Dhaka Mail Logo

বিনোদন

সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর সমস্যা ও সিটি করপোরেশনের বক্তব্য

রাফিউজ্জামান রাফি

১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দ্বারা পরিচালিত ১৭টি সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র নিয়ে করা ঢাকা মেইলের প্রতিবেদনের শেষ পর্ব প্রকাশ পেল আজ। এতে উঠে এসেছে কেন্দ্রগুলোর আরও কিছু প্রতিবন্ধকতা এবং দুই সিটি করপোরেশনের বক্তব্য।

সম্মানী বৃদ্ধির দাবি শিক্ষকদের

সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর শিক্ষকদেরও রয়েছে আক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে সম্মানী বৃদ্ধি পাচ্ছে না বলে জানালেন তাঁরা। যাত্রাবাড়ী কেন্দ্রের শিক্ষক আরতী দেবী (ছদ্মনাম) বলেন, ‘কেন্দ্রগুলোতে যারা শিক্ষকতা করছেন তাদের সবার ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো। ভালো প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছেন। নিয়োগও হয়েছে সঠিকভাবে। কিন্তু যে সম্মানী পাচ্ছি সেটা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে পর্যাপ্ত নয়। অনেক বছর হলো আমাদের সম্মানী বৃদ্ধি পাচ্ছে না।’ অন্য কেন্দ্রের শিক্ষকদেরও দাবি সম্মানী বৃদ্ধির। জানা গেল, উত্তরের শিক্ষকরা এরই মধ্যে সিটি করপোরেশনে দেওয়া একটি লিখিত প্রস্তাবনায় সম্মানী বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন।

বাসাবো সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র l ছবি: ঢাকা মেইল
বাসাবো সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র l ছবি: ঢাকা মেইল

দক্ষিণের কয়েকটি কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২ কেন্দ্রের চারটিতে শিক্ষাদান কার্যক্রম নেই। সেগুলোর একটি সূত্রাপুর সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের সংগীত শিক্ষা কেন্দ্র। ভালোই চলছিল বলে জানান শিক্ষক দেবী বসাক (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, ‘প্রথমে কেন্দ্রটি সূত্রাপুর ব্যায়ামাগারে ছিল। সাঈদ খোকন মেয়র থাকাকালীন সেটি মেথররা দখল করে নেয়। সে সময় জায়গাটি উদ্ধারে নিজ উদ্যোগে জিডি করি। সচিবের কাছেও লিখিত দিই। কিন্তু সুরাহা হয়নি। পরে আমাদের জহির রায়হান নাট্যমঞ্চে (জহির রায়হান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র) ক্লাস নিতে বলা হয়। সেখানে ভালোই চলছিল। ৬০-৬৫ জন ছাত্রছাত্রী ছিল। কিন্তু ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। আর চালু হয়নি। অনেকবার কথাবার্তা বলেছি। শুনছি আবারও চালু হবে স্কুলটি।’ দেবী বসাক এখন যাত্রাবাড়ী কেন্দ্রে ক্লাস নেন।

সূত্রাপুর শাখার মতোই কার্যক্রম বন্ধ পল্টন সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য কেন্দ্রের এক শিক্ষক জানান, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় আগুন দেওয়া হয় কেন্দ্রটিতে। এরপর আর চালু হয়নি। এই কেন্দ্রের শিক্ষকরা সিটি করপোরেশনে হাজিরা দেন বলে জানান ওই শিক্ষক।

কার্যক্রম বন্ধ ছিল রায়ের বাজার কেন্দ্রেরও। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের দিন ভাঙচুর চালানো হয় কেন্দ্রটিতে। করা হয় লুটপাট। শিক্ষক সুব্রত হাওলাদার (ছদ্মনাম) বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের দিন হামলা চালানো হয়। সিকিউরিটিকে বেঁধে গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকে হামলাকারীরা। চেয়ার-টেবিল যা ছিল সব নিয়ে যায়। বিদ্যুৎও ছিল না। ক্লাস নেওয়ার পরিবেশ ছিল না। ফলে শিক্ষার্থীরাও চলে যায়।’ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফের কার্যক্রম শুরু হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বছর দুয়েক বন্ধের মতো ছিল। তবে আমরা শিক্ষকরা আসতাম। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পুরোদমে শুরু করি। এখন ১৮ জন শিক্ষার্থী আছে।’

