধ হতো।তার কথায়, ‘আমার মনে হয় বাচ্চু তাড়াতাড়ি চলে গেছে৷ কেননা আজকাল মানুষ এত অল্প বয়সে মারা যায় না। বেঁচে থাকলে আরও কিছু গান আমরা পেতাম। সংগীত অঙ্গনও সমৃদ্ধ হতো।’
এলআরবি ব্যান্ডের পথচলাও এই গীতিকবির গানে (ঘুম ভাঙা শহরে)। মানুষটিব সঙ্গের গায়কের ছিল গভীর সখ্যতা। আজকের শিশুর গীতিকার বলেন, ‘বাচ্চুর প্রথম শুরুটা আমার গানে। ব্যান্ডেও শুরু আমার গানে। কিন্তু সে যত বড় তারকা ছিল অতো উঁচুতে গেলে মানুষ অনেক সময় অনেক কিছু মনে রাখে না। পরিবেশ পরিস্থিতির কারণেও এরকম হয়। কিন্তু বাচ্চুর মধ্যে এগুলো ছিল না। ওর এবি কিচেনে (স্টুডিও) একটা বড় টেবিল ছিল। যার অপর পাশে একটা বড় চেয়ার। যেখানে বাচ্চু বসত। আমি গেলে সে চেয়ারটা ছেড়ে দিত। বারবার বলতাম এটা তোমার চেয়ার। কোনোভাবেই শুনত না।’
শ্রদ্ধা প্রদর্শনে আইয়ুব বাচ্চুর কোনো ঘাটতি ও কৃত্রিমতা ছিল না। স্পষ্ট হলো আরও এক গল্পে। যা বললেন, ‘এলআরবির ২৫ বছর পূর্তির পরদিন সে আমাকে জোর করে এক টিভি অনুষ্ঠানে নিয়ে যায়। ওই অনুষ্ঠানে সে একটা কথাও বলল না। সব প্রশ্নের উত্তর আমাকে দিয়ে দেওয়ালো। এই যে বড়দের প্রতি সম্মান; সেটা সবসময়-ই তার মধ্যে ছিল। তবে আমার সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা বেশি ছিল। বড় ভাইয়ের মতো জানত। সেজন্য-ই বেশি খারাপ লাগে।’

এলআরবি গঠনের আগে সোলসে গিটারিস্ট ছিলেন বাচ্চু। এক দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যান্ডটির সঙ্গ ত্যাগ করেন তিনি। একা পথ নতুন করে শুরু করেন ঘুম ভাঙা শহরের কিশোর ছেলেটির হাত ধরে। জঙ্গী বলেন, ‘ঘটনাটি হোটেল ব্লু নেইলের। তখন ব্যান্ড মিউজিকের আড্ডাটা সেখানেই ছিল। ওইদিন চারতলায় সোলসের মিটিং ছিল। দুপুরের দিকে আমি উঠছি। দেখি বাচ্চু সিঁড়ি বেঁয়ে নামছে। ওর চোখ ছলছল করছিল। আমাকে দেখে বলল ভাই, সোলস ছেড়ে দিলাম। আপনার গানটা (ঘুম ভাঙা শহরে) নিয়ে যাচ্ছি। আমি আর ওপরে না উঠে ওকে নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে বসলাম। ওখানে আমাদের এক বন্ধু ছিল। শহিদুল হক। সেও এসে বসল। অনেক কথা হলো। আমি বললাম, চিন্তার কিছু নাই। তুমি দাঁড়িয়ে যাবে৷ এটাকে স্বাভাবিক ব্যাপার ধরে নাও। তারপর তো সে ইতিহাস করল।’
জঙ্গী জানান, আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন টুয়েন্টি ফোর আওয়ারস মিউজিশিয়ান। তার কথায়, ‘বাচ্চু সারাক্ষণ মিউজিক নিয়ে চিন্তা করত। যেখানেই থাকুক মাথার মধ্যে শুধু মিউজিক ঘুরত। আমরা একসাথে আড্ডা দিতাম। হয়তো ক্রিকেট নিয়ে গল্প হচ্ছে। কিংবা ওয়ার্ল্ড কাপ চলছে। সেটা নিয়ে কথা হচ্ছে। বাচ্চু করত কি; গল্পে অংশ নিয়ে আস্তে আস্তে পুরা গল্পটাকে মিউজিকে নিয়ে আসত। চলনে বলনে কথাবার্তায় ২৪ ঘণ্টা মিউজিশিয়ান ছিল সে।’
