নিজস্ব প্রতিবেদক
২০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৬ পিএম
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন অবিলম্বে ১১তম গ্রেডে উন্নীত করাসহ তিন দফা দাবিতে ছয় ধাপের আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি।
আগামী ৮ নভেম্বর সারাদেশে কালো ব্যাজ ধারণ ও জেলা প্রশাসকদের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার মধ্য দিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি শুরু করবেন শিক্ষকরা। এরপরও দাবি আদায় না হলে ঢাকায় মহাসমাবেশ এবং প্রয়োজনে আমরণ অনশনের ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নীতিনির্ধারণী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. মোয়াজ্জেম হোসেন শাহীন। স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি।
শিক্ষকদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে নবম জাতীয় বেতন স্কেলে সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড বাস্তবায়ন, চাকরির ৮ ও ১৪ বছর পূর্তিতে দুটি উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করা এবং জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতির ব্যবস্থা করা।
এ ছাড়া সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপিসহ শিক্ষকদের হয়রানিমূলক বদলির আদেশ বাতিল এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভাগীয় মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
নভেম্বরে কালো ব্যাজ, ডিসেম্বরে মহাসমাবেশ
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের প্রথম ধাপ শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে আগামী ৮ নভেম্বর সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কালো ব্যাজ ধারণ করবেন। একই দিনে প্রয়াত শিক্ষিকা ফাতেমা এবং আন্দোলনে নিহত ও আহতদের স্মরণে কেন্দ্রীয়ভাবে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হবে।
তৃতীয় ধাপে ৮ নভেম্বরেই দেশের প্রতিটি জেলায় শিক্ষক প্রতিনিধিরা জেলা প্রশাসকদের কাছে তিন দফা দাবি সংবলিত স্মারকলিপি দেবেন।
চতুর্থ ধাপে আগামী ১৭ ডিসেম্বর বিভাগীয় কমিশনারদের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। এরপর বার্ষিক পরীক্ষা শেষে ডিসেম্বরের মধ্যেই ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অথবা শাহবাগে মহাসমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। মহাসমাবেশের নির্দিষ্ট তারিখ পরে জানানো হবে।
শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন, এসব কর্মসূচির পরও দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে ষষ্ঠ ধাপে জাতীয় প্রেসক্লাব অথবা শাহবাগে অবস্থান ও আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করা হবে।
প্রতিশ্রুতির পরও প্রজ্ঞাপন না হওয়ায় ক্ষোভ
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক নেতারা অভিযোগ করেন, গত বছরের নভেম্বরে আন্দোলনের পর সরকারের পক্ষ থেকে সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড দেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৮ থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’ এর ব্যানারে সহকারী শিক্ষকরা দশম গ্রেডের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, আন্দোলনের প্রথম দিন ৮ নভেম্বর শাহবাগ এলাকায় পুলিশের টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও লাঠিচার্জে বহু শিক্ষক আহত হন। তাদের মধ্যে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপিসহ প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষক গুরুতর আহত হয়েছিলেন। পরে অসুস্থ অবস্থায় ফাতেমা নামে এক শিক্ষিকার মৃত্যু হয়।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৯ নভেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়। পরদিন ১০ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে আরও একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষক নেতাদের দাবি, ওই বৈঠকে উভয় মন্ত্রণালয় সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানায়। সরকারের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে ফিরে যান।
তারা জানান, ওই দিনই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। পরে তা তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও প্রচার করা হয়েছিল।
তবে এখন পর্যন্ত ১১তম গ্রেড বাস্তবায়নের সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন শিক্ষক নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, চলতি বছরের ১১ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দেয়। কিন্তু এরপরও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে বেতনবৈষম্যের অভিযোগ
শিক্ষক নেতারা বলেন, সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকদের বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় দুই পদের মধ্যে তিন গ্রেডের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
তাদের দাবি, একসময় প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা একই গ্রেডে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে বেতন কাঠামোর এ ব্যবধান সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের ন্যায্য মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে এলেও সমাধান না হওয়ায় আবার আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছি।
তিন দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক আন্দোলন অব্যাহত থাকবে এমন ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষক নেতারা।
এমএইচ/এফএ