হাজী জুম্মন সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রটি যেন ভাসমান ভেলা। আজ এখানে তো কাল ওখানে কার্যক্রম চলছে কেন্দ্রটির। শুরুতে ছিল হাজী জুম্মন সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রে। ৪-৫ বছর পর ভবনটি ভেঙে ফেললে ফকির চান কমিউনিটি সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। তার বছর দুয়েক পর সাঈদ খোকন কমিউনিটি সেন্টারে নেওয়া হয়। ছয়-সাত মাস পর স্থানান্তর করা হয় বংশাল এলাকায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখনও সেখানেই আছে। বারবার স্থানান্তরই এ স্কুলের বড় প্রতিবন্ধকতা বলে জানালেন শিক্ষক মাহবুব (ছদ্মনাম)। বললেন, ‘এতবার জায়গা বদলানোই মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে না পাওয়া যাচ্ছে শিক্ষার্থী, না জমে উঠছে স্কুলটি।’

অঞ্চল-৩ (খিলগাঁও)-এ তিনটি সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র ছিল। হাজী গোলাম মোর্শেদ (বকশীবাজার) সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র, ইসলামবাগ সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র এবং নবাবগঞ্জ সাত শহীদ সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রে কার্যক্রম চলত কেন্দ্র তিনটির। নবাবগঞ্জ কেন্দ্রের শিক্ষক সেলিম (ছদ্মনাম) জানালেন, কেন্দ্র তিনটি এখন আর আলাদা নেই। বছর তিনেক হলো একীভূত করা হয়েছে।

ধলপুর সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র l ছবি: ঢাকা মেইল
ধলপুর সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র l ছবি: ঢাকা মেইল

প্রতিবন্ধকতায়ও দমেনি প্রতিভা

প্রতিবন্ধকতার মাঝেও সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষার্থীরা জ্বলে ওঠে আপন শক্তিতে। তাদের কেউ কেউ বেতার-টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী। শিক্ষকরা জানালেন, প্রতি বছর নতুন কুঁড়িসহ বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় মেধার স্বাক্ষর রাখছে শিক্ষার্থীরা।

সিটি করপোরেশনের উদাসীনতা

সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর সমস্যা সমাধানে সিটি করপোরেশন উদাসীন বলে জানালেন শিক্ষকরা। সমস্যা উত্থাপন করলে লিখিত দিতে বলা হয়। দিলেও হয় না সমাধান। এরকম উল্লেখ করে মিরপুর কেন্দ্রের শিখা কর্মকার (ছদ্মনাম) বলেন, ‘কী কী লাগবে—লিখিত দিতে বলে। দিলে বছরের পর বছরও বাস্তবায়ন হয় না।’ নবাবগঞ্জ কেন্দ্রের শিক্ষক সেলিম বললেন, ‘এই প্রজেক্টের আওতায় অনেক অফিসার আছেন কিন্তু নজরদারি করেন না। হয় না নিয়মিত মিটিং। বছরে দুই-একবার ডাকা হয়। সেখানে সমস্যাগুলো উত্থাপন করা হলেও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা অধরাই থেকে যায়।’ যাত্রাবাড়ী কেন্দ্রের শিক্ষক শাফায়েত (ছদ্মনাম) বলেন, ‘মিটিংয়ে কিছু সমস্যা সমাধান হলেও আসল সমস্যাগুলো থেকেই যায়। সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও করা হয় না।’ হাজী জুম্মন কেন্দ্রের শিক্ষক মাহবুব বলেন, ‘নিয়মিত মিটিং খুব কম হয়। ফলে সমস্যা জমতে জমতে পাহাড়সম হয়। সেসব উত্থাপন করলে বলে দেখবে। কিন্তু দেখাটা হয় না তেমন।’ নবাবগঞ্জ কেন্দ্রে পরীক্ষাও নেওয়া হয় না শিক্ষার্থীদের। শিক্ষক সেলিম বলেন, ‘৩ বছরের সিলেবাস, বছরে দুইবার পরীক্ষা নেওয়ার কথা। ওপর থেকেও বলে না, শিক্ষকদেরও গাফিলতিতে নেওয়া হয় না। এ পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরাও থাকে না। ভর্তির কিছুদিন পর চলে যায়।’

