মাহফুজ উল্লাহ হিমু
০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম
টানা ১২ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডিতে পৌঁছান একজন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে তাকে পার হতে হয় নানা শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা, নির্বাচনী পরীক্ষা ও একাধিক মূল্যায়ন ধাপ। অথচ এত দীর্ঘ প্রস্তুতির পরও এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থী। পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে, যা গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বোর্ডভেদে ফলাফলের বড় ব্যবধান এবং বিপুল শিক্ষার্থীর বিষয়ভিত্তিক অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনাও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষার মান নিয়ে।
এবার সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের পাঁচটিতেই অর্ধেকের বেশি পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। কোনো বোর্ডে পাসের হার ৬০ শতাংশ ছাড়ালেও কোথাও তা ৪৫ শতাংশের নিচে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলেও রয়েছে বড় ফারাক।
এমন ফলাফলকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য আশঙ্কাজনক বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান। তার মতে, শিক্ষার্থীরা একের পর এক শ্রেণি পার হলেও প্রয়োজনীয় শিখন অর্জন করতে পারছেন না। এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষকসংকট, দক্ষ শিক্ষকের অভাব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি। ফলে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা এখন পরীক্ষার ফলাফলেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ঢাকা মেইলকে মজিবুর রহমান বলেন, ‘এবারের ফলাফল শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, অত্যন্ত আশঙ্কাজনকও। এই ফলাফলের মাধ্যমে আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থার এক ধরনের রোগনির্ণয় হয়ে গেছে। শিক্ষাব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর, কতটা ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে।’
দুই দশকের ফলাফলে বড় পরিবর্তন
বিগত বছরগুলোর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬ সালে পাসের হার ছিল ৭২ শতাংশ। পরের দুই বছর তা কমে ২০১৭ সালে ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৬৪ দশমিক ৬৭ শতাংশে নামে। ২০১৯ সালে আবার পাসের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ শতাংশে।
এরপর করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ২০২০ সালে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। সেবার পরীক্ষার্থীদের পূর্ববর্তী পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। ফলে শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হন। ২০২১ সালেও পাসের হার ছিল ৯৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
পরবর্তী সময়ে পাসের হার কমতে শুরু করে। ২০২২ সালে ৮৪ দশমিক ৩১ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হন। অর্থাৎ করোনা-পরবর্তী কয়েক বছরেও পাসের হার তুলনামূলক বেশি ছিল।
তবে ২০২৫ সালে সেই চিত্র পাল্টে যায়। ওই বছর পাসের হার নেমে আসে ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে। আগের বছরের তুলনায় এক ধাক্কায় ১৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ পয়েন্ট কমে। এবার তা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আরও পাঁচ শতাংশ কমেছে।
দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ পয়েন্ট। ২০২৪ সালে যেখানে প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে প্রায় ৭৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, সেখানে এবার উত্তীর্ণ হয়েছেন প্রায় ৫২ জন।
ফলাফলের এমন পরিবর্তনের পেছনে পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নপদ্ধতির কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। বিশেষ করে কয়েক বছর ধরে তুলনামূলক বেশি পাসের হারের পর হঠাৎ বড় পতন ঘটায় মূল্যায়নের ধারাবাহিকতা নিয়েও আছে আলোচনা।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, প্রতিবছর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য একটি নীতিমালা থাকে। সেখানে কী ধরনের উত্তরের জন্য কত নম্বর দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হয়। ফলে মূল্যায়ন নীতিমালার প্রভাব ফলাফলের ওপর পড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এই অধ্যাপক আরো বলেন, ‘মূল্যায়ন নীতিমালারও ফলাফলের ওপর প্রভাব রয়েছে। এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশে এমন কোনো মহাবিপর্যয় ঘটেনি, যার কারণে হঠাৎ এত শিক্ষার্থী ফেল করবে। সুতরাং মূল্যায়ন পদ্ধতির একটি প্রভাব থাকতেই পারে।’
অতীতে পরীক্ষার ফল ভালো দেখানোর জন্য বেশি নম্বর দিতে উৎসাহিত করার অভিযোগ শোনা যেত বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে নিজের কাছে কোনো প্রমাণ নেই বলে স্পষ্ট করেছেন এই শিক্ষাবিদ।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার যথাযথভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের দাবি করছে। সেটি হয়ে থাকলে ফলাফলের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থাই সামনে এসেছে। এখন সেই অবস্থার উন্নয়নে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।’
বোর্ডভেদে বড় ব্যবধান, পাঁচটিতে অর্ধেকের বেশি ফেল
