নিজস্ব প্রতিবেদক
০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ, দ্রুত নবম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়ন, নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা এবং বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকদের দ্রুত বদলির ব্যবস্থাসহ আট দফা দাবি জানিয়েছে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট। একই সঙ্গে চাকরির বয়সসীমা ৬৫ বছর করা, শতভাগ উৎসব ভাতা ও সরকারি নিয়মে বাড়িভাড়া দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের সভাপতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মো. সেলিম ভূঁইয়া, এমপি।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও চাকরির নিরাপত্তা, আর্থিক সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবনমান নিশ্চিত করতে তাদের চাকরি জাতীয়করণ আবশ্যক।
সংগঠনটির দাবি, দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষার দায়িত্ব পালন করছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
সংবাদ সম্মেলনে চাকরি জাতীয়করণের সম্ভাব্য ব্যয়ের একটি হিসাবও তুলে ধরা হয়। সংগঠনটির হিসাবে, বেতন-ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, বাড়িভাড়া, দুটি উৎসব ভাতা ও বৈশাখী ভাতাসহ চাকরি জাতীয়করণে বছরে প্রায় ২৬ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের বেতন, সেশন চার্জ, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ থেকে আয়, সঞ্চিত অর্থের সুদ ও রিজার্ভ ফান্ড থেকে বছরে প্রায় ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আয় হতে পারে বলে দাবি করেছে ঐক্যজোট। সংগঠনটির উপস্থাপিত হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যমান সরকারি ব্যয় ও সম্ভাব্য আয় সমন্বয় করলে জাতীয়করণে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা।
দ্রুত নবম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ১৯৮০ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিক্ষক-কর্মচারীদের ৫০ শতাংশ বেতন প্রদানের মাধ্যমে জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বেতন স্কেল পরিবর্তন হলেও শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা পাননি।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৬৭৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত এমপিওভুক্ত করার দাবিও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। সংগঠনটির নেতারা বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক-কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করছেন। আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে তাদের পরিবার নিয়ে চলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই দ্রুত এমপিওভুক্তির মাধ্যমে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকদের দুর্ভোগের বিষয়টি তুলে ধরে সংগঠনটি জানায়, অনেক শিক্ষক নিজ উপজেলা, জেলা কিংবা বিভাগের বাইরে ৩০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে চাকরি করছেন। এতে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পাশাপাশি তাদের পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনেও নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, শিক্ষকদের বদলির জন্য সফটওয়্যার চালু করা হলেও বিভিন্ন ত্রুটির কারণে আবেদন নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এসব সমস্যা সমাধান করে দ্রুত বদলির আদেশ জারির দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৫০ শতাংশের পরিবর্তে শতভাগ উৎসব ভাতা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ঐক্যজোট। সংগঠনটির মতে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান উৎসব ভাতা দিয়ে পরিবার নিয়ে ঈদ উদযাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই উৎসব ভাতা মূল বেতনের সমান করা প্রয়োজন।
বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রেও সরকারি নিয়ম অনুসরণের দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া পান। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে এ অর্থ দিয়ে বাসা ভাড়া নেওয়া কঠিন। ফলে তাদের সরকারি নিয়মে বাড়িভাড়া দেওয়া উচিত।
শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরির বয়সসীমা ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর করার দাবিও জানানো হয়। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকরির অবসরের বয়সসীমাও বাড়ানো হয়েছে। অভিজ্ঞ শিক্ষকদের জ্ঞান ও দক্ষতা শিক্ষাক্ষেত্রে কাজে লাগাতে তাদের চাকরির বয়সসীমা বাড়ানো প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রথম থেকে দ্বাদশ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সনদধারীদের নির্বাহী আদেশে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়। সংগঠনটির অভিযোগ, বিগত সরকারের সময়ে অনেক নিবন্ধনধারী নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা এসব প্রার্থীর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
এক্ষেত্রে নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া আশ্বাস বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানান সংগঠনটির নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এমএইচ/এফএ