আরও একটি ঘটনার বর্ণনা দিলেন এ গীতিকার। বললেন, ‘‘একবার আমরা ১৫-~২০ জন বন্ধু বান্ধব ফরেস্ট হিল পাহাড়ে গেছি। সবাই গল্প করছি। হঠাৎ সে (আইয়ুব বাচ্চু) আমার পাশে এসে বলল, ভাই আমার সাথে আপনাকে একটু যেতে হবে। আমি বললাম, কেন? বলল, কথা আছে একটু চলেন না! আমি বললাম, এখানে সবাই বসে গল্প করছি। এখন তোমার সঙ্গে গেলে হবে নাকি! এখন না। সে বলে, আসেন না! বেশিক্ষণ লাগবে না। তারপর আমার হাতটা ধরে নিয়ে গেল। নিরিবিলি এক জায়গায় বসে বলল, একটা গান লেখেন। আমি বললাম, আরে এখানে এসেছি খাওয়া দাওয়া করতে, আড্ডা দিতে। এখানেও তোমার গান! তখন বলে, বস একটা করে দেন না! তখন আমি একদিন ঘুমভাঙা শহরের চার লাইন লিখছি। লেখার পর দেখি ওখানে নিচে ফুলের পাপড়ি বিছিয়ে আছে। আমি বললাম, বাচ্চু এই গানটা থাক। অন্য একটি গান লিখে দিচ্ছি তোমাকে। তখন লিখলাম, ‘কি জানি কি এক দিন ছিল, ঘাসের দোলায় দুলছিল, এলিয়ে চুল তুমি ছিলে, তুমি ছিলে আমি ছিলাম৷ তুমি নেই আমি নেই।’ ওর কাছে গিটার থাকতই। তখনই সুর করল। এই হচ্ছে বাচ্চু। সে যাই করুক ফিনিশিংটা হতো গান দিয়ে।’’

এ গীতিকার মনে করেন শ্রোতাদের খালি হাতে ফেরাতেন না আইয়ুব বাচ্চু। তার সুর ছিল সব শ্রেণির জন্য। এজন্য এলিট শ্রেণির কটাক্ষও সইতে হয়েছে গায়ককে। বললেন, ‘‘বাচ্চু সবার জন্য গান করত। বিষয়টা আমরা তখন হয়তো অনেকে বুঝতে পারিনি। এ নিয়ে তার সমালোচনাও হয়েছে। একদিন এক মিউজিশিয়ান আমাকে বলেছিল, জঙ্গি ভাই, বাচ্চুকে একটু থামান। সে ‘সাড়ে তিন হাত মাটি টাটি’ কি সব গাইছে! আপনাদের ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’ গাওয়ার পর কি এগুলো গাওয়া চলে! আমি তাকে বললাম, অসুবিধা কী? তুমি যেমন তার ঘুম ভাঙা শহরে পছন্দ করছ। তেমনই তার এই গানগুলোও পছন্দ করার লোক আছে। অর্থাৎ এক শ্রেণির কাছে তার ‘রূপালি গিটার’ ভালো লাগছে। কিন্তু সেটা একজন রিকশাওয়ালার ভালো লাগছে না। সে শুনছে ‘আম্মাজান’ কিংবা ‘সাড়ে তিন হাত মাটি’। আবার কিছু লোক আছে যারা একটু রোমান্টিক ধরনের। তাদের জন্য তার প্রচুর গান আছে। ‘সেই তুমি’ সহ আরও কত! সে সব শ্রেণির শ্রোতাদের জন্য গান করেছে। সে কারণেই সবার কাছে তার জনপ্রিয়তা। তার জানাজায় সব শ্রেণির লোক আসার কারণও এটা।’’
অনেক শিল্পীই জীবদ্দশায় প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত থাকেন। এ নিয়ে অনেকে আক্ষেপও করেন। তবে শহীদ মাহমুদ জঙ্গী মনে করেন আইয়ুব বাচ্চুর বেঁচে থাকতেই তাঁর সম্মান পেয়েছেন। সেটি হচ্ছে মানুষের ভালোবাসা। বরেণ্য এ গীতিকার মনে করেন এই পুরস্কারের চেয়ে বড় সম্মাননা আর কিছু নেই।
আরআর