কারওয়ান বাজার আব্দুল হালিম কমিউনিটি সেন্টারের সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র l ছবি: ঢাকা মেইল
কারওয়ান বাজার আব্দুল হালিম কমিউনিটি সেন্টারের সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র l ছবি: ঢাকা মেইল

 

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য

সংগীত কেন্দ্রগুলোর বিবিধ সমস্যা সিটি করপোরেশনের কাছে তুলে ধরলে ঢাকা মেইলকে উত্তর সিটি করপোরেশনের সমাজসেবা বিভাগ থেকে বলা হয়, কিছুদিন আগে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাদের একটি প্রস্তাবনা রয়েছে আমাদের কাছে। সে অনুযায়ী বাকি প্রতিবন্ধকতাগুলো দূরীকরণে কাজ চলছে। সাইনবোর্ড প্রসঙ্গে বলা হয়, কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে অনেক ইভেন্ট প্রতিষ্ঠান থাকে। তারা সাইনবোর্ডগুলো নষ্ট করে দেয়। ফলে বারবার সাইনবোর্ড দিলেও থাকে না। এ ব্যাপারে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সিটি করপোরেশনের। অপরিষ্কার ও অনুপযুক্ত পরিবেশ প্রসঙ্গে তাদের বক্তব্য, কেন্দ্রগুলোতে সপ্তাহে দুই দিন ক্লাস হয়। ওই দিনগুলো সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্ন কর্মীদের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন করে শিক্ষার্থীদের ক্লাস পরিচালনা করা হয়। যেহেতু রোজ ক্লাস হয় না, তাই মাঝে মাঝে হয়তো অপরিচ্ছন্ন পাওয়া যায়। তবে আমরা চেষ্টা করি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে। এরইমধ্যে এ প্রসঙ্গে একটি প্রস্তাবনা পেয়েছে করপোরেশন। বিষয়টি বিবেচনাধীন রাখা হয়েছে।

সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলোকে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি— জানতে চাইলে বলা হয়, এ নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আরও জানানো হলো, সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর জন্য সরকারি কোনো বরাদ্দ নেই। করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে পরিচালনা করা হয়।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সমাজসেবা বিভাগ থেকে বলা হয়, সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর প্রচারণার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। সাইনবোর্ড দেওয়া হবে। এরইমধ্যে চেয়ার-টেবিলের স্থলে কার্পেট ও চাদর দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছে। সংশ্লিষ্ট কেয়ারটেকার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকেন। গান-নাচ শেখানোর সরঞ্জামের তালিকা করা হয়েছে। সুপারিশ আকারে উপস্থাপিত হবে। এজন্য এ বছর বাজেট রাখা হয়েছে। সার্টিফিকেট ভান্ডার ও ক্রয় বিভাগ হতে এ সপ্তাহেই তা পাওয়া যাবে।

শিক্ষকদের সম্মানী প্রসঙ্গে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বক্তব্য, শিক্ষকদের সম্মানী বৃদ্ধির প্রস্তাব সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিটি বিশেষ দিবসে শিক্ষকদের জন্য সম্মানী ও পোশাক দেওয়া হয়। তবে সংগীত কেন্দ্রগুলো সিটি করপোরেশন দ্বারাই পরিচালিত হবে। মূল লক্ষ্য— সমাজের অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের স্বল্প খরচে শিক্ষাদান করা।

কেন্দ্রগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করতে কমিটি গঠন করা হয়েছে উল্লেখ করে দক্ষিণের সমাজসেবা বিভাগ বলে, কেন্দ্র পরিচালনা, সমস্যাদি চিহ্নিতকরণ এবং সুপারিশ প্রদানের জন্য একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করেছে এবং সুপারিশমালা প্রস্তুত করেছে। কমিটির সভা হলেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে। এ মাসেই সভা অনুষ্ঠিত হবে। এ অর্থ বছরেই এ খাতে বরাদ্দও প্রদান করা হয়েছে।

কার্যক্রম বন্ধ কেন্দ্রগুলো প্রসঙ্গে সমাজসেবা বিভাগ জানায়, কেন্দ্রগুলো বন্ধ নয়। ভবনের নির্মাণ বা সংস্কারকাজ চলমান থাকায় অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে।

আরআর