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বোর্ডভিত্তিক ফলাফলেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাসের হার ঢাকা বোর্ডে, ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, যেখানে পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে ঢাকার পর চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং সিলেটে ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন।
অন্যদিকে কুমিল্লায় পাসের হার ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ, দিনাজপুরে ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ৪৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যশোরে ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং বরিশালে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাঁচটিতেই পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ এসব বোর্ডে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের অর্ধেকের বেশি ফেল করেছে। সর্বোচ্চ পাস করা ঢাকা বোর্ডের সঙ্গে সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকা বরিশালের ব্যবধান ১৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলও তুলনামূলক ভালো। এই বোর্ডের পাসের হার সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে আটটির চেয়ে বেশি। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে অর্ধেকের বেশি পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেননি।
শিক্ষা বোর্ডভেদে ফলাফলের এই পার্থক্যের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা বলছেন অধ্যাপক মজিবুর রহমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এই অধ্যাপক বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন না করেই অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী শ্রেণিতে উঠে যাচ্ছেন। সেই ঘাটতি নিয়েই তারা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছেন।
এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক পর্যায়ে যা শেখার কথা ছিল, তা না শিখেই মাধ্যমিকে চলে গেছে। আবার মাধ্যমিক পর্যায়ে যা শেখার কথা, সেটিও পুরোপুরি না শিখে উচ্চ মাধ্যমিকে এসেছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা একের পর এক শ্রেণি পার হয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জন করতে পারেনি।’
উচ্চ মাধ্যমিকের মাত্র দুই বছরে আগের ১২ বছরের পড়াশোনার ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা সম্ভব, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এই শিক্ষাবিদ আরও বলেন, যারা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, তারা এর আগে নির্বাচনী পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে এসেছেন। এর বাইরেও প্রায় তিন লাখ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেননি বলে জানা যায়। তাদের হিসাবও বিবেচনায় নিলে পরিস্থিতি আরও ফলাফলের থেকেও উদ্বেগজনক বলে মনে করেন তিনি।
আরও পড়ুন: এইচএসসিতে শতভাগ পাস কতটি প্রতিষ্ঠানে?
শিক্ষক সংকটের প্রভাব পড়ছে পড়াশোনায়
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতির সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকার বিষয়টিও যুক্ত বলে মনে করেন অধ্যাপক মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম শিক্ষক নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও শিক্ষক থাকলেও নির্দিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক নেই।
উদাহরণ দিয়ে অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, কোনো কলেজে হয়তো ৫০ জন শিক্ষক প্রয়োজন, অথচ সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ১৫ জন। ফলে প্রয়োজনের এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষক দিয়েই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির (আইসিটি) মতো বিষয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে।
দেশের কলেজগুলোতে শিক্ষক সংকটের চিত্র উঠে এসেছে সরকারি পরিসংখ্যানেও। গত ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি কলেজে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ৬৫৬টি প্রভাষক পদ এবং সদ্য সরকারি হওয়া কলেজে নন-ক্যাডার প্রভাষকের ২ হাজার ৪১০টি পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ এই দুই শ্রেণিতে মোট ৩ হাজার ৬৬টি প্রভাষক পদ শূন্য। এ ছাড়া বেসরকারি এমপিওভুক্ত কলেজে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের ১ হাজার ৩৪৯টি পদ শূন্য রয়েছে।
অন্যদিকে ব্যানবেইসের ২০২৪ সালের শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের বিভিন্ন ধরনের কলেজে শিক্ষক ছিলেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭ জন। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮৫ জনে। আর ২০২৪ সালে শিক্ষক সংখ্যা আরও কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৭৮৯ জনে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে কলেজে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা কমেছে ১০ হাজার ২১৮ জন, যা প্রায় ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে আইসিটি বাধ্যতামূলক হলেও সব কলেজে বিষয়টির শিক্ষকপদ সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে আইসিটি ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে সমস্যা শুধু শিক্ষকের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয় বলে মনে করেন তিনি। অনেক ক্ষেত্রে দক্ষ ও মানসম্মত শিক্ষকেরও ঘাটতি রয়েছে।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি কলেজগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধার ঘাটতিও সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। ব্যানবেইসের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪ হাজার ৮৭৬টি কলেজে আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন ৫ হাজার ৫ জন। এর মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন ১ হাজার ৪৭৯ জন। অন্যদিকে ২০৭টি কলেজে কম্পিউটার সুবিধা নেই, যার মধ্যে ১৬৪টিই উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি, যেখানে মেধাবী ও যোগ্য মানুষ শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হবেন। শিক্ষকদের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থানকে সেভাবে উন্নত করতে পারিনি। ফলে অনেকে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চান না।’
ইংরেজি ও আইসিটির মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু শিক্ষক সংকট নয়, প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক সুবিধার অভাবও শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে আইসিটি শিক্ষার জন্য দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ল্যাব নেই। কোথাও ল্যাব থাকলেও প্রশিক্ষক নেই। আবার কোথাও প্রশিক্ষক থাকলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই। এমন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, যেখানে ল্যাব ও প্রশিক্ষক দুটোই আছে, কিন্তু কম্পিউটার নষ্ট থাকায় শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগের বৈষম্যও তৈরি হচ্ছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা বাসায় কম্পিউটার কিংবা অন্যান্য প্রযুক্তিগত সুবিধা ব্যবহার করে শেখার সুযোগ পেলেও অনেক শিক্ষার্থীর সেই সুযোগ নেই।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ‘যাদের বাসায় ব্যক্তিগত কম্পিউটার রয়েছে, তারা কিছুটা হলেও শেখার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু সব শিক্ষার্থীর তো সেই সুযোগ নেই। ফলে একটি বড় অংশ এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও পরিকল্পনার ঘাটতি
ফলাফলের সংকটের পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অভাবকেও দায়ী করছেন অধ্যাপক মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজনীয় শিক্ষক, অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত না করেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।
কোথাও প্রভাব খাটিয়ে কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, কোথাও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই অনার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করার মতো শিক্ষক ও অবকাঠামো রয়েছে কি না, তা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
শিক্ষা বিভাগের তথ্যেও এমন চিত্র স্পষ্ট দেখা যায়। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনামলে দেশে প্রয়োজন-চাহিদার যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়াই বেড়েছে অসংখ্য কলেজ। শহর থেকে উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত এলাকাতেও একের পর এক গড়ে উঠেছে নতুন নতুন কলেজ। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বাড়লেও সেই অনুপাতে শিক্ষার্থী বাড়েনি। যার ফল দেখা গেছে ২০২৬ সেশনে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে।
ভর্তির আবেদন ও ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায় কোথাও শত শত আসন খালি, আবার কোথাও একটি আসনের বিপরীতে আবেদন পড়ছে ৩০ থেকে ৩৩টি পর্যন্ত। চলতি শিক্ষাবর্ষে একাদশে ভর্তির প্রথম ধাপেই ৪১৬টি কলেজ-মাদরাসা কোনো শিক্ষার্থী পায়নি। আরও প্রায় ৮০০ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে মাত্র ১ থেকে ১০ জন।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) হিসাবে, ২০১০ সালে দেশে কলেজশিক্ষার আওতায় প্রতিষ্ঠান ছিল ৩ হাজার ৩২৪টি। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৮৭৬টি। অর্থাৎ ১৪ বছরে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ১ হাজার ৫৫২টি প্রতিষ্ঠান, বৃদ্ধির হার প্রায় ৪৭ শতাংশ।
এ পরিস্থিতিকে ‘অপরিকল্পিত শিক্ষায়ন’ হিসেবে বর্ণনা করে অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। শুধু স্কুল-কলেজ নয়, মাদরাসাসহ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই এ সমস্যা দেখা যায়।
শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান সংকটের মধ্যেই নতুন নতুন বিষয় বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বিশেষ করে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার মতো উদ্যোগ নেওয়ার আগে বাংলা, ইংরেজিসহ মৌলিক বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, ‘আমরা এখনও বাংলা ও ইংরেজির পর্যাপ্ত শিক্ষক দিতে পারছি না। শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিশ্চিত করতে পারছি না। সেখানে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হচ্ছে।’
নতুন ভাষা বাধ্যতামূলক করা হলে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। বিদ্যমান শিক্ষকসংকটের মধ্যে সেই সক্ষমতা কতটা রয়েছে, তা আগে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
এমএইচ/এমআর