সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

সমস্যার হাত ধরে হাঁটছে সিটি করপোরেশনের সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলো

রাফিউজ্জামান রাফি
প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম

শেয়ার করুন:

সমস্যার হাত ধরে হাঁটছে সিটি করপোরেশনের সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলো
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দ্বারা পরিচালিত ১৭টি সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র নিয়ে করা ঢাকা মেইলের প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ পেল আজ। এতে উঠে এসেছে লোকবল সংকট, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি, শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্যসহ আরও কিছু প্রতিবন্ধকতা। সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর সমস্যাগুলো নিয়ে কথা হয়েছে দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গেও। তিন পর্বের প্রতিবেদনের শেষ পর্বে থাকছে করপোরেশনের বক্তব্য। 

লোকবল সংকট

লোকবল সংকটে ভুগছে সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলো। শিক্ষকরা জানালেন তাদের নেই কোনো সহকারী। শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কারসহ বিভিন্ন কাজ নিজেদেরই করতে হয়। রায়ের বাজার কেন্দ্রের শিক্ষক সুব্রত হাওলাদার (ছদ্মনাম) বলেন, ‘একজন অফিস সহকারী নেই যে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজ করবে। শুক্রবারে কমিউনিটি সেন্টার বন্ধ থাকে। সেদিন ক্লাস চলাকালে বাইরের কেউ টয়লেটে ঢুকলেও আমাদের ফেরাতে হয়। এগুলোর জন্য অন্তত একজন লোক প্রয়োজন।’ ফকির চান কেন্দ্রের শিক্ষক নলিনী দাস (ছদ্মনাম) বলেন, ‘অফিস ও শ্রেণিকক্ষ পরিচ্ছন্ন রাখতে একজন আয়া দরকার। না থাকায় নিজেদেরই ঝাড়ু হাতে নিতে হয়।’ বাকি কেন্দ্রগুলোও ভুগছে লোকবলের অভাবে। ব্যতিক্রম শুধু নবাবগঞ্জ শিক্ষাকেন্দ্র। শিক্ষক সেলিম হাসান (ছদ্মনাম) বললেন, ‘আমাকে দুইজন স্টাফ দিয়েছে। অফিস সহায়কের কাজগুলো তারাই করে।’ মহানগর মহিলা কলেজে অবস্থান করায় সুবিধা হয়েছে সংগীত কেন্দ্রটির। শিক্ষক রাবেয়া হাসান (ছদ্মনাম) বললেন, ‘নিজস্ব স্টাফ নেই। তবে কলেজের স্টাফরাই ঝাড়পোছ করে রাখে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকার কারণে চেয়ার-টেবিলও মিলছে।’

অপরিচ্ছন্ন মেঝেতে নাচ শিখছে ধলপুর কেন্দ্রের শিক্ষার্থীরা l ছবি: ঢাকা মেইল
অপরিচ্ছন্ন মেঝেতে নাচ শিখছে ধলপুর কেন্দ্রের শিক্ষার্থীরা l ছবি: ঢাকা মেইল 

নেই চেয়ার-টেবিল, ভাঙা আলমারি, মেরামত প্রয়োজন তবলা-হারমোনিয়াম 

সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রগুলোর নিজস্ব চেয়ার-টেবিল পর্যন্ত নেই। অধিকাংশ কেন্দ্র সিটি করপোরেশনের কমিউনিটি সেন্টারে অবস্থিত হওয়ায় সেখানকার চেয়ার-টেবিল ধার করে চলে। এছাড়া কোনো কেন্দ্রে হারমোনিয়াম মেরামত প্রয়োজন। কোনো শাখায় ভাঙা তবলায় চলে ক্লাস। আসবাবপত্র বলতে পুরনো আলমারি। সেগুলোরও বেহাল দশা। মেরামতের জন্য শিক্ষকদের পকেট থেকে অর্থ খরচ করতে হয়। এরপর করপোরেশনের বিলের অপেক্ষা। সেও যেন সোনার হরিণ। বোঝা গেল শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে। যাত্রাবাড়ী কেন্দ্রের শিক্ষক শাফায়েত (ছদ্মনাম) বললেন, ‘আমাদের চেয়ার পর্যন্ত নেই। ক্লাসের দিন কমিউনিটি সেন্টার থেকে ধার করে কাজ চালাই।’ ধলপুরের কেন্দ্রেরও একই চিত্র। কমিউনিটি সেন্টারের চেয়ার টানাটানি করায় কথাও শুনতে হয় বলে জানালেন এক শিক্ষক। নবাবগঞ্জ কেন্দ্রের শিক্ষক সেলিম হাসান (ছদ্মনাম) বলেন, ‘টেবিল ভাঙা। চেয়ার নেই। আলমারি দুটি ভাঙা। ২ জোড়া তবলা-ই নষ্ট। সেগুলো দিয়েই ক্লাস চালাই।’ ফকির চান কেন্দ্রের শিক্ষক নলিনী দাস (ছদ্মনাম) বলেন, ‘বাদ্যযন্ত্র অনেক আগে মেরামত করা হয়েছে। চেয়ার-টেবিলও সেভাবে নেই। মিটিংয়ে উত্থাপন করা হলে বলে দেখবে। পরে আর দেখে না।’ হাজী জুম্মন কেন্দ্রের শিক্ষক মাহবুব (ছদ্মনাম) বললেন, ‘আগে দেরিতে হলেও বিল দেওয়া হতো। বছর দুয়েক ধরে সেটিও বন্ধ।’ মিরপুর কেন্দ্রে কার্পেটও ছিল না। শিক্ষক শিখার (ছদ্মনাম) কথায়, ‘অনেক কষ্টে কার্পেট কিনেছি। এক বছর ধরে বলার পর তিন হাজার টাকা দিয়েছিল। নিজেদের পকেট থেকে আরও এক হাজার ভরে কিনেছি।’

