Dhaka Mail Logo

মতামত

ফরাসি বিপ্লব, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও আত্মসমীক্ষা

ঢাকা মেইল ডেস্ক

০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৬ পিএম

কোন বিপ্লব, গণঅভ্যুত্থান, গণআন্দোলন বা জনতার রায়কে কোন ভাবেই ছোট বা অবেহেলার চোখে দেখার সুযোগ নেই। কোন কিছুই নিরর্থক, অর্থহীন ও কারণহীন নয়। এগুলোর পিছনে থাকে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন,  স্বৈরাচারী শাসন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ভোটাধিকার হরণ, নির্বাচনে অনিয়ম বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ব্যাঘাত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য, দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব । দীর্ঘদিনের জনঅসন্তোষ যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায় তখন বিস্ফোরিত হয়ে বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়।

অথচ এগুলো নিয়ে আমাদের ভিতরে এক ধরনের হীনমনতা কাজ করে। অনেকে এমনটা ভেবে থাকে  ছাত্র-জনতার ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবকে সমর্থন করলে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা হয় কিনা। আবার অনেকে মনে করে শুধু ১৯৭১ সালকে ধরতে হবে। তারা ১৯৪৭ সাল ও ব্রিটিশ বিরোধী অন্যান্য আন্দোলনকে সামনে নিয়ে আসতে চায় না। ১৮৫৭ সালের পথ ধরে ১৯৪৭ এরপর ১৯৭১ এরপর ২০২৪, এই সময়ের মধ্যে ছোট-বড় কমবেশি আন্দোলন হয়েছে, সবকিছুর পিছনে ছিল ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পেক্ষাপট তবে  লক্ষ্য ছিল  অত্যাচার ও অসমতা দূরীকরণ এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা।

পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা হল ফরাসি বিপ্লব যা সংগঠিত হয়েছিল ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের অবসান, স্বাধীনতা অর্জন, সামাজিক অত্যাচার ও অসমতা দূরীকরণ এবং জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চত করার জন্য। সারা বিশ্বের জনগণের অধিকারের জন্য অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করে ফরাসি বিপ্লব। ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গ দখলের মাধ্যমে এই বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল এবং ১৭৯৯ সালে শেষ হয়। স্থায়ী ছিল ১০ বছর। তবে ফ্রান্সে একটি সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেতে প্রায় ১০০ বছর সময় লেগে ছিল।

ইতিহাসে দেখা যায়, এই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে ছিল বটে, তবে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র ও পূর্বের শাসন ব্যবস্থা বার বার ফিরে এসেছিল। দেশের অভ্যন্তরে যেমন দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হিংসা-বিদ্বেষ, ব্যক্তিস্বার্থের নীতি বিদ্যমান ছিল, তেমনি বাইরের নানা ধরনের বিরোধিতা ও অসহযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়। বহুবার সংবিধান রচিত হয়েছে, বহুবার স্থগিতও হয়েছে আবার পরিবর্তন হয়েছে। এই জন্য ফরাসিদের বার বার রক্ত দিয়ে হয়েছে।

বিপ্লব পূর্ববর্তী সময়ে ফরাসি জনগণ রাজা ষোড়শ লুই ও তার রাজপরিবারের অত্যাচারে চরম ক্ষুব্ধ ছিল। তৎকালীন ফ্রান্সের সমাজ তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। প্রথমে ছিল ধর্মীয় নেতা বা যাজক শ্রেণি যারা মোট জনসংখ্যার এক শতাংশ। দ্বিতীয় অংশে ছিল এলিট বা অভিজাত শ্রেণি বা রাজপরিবারের আশপাশের লোকজন, যারা ছিল মোট জনসংখ্যার ১.৫ শতাংশ তবে মোট জমির তিন ভাগের ১ ভাগের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল। তৃতীয় অংশে ছিল সাধারণ জনগণ যার মধ্যে ছিল কৃষক, শ্রমিক ও ছোট ব্যবসায়ী যারা ছিল মোট জন সংখ্যার ৯৭ শতাংশ। তৃতীয় অংশের মানুষেরা ছিল অত্যন্ত শোষিত, তাদের উপর চাপানো হত শুধু কর আর কর। তাদের কোন উন্নয়ন ছিল না, কোন ভোটের অধিকার ছিল না ।

