নিজস্ব প্রতিবেদক
০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২১ পিএম
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আগমন উপলক্ষে ঢাকা কলেজের দেয়াল থেকে সাদা রং দিয়ে মুছে ফেলা হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি গ্রাফিতি অঙ্কনে যুক্ত ছাত্রসংগঠনের নেতারাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তবে গ্রাফিতি মুছে ফেলার বিষয়ে কিছুই জানতেন না বলে দাবি করেছেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস। অন্যদিকে, কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মুছে ফেলা গ্রাফিতিগুলো পুনরায় আঁকার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে গ্রাফিতি মুছে ফেলার কাজ শুরু হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, কলেজের নায়েমের গলিসংলগ্ন সীমানাপ্রাচীরে আন্দোলনের সময় আঁকা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতিগুলো সাদা রং দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। মিরপুর রোডসংলগ্ন কলেজের সামনের অংশের দেয়াল থেকেও মুছে ফেলা হয়েছে বিভিন্ন গ্রাফিতি। এর মধ্য দিয়ে দেয়ালে ফুটে ওঠা জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার সংগ্রাম, আন্দোলনের স্মৃতি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিগুলোও আড়ালে চলে গেছে।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৎকালীন গ্রাফিতি অঙ্কনের নেতৃত্ব দেওয়া সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ঢাকা কলেজ শাখার সভাপতি নাহিয়ান রেহমান রাহাত। তিনি বলেন, ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসের দেয়াল থেকে জুলাইয়ের গ্রাফিতি মুছে ফেলার মধ্য দিয়ে কলেজ প্রশাসন একটি অগণতান্ত্রিক ও জুলাইয়ের স্মৃতিবিরোধী দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। কিন্তু কোনোভাবেই জুলাইয়ের স্মৃতি, সংগ্রাম ও আকাঙ্ক্ষাকে মুছে ফেলা যাবে না। যারা জুলাইয়ের গ্রাফিতি মুছে ফেলতে পারে, তারা কীভাবে জুলাইয়ের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে- এই প্রশ্ন আমরা করতে চাই।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি ক্যাম্পাসে আসবেন, এটি কলেজের জন্য খুব ভালো ব্যাপার। কিন্তু তার আগমন উপলক্ষে পরিচ্ছন্নতার অজুহাতে দেয়াল থেকে গ্রাফিতি মুছে ফেলা যায় না। গ্রাফিতি কি অপরিষ্কার? এটি তো ফ্যাসিবাদী মানসিকতার প্রকাশ। যখন যা ইচ্ছা, তারা তাই করছে।
নাহিয়ান রেহমান রাহাত বলেন, তারা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করতে পারে না বলেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নামে গ্রাফিতি মুছে ফেলতে পারে। ক্যাম্পাস পরিষ্কার করতে হলে জঞ্জালগুলো পরিষ্কার করুক। মাঠের মধ্যে ময়লা পড়ে থাকে, সেগুলো পরিষ্কার করতে পারে না? দেয়াল পরিষ্কার করতে গিয়ে জুলাইয়ের যে গ্রাফিতিগুলো এখনো সবার কাছে উজ্জ্বল, সেগুলো অপসারণের কোনো মানে হয় না।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরাও। কলেজের শিক্ষার্থী মো. জুলফিকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে লেখেন, ‘ঢাকা কলেজের প্রতিটি দেয়ালে জুলাইয়ের সব গ্রাফিতি এভাবে মুছে দেওয়া কতটা সমীচীন? পুনরায় আবার গ্রাফিতি আঁকা হবে কি না, কলেজ প্রশাসনের কাছে জানতে চাই। এভাবে জুলাইকে মুছে দিতে পারি না। সব ছাত্র প্রতিনিধির বিষয়টি নিয়ে কথা বলা উচিত।’
তবে গ্রাফিতি মুছে ফেলার পেছনে জুলাইয়ের স্মৃতি মুছে দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব মো. মিল্লাদ হোসেন। তিনি বলেন, কলেজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ক্যাম্পাসে আসবেন। তাই সৌন্দর্য রক্ষার অংশ হিসেবে পুরো ক্যাম্পাসের দেয়ালগুলোতে রং করা হচ্ছে। জুলাইয়ের গ্রাফিতি মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে রং করা হচ্ছে না।
পুনরায় গ্রাফিতিগুলো আঁকার বিষয়ে তিনি বলেন, জুলাইয়ের স্মৃতিগুলো আমরা আমাদের মতো করে আঁকব। কিংবা অন্যান্য সংগঠন বা সামাজিক সংগঠনগুলো চাইলে সুন্দরভাবে আবারও গ্রাফিতি আঁকতে পারে।
এ বিষয়ে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, তিনি ক্যাম্পাসে থাকাকালীন এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না। পরে বিষয়টি জানতে পেরেছেন। ক্যাম্পাসে থাকাকালীন জানতে পারলে গ্রাফিতি মুছে ফেলতে নিষেধ করে আসতেন।
তিনি আরও বলেন, গ্রাফিতির ব্যাপারে আমাদের কোনো ধরনের নেতিবাচক নির্দেশনা নেই। বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলছি। এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে কথা হয়েছে।
পুনরায় গ্রাফিতি আঁকার বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, যেগুলো মুছে ফেলা হয়েছে, সেগুলো আবার লিখে দিতে হবে। আর যেগুলো এখনো মোছা হয়নি, সেগুলো না মুছে কীভাবে সংস্কার করা যায়, তা দেখতে হবে। কারণ আমাদের সংস্কার দরকার, এটাই মূল কথা। তবে গ্রাফিতিকে বাদ দিয়ে নয়।
অন্যদিকে কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক আনোয়ার মাহমুদ বলেন, কলেজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সীমানাপ্রাচীরের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে। সেখানে কিছু জুলাইয়ের গ্রাফিতি মুছে ফেলতে হয়েছে। সেগুলোর ছবি রাখা হয়েছে। ছবিগুলো অনুসরণ করে পুনরায় গ্রাফিতি আঁকা হবে।
তিনি আরও জানান, একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কোনো গ্রাফিতি মুছে না ফেলার বিষয়ে প্রকৌশলীকে বলা হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া তারা আর কোনো গ্রাফিতি মুছবেন না।
এদিকে, দেয়াল থেকে জুলাইয়ের গ্রাফিতি মুছে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের ঢাকা কলেজ শাখা। একই সঙ্গে মুছে ফেলা গ্রাফিতিগুলো দ্রুত পুনরুদ্ধারসহ চার দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
উল্লেখ্য, ঢাকা কলেজের ১৮৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কলেজটির সাবেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এবং বাংলাদেশের বর্তমান ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
এম/এসআই