বিনোদন ডেস্ক
০২ মে ২০২৬, ০১:৪২ পিএম
সীমানা ছাড়িয়ে সত্যজিৎ রায় হয়ে উঠেছিলেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের বিস্ময়। হলিউডের শিল্পী-কলাকুশলীরা তার সিনেমায় কাজ করতে মুখিয়ে থাকতেন। খ্যাতির বিড়ম্বনাও পোহাতে হয়েছে অস্কারজয়ী এ নির্মাতাকে। তার গল্প চুরি করে ছবি বানানো হয়েছে হলিউডে।
ভিনগ্রহবাসীদের নিয়ে ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ নামে একটি গল্প লিখেছিলেন সত্যজিৎ। ছাপা হয়েছিল সন্দেশ পত্রিকায়। সে গল্পেই লিখেছিলেন ‘দ্য এলিয়েন’ ছবির চিত্রনাট্য। এ ছবির গল্প চুরি করেই স্টিভেন স্পিলবার্গ বানান ‘ইটি: দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’! আজ ২ মে সত্যজিতের জন্মদিনে শোনা যাক সে গল্প।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৬৬ সালে লন্ডনে সত্যজিতের সঙ্গে দেখা হয় কিংবদন্তি কল্পবিজ্ঞান লেখক আর্থার সি ক্লার্কের। আলাপ জমে উঠে দুজনের। এক ফাকে ক্লার্ককে সত্যজিৎ শোনান ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’। গল্পটি নিয়ে সিনেমা বানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

সে আইডিয়া ক্লার্কের এতটাই মনবে ধরে যে নিজের এজেন্ট মাইক উইলসনকে ভারতে পাঠান তিনি। এই ভদ্রলোকের তাগাদায় চিত্রনাট্যে হাত দেন সত্যজিৎ। তুমুল ব্যস্ততার মধ্যে শেষ করেন ‘দ্য এলিয়েন’-এর স্ক্রিপ্ট।
পরের ঘটনাগুলো ভালোর দিকেই যাচ্ছিল। বিখ্য়াত কলম্বিয়া পিকচার্স রাজি হয় ছবিটি করতে। অভিনয়ে সম্মতি দেন হলিউডের নামকরা অভিনেতা পিটার সেলার্স। ততদিনে বিশ্ববিখ্যাত সত্যজিৎ। তার নামের ওপর বিনা পারিশ্রমিকে ছবিটির সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান হাস্কেল ওয়েক্সলার। উৎসাহের সঙ্গে আগ্রহ দেখান মার্লন ব্র্যান্ডোর মতো অভিনেতা। বিখ্য়াত কলম্বিয়া পিকচার্স রাজি হয় ছবিটি করতে। সত্যজিতের সঙ্গে ১০ হাজার ডলারের চুক্তি করে তারা।
তবুও শেষ হাসি হাসা হয়নি সত্যজিতের। এর পেছনে কলকাঠি নাড়া শুরু করেন ক্লার্কের এজেন্ট ভদ্রলোক। চিত্রনাট্য জমা দেওয়ার সময় চতুর উইলসন ‘দ্য এলিয়েন’-এর কপিরাইটে সত্যজিতের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন নিজের নামটি।
এদিকে হঠাৎ বেঁকে বসেন সেলার্স। চরিত্রটি মনমতো হয়নি বলে জানান তিনি। হঠাৎ করে বিকল্প অভিনেতাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তার ওপর গোদের ওপর বিষফোড়া হিসেবে কাজ করছিলেন উইলসন। নিজেকে সিনেমার প্রযোজক হিসেবে রাখতে চাইছিলেন। কিন্তু তাতে মত দেয়নি কলম্বিয়া পিকচার্স। উল্টো উইলসনকে ছবির সমস্ত কার্যকলাপ থেকে তারা বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেয় সত্যজিৎকে।
সে আর সম্ভব হয়নি। শত চেষ্টা করেও উইলসনকে সরাতে পারেননি সত্যজিৎ। উল্টো হাল ছেড়ে দেন। ফলে প্রযোজক হিসেবে কলম্বিয়া পিকচার্সকে পেয়েও থমকে যায় ‘দ্য এলিয়েন’। চুক্তির দশ হাজার ডলারের কানাকড়িও ছোঁয়া হয়নি সত্যজিতের।
এরপর কেটে যায় বেশ কয়েক বছর। ১৯৭৭ সালে মুক্তি পায় স্পিলবার্গের ‘ক্লোজ এনকাউন্টার্স অফ দ্য থার্ড কাইন্ড’ (১৯৭৭) এবং ১৯৮২ সালে ‘ইটি: দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’। ছবি দুটি দেখে নড়েচড়ে বসেন অপুর সংসারের নির্মাতা। কেননা চিত্রনাট্যের সঙ্গে মিলে যাচ্ছিল ‘দ্য এলিয়েন’-এর গল্প।
১৯৮৩ সালে ক্ষোভ উগরে দেন সত্যজিৎ। এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ”আমার লেখা ‘দ্য এলিয়েনে’র চিত্রনাট্যটি ছাড়া এই ছবিই তৈরি করতে পারতেন না স্পিলবার্গ।” জল গড়ায় অনবেক দূর। সত্যজিতের দাবিকে সমর্থন করেন আর্থার সি ক্লার্ক। ‘লস অ্যাঞ্জেলস টাইমসে’ও লেখালেখি হয় বিষয়টি নিয়ে।
তবে অভিযোগ উড়িয়ে দেন স্পিলবার্গ। মিথ্যা গল্প শোনান তিনি। জানান, সত্যজিৎ যখন হলিউডে তখন স্কুলছাত্র তিনি। যদিও পরে জানা যায়, সেসময় হলিউডে ইন্টার্ন করছিলেন ‘ইটি: দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’-এর নির্মাতা।
এরপর আর ‘দ্য এলিয়েন’ বানাননি সত্যজিৎ। কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন এক রেডিও সাক্ষাৎকারে। জানিয়েছিলেন তিনি ছবিটি নির্মাণ করলে বলা হবে, স্পিলবার্গের আইডিয়া ‘ধার’ করেছেন। অথচ বিষয়টি একেবারেই উল্টো।

‘দ্য এলিয়েন’-এর চিত্রনাট্য আজও আছে। শুধু আলোর মুখ দেখেনি ছবিটি। তবে এত বছর পরও বিতর্কের হয়নি অবসয়ান। আজও স্পিলবার্গ্কে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করান অনেকে।
আরআর