কোন আইন হতে হলে তৎকালীন স্টেট জেনারেলে পাশ হওয়া লাগত। স্টেট জেনারেলে সদস্য সংখ্যা ছিল ১২১৪ জন। যার মধ্যে যাজক শ্রেণির ৩০০ জন, অভিজাত শ্রেণির ৩০০ জন ও সাধারণ মানুষের ৬১৪ জন প্রতিনিধি ছিল। সবচেয়ে মজার বিষয় ভোট মাথাপিছু ছিল না, তিন সম্প্রদায়ের জন্য ভোট ছিল মাত্র তিনটি। স্টেট জেনারেলে সাধারণ নাগরিকের অনুকুলে কোন আইন পাশ হত না কেননা যাজক ও অভিজাত শ্রেণীর দুই ভোট সবসময় একই দিকে পড়ত।

যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজকীয় ব্যয়ের জন্য ফ্রান্সে অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল। রাজা ষোড়শ লুই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও রুটির মুল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়। সাধারণ মানুষ অনেকে খাবারের জন্য গ্রাম থেকে শহরে চলে আসে। এই সময় রাজা ষোড়শ লুই যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের উপর কর আরোপের সিধান্ত নিলে তাদের একটা অংশ রাজার বিরুদ্ধে ক্ষেপে যায় এবং জনগণকে বিপ্লবের দিকে নিয়ে যায়। ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গ দখলের মাধ্যমে এই ফরাসি বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। ১৭৯১ নতুন সংবিধান রচনা করতে বাধ্য করা হয়। এমন সময় ইউরোপের অন্যান্য রাজতন্ত্র শাসিত রাষ্ট্রগুলো ষোড়শ লুইকে বিভিন্ন ভাবে সমর্থন জানাতে থাকলে জনগণ আরও ক্ষেপে যায়। এক পর্যায় ২১ জানুয়ারি ১৭৯৩ সালে ষোড়শ লুইকে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার মৃত্যু এক হাজার বছরেরও বেশি ধারাবাহিক রাজতন্ত্রের সমাপ্তি নিয়ে আসে এমন অনেকে মনে করে।

একদিকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সংঘাত, বিশৃঙ্খলা অন্যদিকে ইউরোপের অন্যান্য রাজশক্তিগুলোর শত্রুতা ফ্রান্সকে বেশ বেকায়দায় ফেলে দেয়। এমন অবস্থার মধ্যে আবির্ভাব ঘটে থেকে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের যিনি ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের সময়কার একজন জেনারেল।

 ষোড়শ লুইকে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড পরবর্তী সময়ে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আক্রমণ প্রতিহত করেন। ইতালি, লোম্বার্ডি, পাপাল অস্ট্রিয়া, রাইনল্যান্ড ভেনিসসহ ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চল ফ্রান্সের অধিকারে আনেন। জাতীয়তাবাদী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি জনপ্রিয় হন। এক সময় তিনিই একনায়ক ও স্বৈরচারী শাসক হয়ে ওঠেন। নেপোলিয়ন ওয়ান নামে ফ্রান্সের সম্রাটও হন।

আর পড়ুন

কোটা থেকে গণঅভ্যুত্থান, তবু চাকরিতে বৈষম্য দূর করা কঠিন

তবে নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযানটি মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয় এবং তিনি পরাজিত হন। এক সময় ষষ্ঠ কোয়ালিশন ফ্রান্সে আগ্রাসন চালায়। ১৮১৫ সালে ওয়াটারলুতে পরাজিত হওয়ার পর নেপোলিয়নকে ব্রিটিশরা আটলান্টিক মহাসাগরের প্রত্যন্ত দ্বীপ সেন্ট হেলেনাতে নির্বাসনে পাঠায়। এরপর ইউরোপের রাজশক্তিগুলো মিলে সিধান্ত নেয়   ফ্রান্সে আবার রাজতন্ত্র চালু হবে। ২৩ বছর পর রাজা লুই ষোড়শের ভাই লুই অষ্টাদশ আবার রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন এবং তিনি ১৮২৪ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের রাজা ছিলেন। তবে তিনি জনগণের কথা বিবেচনা করে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাতা করেন।

অষ্টাদশ লুইয়ের কোন সন্তান ছিল না এবং তার মৃত্যুর পর রাজা হন তার ভাই চার্লস  দশম।  তবে চার্লস দশম লুই অষ্টাদশ এর মত উদার ছিলেন না। তিনি রাজতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করলে আবার গোলযোগ দেখা যায়। এমন অবস্থায় লুই ফিলিপ প্রথম ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং তার  রাজত্বকাল ছিল ১৮৩০-১৮৪৮ সাল পর্যন্ত।  ১৮৪৭ সালে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তার জনপ্রিয়তা হ্রাস পায় এবং ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের সূত্রপাতের পর তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। লুই-নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, যিনি নেপোলিয়ন তৃতীয় নামে পরিচিত,  ১৮৪৮ থেকে ১৮৫২ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন । তিনি ছিলেন প্রথম নেপোলিয়নের ভাই লুই বোনাপার্টের পুত্র। তবে তিনি কুটচালের মাধ্যমে ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ফরাসি সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পুনঃনির্বাচন বাধা  দিয়ে রাষ্ট্রীয় অভ্যুত্থান ঘটান। ১৮৫২ সালে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেন ।এই নেপোলিয়ন তৃতীয়কে ১৮৭০ ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।   এর পর ১৮৭১ সালের নির্বাচন ও ১৮৭৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে ফ্রান্সে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল সংসদ প্রতিষ্ঠা হয়।

এ দেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামের ইসিহাসে ১৯৭১ সাল সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও চিরস্মরণীয় ঘটনা। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে ও অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে ৭১ সালে অর্জিত হয়েছিল স্বাধীনতা। আবার ৭১ এসেছিল আবার কয়েকটি ঢেউ এর মাধ্যমে- যেমন- ভাষা আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, ৬-দফা, গণঅভ্যুত্থান।

প্রায় ২০০ বছর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে রয়েছেও এদেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ৪৭ সালেও এদেশের মানুষ অনেক আশায় বুক বেঁধে ছিল ও পাকিস্থান আন্দোলনে যোগ দিয়ে ছিল। এদেশের মানুষ স্বপ্ন দেখে ছিল জমিদারি প্রথা উঠে যাবে, জমির উপর সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, অতিরিক্ত খাজনার হাত থেকে রেয়াই পাবে, এ দেশের মানুষ লেখাপড়া শিখতে পারবে, চাকরি পাবে, ইত্যাদি।   

পাকিস্তান আমলে চাকরি আর উন্নয়ন চলে যায় পাকিস্তানিদের বিশেষ করে পাঞ্জাবিদের হাতে। আশা করা হয়েছিল, স্বাধীনতার পর এদেশে কোনো বৈষম্যের ঝামেলা থাকবেনা কিন্তু  সেটা আর বাস্তবে পরিণত হয়নি।

জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় ১৪০০ লোক নিহত হয়েছে। নিহতদের বেশির ভাগ ছাত্র, চাকরিপ্রত্যাশী, তরুণ ও শিশু-কিশোর। প্রতিটি মৃত্যই যেন এক একটা শোক গাঁথা। 

আবু সাঈদ রংপুরের নীলগঞ্জ উপজেলার এক অজপারা গায়ের ছেলে। অর্থাভাবে দিনমজুরের ছেলের লেখাপড়া হওয়া দুঃসাধ্যই ছিল। টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ চালাতেন। আবু সাঈদ সারা বাংলাদেশের প্রতীক, গুটি কয়েক পরিবার ছাড়া প্রায় সবার অবস্থা আবু সাঈদের মত। এ দেশের লাখো শিক্ষার্থী কোনও না কোনও কষ্ট স্বীকার করে পড়াশুনা চালিয়ে যায়, একটি চাকরির আশায়, স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠনের আশায়। স্বাধীনতার এত বছর পর স্বচ্ছ ও প্রশ্নহীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারাটাই জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা শেষ করে চাকরির জন্য ‘লাইনঘাট, ‘সিস্টেম’ আর ‘মামু খালুর’ সন্ধানে ব্যস্ত থাকতে হয়।

Julay

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখা যায়, সমাজের অনগ্রসর অংশের মানুষের জন্য কিছু কোটা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে তরুণদের চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বৈষম্য সৃষ্টি করে ছিল অযৌক্তিক কিছু কোটা। বিশেষ করে স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও ৩০ % মুক্তিযোদ্ধা কোটা। এর সাথে অন্যান্য কোটা যুক্ত হয়ে সরকারি চাকরির ৫০% এর বেশি বরাদ্দ ছিল বিশেষ মানুষদের জন্য। কোটার বাইরের চাকরি গুলোর পিছনে সক্রিয় থাকত আঞ্চলিকতা, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, তদবির, ঘুষ, তোষামোদ, সিন্ডিকেট, প্রশ্ন ফাঁস, দুর্নীতি, পক্ষপাতিত্ব আর সুপারিশ। যে কারণে এ দেশের সাধারণ মানুষের সরকারি চাকরি প্রাপ্তির সুযোগ এক প্রকার বন্ধ হয়ে গিয়ে ছিল।

শুধু নিয়োগ প্রতিষ্ঠান নয়, দেশের সব প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ধ্বংস হতে বসে ছিল। পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন কমিশন সবখানে একই অবস্থা। কোন প্রতিষ্ঠানের ওপর এদেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস ছিল না।

আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে কি না বা সুগঠিত গণতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি হয়েছে কি না সেই প্রশ্ন দীর্ঘ দিনের। কতিপয় ক্ষমতাশালীর হাতে গণতন্ত্র বন্দি হলে তার চেহারা কেমন দাঁড়ায়, এদেশের দিকে তাকালেই তা বোঝা সম্ভব। ভোটার থাকতে বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়া, পাতানো নির্বাচন, রাতের ভোট, ভোট ডাকাতি, ভোট জালিয়াতি, ভোট ম্যাকানিজম, বন্দুকের নল, বিভিন্ন বাহিনীর অত্যাচার, ভয়ভীতি দেখিয়ে সিল মারা, ভূতুড়ে ভোট, গায়েবি ভোট, টাকা পয়সার ছড়াছড়ি, বিরোধীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়াসহ অনেক ঘটনা বারবারই এ দেশের গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

আরও পড়ুন

উপমহাদেশে সিস্টেম চেঞ্জের ঢেউ

এটাই এ দেশের বাস্তবতা যে, ক্ষমতাসীন বা দলীয় সরকারের অধীনে কোনো জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়নি। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ১৯৯১, ১৯৯৬ (১২ জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন মোটামুটি নিরপেক্ষ হয়েছিল এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল- এ বিষয়ে কারোর দ্বিমত থাকার কথা নয়। ২০০৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ত্রুটি দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের উদ্যোগ নেন। ফলে যে তরি চড়ে আ. লীগ ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিল, সেটা আর থাকল না।

পরপর তিনটি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। সততা, স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশের  প্রতিফলন ঘটেনি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দেখা যায়, এ দেশের মানুষ ভোট পাগল হওয়া স্বতেও ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়। অপর যে ১৪৭ টি আসনে নির্বাচন হয়েছিল সেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল অনেক কম।  এমনও অসংখ্য কেন্দ্র ছিল যেখানে একজন লোকও ভোট দিতে যায়নি।  নানামুখী চাপ ও পদক্ষেপের কারণে ২০১৮ সালের নির্বাচনে দুই একটি বিরোধী দল অংশগ্রহণ করলেও হামলা-মামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন আর প্রশাসনের দ্বিচারিতা মনভাবের কারণে তারা শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে পারিনি। যেটা শেষ পর্যন্ত একতরফা নির্বাচনে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনও বিরোধীরা বর্জন করে।  যেটা ডামি নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়, যেখানে আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটের ও দলের লোকেরাই নির্বাচিত হয়।  শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়, দলভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থার নামে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো একই ভাবে অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলো চলে যায় পেশী শক্তি ও সিন্ডিকেটের দখলে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে দলটি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্মে।