সুবিধাবঞ্চিত শিশু নেই বললেই চলে

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলো প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সাংস্কৃতিক শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু সুবিধাবঞ্চিত শিশু নেই বললেই চলে। শিক্ষার্থীদের সিংহভাগ নিম্নমধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত পরিবারের। তাদেরও উপস্থিতি আশানুরূপ না। মিরপুর কেন্দ্রে নাচে ১৫ জন এবং গানে ২২ জন ছাত্র-ছাত্রী। নবাবগঞ্জ সাত শহিদ সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রে ২৫ জন। দুই কেন্দ্রে কোনো সুবিধাবঞ্চিত শিশু নেই বলে জানালেন শিক্ষকরা। হাজী জুম্মন সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রের ২০ শিক্ষার্থীর মধ্যেও নেই সুবিধাবঞ্চিত। মহাখালী কেন্দ্রে ১২০-৩০ ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন সুবিধাবঞ্চিত। সূচনা কমিউনিটি সেন্টার কেন্দ্রে ২-১ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশু আছে। তবে যাত্রাবাড়ী কেন্দ্রের ২০ ছাত্র-ছাত্রীর অর্ধেক সুবিধাবঞ্চিত বলে জানালেন শিক্ষক শাফায়েত আলী। মহানগর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে জনা চল্লিশেক ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে সুবিধাবঞ্চিতর সংখ্যা ৩-৪ জন। বেতন দেওয়ারও সামর্থ্য নেই তাদের। শিক্ষক রাবেয়া হাসান (ছদ্মনাম) বলেন, ‘সুবিধাবঞ্চিত যারা আছে তাদের অভিভাবকদের আর্থিক অবস্থা একেবারেই নাজুক। ১০০ টাকা বেতন দেওয়ারও সামর্থ্য নেই। তাদের বিনামূল্যে শিক্ষা দিচ্ছি।’ ফকির চাঁন কেন্দ্রে শিক্ষার্থী পাওয়া-ই দুষ্কর। ৩০-৩২ জন ভর্তি হলেও নিয়মিত ৮-১০ জন। রায়েরবাজার কেন্দ্রে মোট শিক্ষার্থী ১৮ জন। কোনো সুবিধাবঞ্চিত শিশু নেই। কারওয়ান বাজার কেন্দ্রের শিক্ষক কোহিনুর আলম (ছদ্মনাম) জানালেন প্রচারণার অভাবে কেন্দ্রটির কথা তেমন কেউ জানে না। তাই শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম। ‘সুবিধাবঞ্চিতদের পাব কোথায়?’ প্রশ্ন রেখে এই শিক্ষক বলেন, ‘আগে পাশে একটি এনজিও ছিল। তাদের তত্ত্বাবধানে বেশকিছু সুবিধাবঞ্চিত শিশু পেয়েছিলাম। সেখানকার কয়েকজনকে বিনা বেতনে শিক্ষা দিয়েছি। সংস্থাটি চলে গেছে। আরও সংস্থা আছে। তবে তারা জানে না এখানে এরকম স্কুল আছে।’ সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অনুপস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে প্রচারণা ও সচেতনতার অভাবকে দায়ী করলেন শিক্ষকরা। তারা মনে করেন পরিবারগুলো জীবন যুদ্ধে এতটাই ব্যস্ত যে সাংস্কৃতিক শিক্ষা তাদের কাছে তেমন গুরুত্ব পায় না। এজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রচারণা। পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের অবগত করা। তবেই চিত্র বদলাতে পারে বলে ধারণা তাদের। স্থানীয় ডিশ চ্যানেল, সামাজিক মাধ্যমে  প্রচারণা চালাতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ব্যানার-লিফলেট বিলি করলে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়তে পারে, সুবিধাবঞ্চিতরা সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রমুখো হতে পারে বলে মনে করেন শিক্ষকরা। 

যাত্রাবাড়ী কেন্দ্র: বসে আছেন শিক্ষকরা। একই কক্ষে চলে সংগীত শিক্ষা l ছবি: ঢাকা মেইল
যাত্রাবাড়ী কেন্দ্র: বসে আছেন শিক্ষকরা। একই কক্ষে চলে সংগীত শিক্ষা l ছবি: ঢাকা মেইল 

শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম

ভর্তির সময় শিক্ষার্থীর সংখ্যা সন্তোষজনক হলেও ক্লাসে উপস্থিতি আশানুরূপ না বলে জানালেন অধিকাংশ কেন্দ্রের শিক্ষক। তারা মনে করেন, কোর্স সম্পূর্ণ হলেও মেলে না সার্টিফিকেট। ফলে অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এছাড়া উপযুক্ত পরিবেশের অভাবসহ উল্লেখিত সমস্যাগুলোকেও শিক্ষার্থী ঝরে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষকরা। নবাবগঞ্জ সাত শহিদ কেন্দ্রের শিক্ষক সেলিম হাসান (ছদ্মনাম) বললেন, ‘সার্টিফিকেট নেই, পরীক্ষা নেই বলে ছাত্র-ছাত্রী টেকে না।’ হাজী জুম্মন কেন্দ্রের সংগীত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর একাধিকবার করেছে জায়গা পরিবর্তন। এটিকে ছাত্রছাত্রীর না পাওয়ার একমাত্র কারণ বলে মনে করেন শিক্ষক মাহবুব আলম (ছদ্মনাম)। পাশাপাশি অনুপযুক্ত পরিবেশ এবং দিনের পর দিন জমতে থাকা সমস্যাগুলোকেও দায়ী করলেন অনেকে। শিক্ষকরা মনে করেন গান-নাচের পাশাপাশি ছবি আঁকা, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র শেখা অর্থাৎ সৃজনশীল আরও বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার সুযোগ থাকলে শিক্ষার্থী বাড়তে পারে। 

বৈষম্য 

উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে নীরব বৈষম্য। উত্তরের পাঁচ সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষকরা উৎসবগুলোতে ১০ হাজার টাকা করে ভাতা পেলেও দক্ষিণের কেন্দ্রগুলোর শিক্ষকরা সেটি থেকে বঞ্চিত। অতীতে উৎসব ভাতা হিসেবে কয়েকবার ২-৩ হাজার টাকা করে দেওয়া হলেও তা এখন বন্ধ। হাজী জুম্মন কেন্দ্রের শিক্ষক মাহবুব আলম (ছদ্মনাম) বলেন, ‘৭-৮ বছর আগে দুই-তিন হাজার করে দুই-তিনবার উৎসব ভাতা দিয়েছিল। সে-ও অনেকবার বলার পর। কিন্তু ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি।’ বিষয়টি কর্তৃপক্ষের সামনে উপস্থাপন করলে প্রতিবার-ই মেলে আশ্বাস। কিন্তু ভাতার মুখ দেখেন না দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর শিক্ষকরা। বিষয়টি তুললে কর্মকর্তাদের কেউ কেউ দেন উত্তরের কেন্দ্রগুলোতে চলে যাওয়ার পরামর্শ। জানালেন মাহবুব আলম। তিনি বলেন, ‘উৎসব ভাতার কথা বললে সিটি করপোরেশনের স্যারদের কেউ কেউ বলেন তাহলে উত্তরে চলে যান। যেখানে সুবিধা আছে সেখানে গেলেই পারেন।’ বাসাবো সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষক আশকর আলী বলেন, ‘আমরা কয়েকবার বলেছি উৎসব ভাতার কথা। উত্থাপন করলে বলে দেখব। কিন্তু আর দেখে না।’ দক্ষিণের কেন্দ্রগুলোর শিক্ষকরা জানালেন উত্তরের শিক্ষকদের তুলনায় মূল্যায়নও কম করা হয় তাদের। 

বাসাবো কেন্দ্রের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে ভালো l ছবি: ঢাকা মেইল
বাসাবো কেন্দ্রের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে ভালো l ছবি: ঢাকা মেইল 

কেন্দ্র প্রধানদের বাড়তি দায়িত্ব আছে, নেই অতিরিক্ত সম্মানী

প্রতিটি কেন্দ্রে প্রশাসনিক কার্যক্রম সামলানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিক্ষকদের একজনকে। অ্যাডমিন কিংবা কেন্দ্র প্রধান সম্বোধন করা হয় তাদের। তবে পদটি কাগজ-কালমে নেই। পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য দেওয়া হয় না বাড়তি সম্মানী। এক অ্যাডমিন বলেন, ‘কেন্দ্র প্রধান তথা অ্যাডমিন হওয়ায় আমাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। কেন্দ্রের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য করপোরেশনে যাতায়াত করতে হয়। সেক্ষেত্রে দেওয়া হয় না অতিরিক্ত ভাতা বা সম্মানী।’ এছাড়া দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্য শিক্ষকদের চক্ষুশূল হতে হয়। একাধিক অ্যাডমিন জানালেন কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ে আসা যাওয়ার বিষয়ে তদারকি কিংবা শীক্ষার্থীদের পঠদানে অবহেলার বিষয়ে নজরদারি করলে অনেক সময় অন্য শিক্ষকদের কাছে দোষী সাব্যস্ত হতে হয় তাদের। অ্যাডমিদের মতে পদ ও দায়িত্ব নীতিমালায় উল্লেখ থাকলে পালনে সুবিধা হবে। 

চলবে…

আরআর 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর