মো: ইনামুল হোসেন
২১ মে ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম
বড় পর্দায় জীবনানন্দ দাশ হয়ে আসছেন অভিনেতা খায়রুল বাসার। মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত ‘বনলতা সেন’ সিনেমার পোস্টারে কবির লুকে নজর কেড়েছেন তিনি। সম্প্রতি ঢাকা মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিনেতা শুনিয়েছেন জীবনানন্দ দাশ হয়ে ওঠার নেপথ্যের গল্প।
সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার গল্প...
ছবির পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল ভাই একদিন আমাকে একটি চরিত্রের অডিশনের জন্য ডাকলেন। প্রথমে উনি চরিত্রটি সম্পর্কে বিস্তারিত বলেননি, জাস্ট একটা সিকোয়েন্স দিয়েছিলেন। ওনার সঙ্গে আগেও কাজ করেছি। জানতাম পরিচালক হিসেবে উনি দুর্দান্ত। তাই কাজের সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইনি। অডিশনের আগে ওনাকে বলেছিলাম, ‘ভাই, গল্পের সিচুয়েশনটা আরেকটু বুঝিয়ে দিলে আরও ভালো হতো।’ উনি বললেন, ‘সমস্যা নেই, তুমি শুধু এই সিকোয়েন্সের ওপর নজর দাও। আমি তোমার ভেতরের প্রতিভাটা একটু বুঝতে চাচ্ছি। এটা তুমি কীভাবে করো সেটা দেখতে চাচ্ছি।’
এরপর আরও একটি অডিশন হলো। দসেবার ছিল অন্য একটি চরিত্রের জন্য অডিশন। উনি সরাসরি বললেন, ‘তুমি যে চরিত্রে অডিশন দিয়েছ আমার মনে হচ্ছে তার চেয়ে জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে ভালো করবে। এই চরিত্রের জন্য তোমাকে আমার লাগবেই।’ শুনে আমি তো অবাক! কারণ আমার প্রিয় কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ অন্যতম। তাঁর প্রতি আমার বিশাল অনুরাগ। স্ক্রিপ্ট পড়ার পর মনে হলো সিনেমাটি করতে পারাটা আমার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার।

আপনার লুক বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। অনেকেই জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন। পর্দায় নিজেকে কবি হিসেবে ফুটিয়ে তোলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
লুকের পেছনে একটা বিশাল সংগ্রামের গল্প আছে। টিমের ডেডিকেশন ছিল দেখার মতো। আমরা প্রথমে ভারত থেকে মেকআপ আর্টিস্ট আনার কথা ভেবেছিলাম। উনি রাজি হলেও পরে সময়ের কারণে কাজটি করতে পারেননি। তখন দেশের মধ্যে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করি। উজ্জ্বল ভাই (মাসুদ হাসান উজ্জ্বল) আর আমি খেয়াল করলাম, জীবনানন্দ দাশের গালটা আমার চেয়ে কিছুটা ফোলা ছিল। সেজন্য সিলিকন দিয়ে ফোলা গাল বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু শুটিং শুরুর সময় ঘনিয়ে এলেও ওটা প্রস্তুত হচ্ছিল না। একদিন চা খাওয়ার সময় খেয়াল করলাম, চায়ের ভেতরের লেবুর খোসাটা বেশ ফ্লেক্সিবল। ওটা কেটে স্লাইস করে আমার গালে ঢুকিয়ে ভাইকে বললাম, ‘দেখেন তো গালটা ঠিক আছে কি না?’ ভাই দেখে বললেন, ‘আরে, এটা কীভাবে হলো?’ আমি বললাম, ‘গালে লেবুর খোসা দিয়ে রাখছি!’ পুরো শুটিংয়ে লেবুর খোসা গালে দিয়ে কাজ করেছি। এটা রাখা খুব কষ্টকর ছিল। ১০-২০ সেকেন্ড রাখার পর চামড়ার ভেতরে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হতো। কারণ ভেতরের নরম চামড়া লেবুর রসে পুড়ে যেত। এছাড়া কপালে চুল ফেলে ওনার চওড়া কপালের লুক আনা হয়েছিল।
শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা
শুটিংয়ের পরিকল্পনা ছিল দেড় মাসের। নিখুঁত লোকেশন আর আর্টের কাজে আমরা বিন্দুমাত্র ছাড় দিইনি। ফলে সময় দীর্ঘ হয়। সিলেট, নাটোর, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, পদ্মার চরসহ অনেক জায়গায় শুটিং করেছি। বিশেষ করে নাবিলা আপুর (মাসুমা রহমান নাবিলা) অংশের সেটের আয়োজনটা ছিল অনেক বড়। অনেক সময় দেখা যেত আগে থেকে প্রশাসনিক অনুমতি নেওয়া থাকলেও সরকারি প্রোগ্রামের কারণে আমরা স্পট পাইনি। আবার নতুন করে আবেদন করে অপেক্ষা করতে হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের মেকআপ, পোশাক, গাম্ভীর্য নিয়ে সেটে থাকাকালীন মনের ভেতরে কেমন অনুভূতি হতো?
একসময় আমি জীবনানন্দ দাশের কবিতা অতটা বুঝতাম না। কিন্তু পড়তে পড়তে ওনার উপমা, ভাবনার গভীরতা উপলব্ধি করতে শুরু করি। ওনার কবিতা প্রেম ও জীবন বাস্তবতার কথা বলে। আবার এক চরম অসহায়ত্বের মধ্যে বসেও বীরত্ব আর প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন। ওনার জীবনদর্শন আমার জন্য বড় অনুপ্রেরণা। যখন শুটিং করতাম, মনে হতো আমি খুবই সামান্য মানুষ হয়ে এত বড় কিংবদন্তির চরিত্রে অভিনয় করছি! ওনাকে পুরোপুরি পর্দায় ফুটিয়ে তোলার সামর্থ্য হয়তো নেই। কিন্তু স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চরিত্রটি জীবন্ত করে তুলতে চেষ্টা করেছি। দেড় বছরের দীর্ঘ জার্নিতে চরিত্রের ফ্লো নষ্ট হচ্ছে কি না— ভয়টা ছিল। তবে সম্প্রতি সিনেমার প্রিভিউ দেখার পর কয়েকজন জীবনানন্দ গবেষক এবং গুণী মানুষ কাজটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মুখে প্রশংসা শুনে ভালো লাগা বেড়ে গেছে।
চরিত্রটিকে পর্দায় জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলতে আপনার প্রস্তুতি কেমন ছিল?
স্ক্রিপ্টটা বারবার পড়া, অনুধাবন করাটাই ছিল মূল প্রস্তুতি। সিনেমাটির পিরিয়ডিক্যাল অংশ জুড়ে ওনার জীবনযাপন, চলন-বলন ও চিন্তার ধীরতা ফুটিয়ে তুলতে হয়েছে। রিহার্সালের সময় প্রতিটা ব্লকিং, শট এবং লেন্সের সাইজ ধরে ধরে কাজ করেছি। সেগুলো ভিডিও করে রাখতাম যাতে পরে রিভিউ করা যায়। নিখুঁত টিমওয়ার্ক এবং পরিচালকের কারণে কঠিন কাজটা সহজ হয়ে উঠেছিল।

‘বনলতা সেন’ নিয়ে আপনার প্রত্যাশা?
সিনেমাটি নিয়ে আমার প্রত্যাশা অনেক বেশি। আমি বিশ্বাস করি সিনেমাটি দর্শক মহলে পৌঁছাবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গল্পনির্ভর বা পারিবারিক জনরার সিনেমাগুলো দর্শক যেভাবে আপন করে নিয়েছেন, তাতে আমরা আশাবাদী হতেই পারি। ‘বনলতা সেন’ একদম ভিন্ন মাত্রার সিনেমা। দর্শক অবশ্যই দারুণভাবে কানেক্ট করতে পারবেন।
কোরবানি ঈদের সিনেমাগুলোর পোস্টার-গান দেখার সুযোগ হয়েছে কি?
হ্যাঁ, দেখেছি। শাকিব খানের ‘রকস্টার’ ও মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’ দুটি ভিন্ন ঘরানার সিনেমা। আমার পক্ষ থেকে সিনেমা দুটির জন্য অনেক অনেক শুভকামনা। ‘বনলতা সেন’ সিনেমাটিও বড় ক্যানভাসের। আশা করছি দর্শক ঈদে তিনটি সিনেমাই দারুণভাবে উপভোগ করবেন। আর সুযোগ হলে আমি অবশ্যই বাকি সিনেমা দুটি প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখব।

বর্তমান ব্যস্ততা
ঈদকে কেন্দ্র করে শুটিংয়ের ব্যস্ততা প্রায় শেষের দিকে। এখন পুরো মনোযোগ ‘বনলতা সেন’-এর প্রচারণায়। আমরা খুব অল্প পরিসরে সিনেমাটির প্রচারণা শুরু করেছিলাম। কিন্তু দর্শকদের যে অর্গানিক রেসপন্স ও আগ্রহ দেখছি, তা আমাদের পুরো টিমকে ভীষণ উৎসাহিত করেছে। আশা করছি নাটক, সিনেমা সব মিলিয়ে খুব ভালো ঈদ কাটবে।
ইএইচ/