 বর্তমানে মানুষ তথ্য প্রযুক্তির যুগে বাস করে, মুহূর্তের মধ্যে মানুষ সব খবর পেয়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, নির্বাচন কোন গোপন বিষয় না। প্রতিটি পাড়া ও মহল্লার মানুষ বা ভোটাররা বুঝে ফেলে ভোট কেমন হচ্ছে। এমন অবস্থার পর একটি দলের প্রধান যখন গণমাধ্যমের সামনে এসে বলে স্মরণকালের গ্রহণযোগ্য ভোট হয়ে হয়েছে, তাহলে পাবলিকের কাছে পচে যাওয়ার আর কিছু বাকি থাকে না। তাছাড়া ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য দেশের সমস্ত প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ ও বিরোধীদের উপর অসংখ্য হামলা-মামলা, গুম-খুনের অভিযোগ ওঠে।

লক্ষণীয় যে, কিছু মানুষের মধ্যে এক ধরনের উন্মাদনা কাজ করেছে, কীভাবে দ্রুত সময়ে অঢেল ধনসম্পদ ও টাকা-পয়সার মালিক হওয়া যায়। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যম কিছুদিন পর পর কিছু মানুষের অবৈধ ধন-সম্পদ ও অর্থপাচারের রিপোর্ট বা খবর প্রকাশ করেছে। পৃথিবীর অনেক দেশে দুর্নীতি, লুটপাট ও অপকর্ম রয়েছে। কিন্তু, আমাদের দেশ অপকর্ম-দুর্নীতি একটা অস্বাভাবিক পর্যায়ে চলে যায়। যার বর্ণনা দিতে একেক জনের জন্য বই ছাপানোর প্রয়োজন পড়ে। অনেকে টাকা পাচারের জন্য নিজেরাই চালু করে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান।

আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিবাদ গড়ে উঠতে দেখা যায়। ফ্যাসিবাদ হচ্ছে স্বৈরতন্ত্রের একটি বিশেষরূপ। জনগণকে মুলা দেখায়ে জনগণের উপর ভর করে ক্ষমতায় এসে জনগণের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে, ভোটের অধিকার হরণ করে। ফ্যাসিবাদ নিজের দোষ স্বীকার করে না, মনে করে তারা যেটা করছে, সেটাই সঠিক।

রাজনীতি দিন দিন ব্যবসা কেন্দ্রিক হওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। দল ক্ষমতায় থাকলে টেন্ডার পাওয়া যায়, ব্যবসা আসে, চাকরিসহ নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা। দিন দিন কমে চলেছে পেশাদার রাজনীতিবিদের সংখ্যা। নির্বাচনে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করা হয় আর নির্বাচিত হওয়ার পর সুদ-আসলসহ উঠিয়ে নেওয়া হয়।

রাষ্ট্রীয় দমন, বৈষম্য, কোটানীতি, দুর্নীতি, বিচারহীনতা ও শাসনব্যবস্থার অব্যবস্থা, অন্যায়, দমন-পীড়ন বা বৈষম্যের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন বা বিপ্লব সংগঠিত হয়। বিপ্লবের সফলতা সবসময় এক ধাক্কায় আসে না, বরং ধাপে ধাপে, ঢেউের পর ঢেউ, উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে, ধীরে ধীরে লক্ষ্যে পৌঁছায়। যেমনটা ফ্রান্সে এসেছিল। আবার একটা বিপরীতমুখী ধারাও আছে,  একটা গণআন্দোলন বা বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার পর একটা দেশ বা সমাজ একটা জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও যায়। বার বার আন্দোলন, বার বার রক্ত দেওয়া কাম্য নয়। সব দেশ বা সমাজ এর ধকল নিতে পারে না। বারবার এমনটা ঘটতে থাকলে দেশ একটি সংঘাতময় ও অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকেই চলে যায়।

মানুষ কেন অসন্তোষ হয়; বিপ্লব, গণঅভ্যুত্থান ও আন্দোলন কেন হয় তার কারণ অনুসন্ধান করা বিশেষ প্রয়োজন। নতুন কোন আন্দোলন সংঘটিত হওয়ার আগেই রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারণীমহল বিশেষ করে যারা শাসন কার্যক্রমের সাথে জড়িতদের জনগণের মনোভাব ও আকাঙ্ক্ষা উপলব্ধি করতে পারা ও সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াটা সবার জন্য মঙ্গলকর। 

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী