Dhaka Mail Logo

শিক্ষা / সারাদেশ

উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে ৩ দিন ধরে অচল চুয়েট

জেলা প্রতিনিধি

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম

অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনের তৃতীয় দিন আজ বৃহস্পতিবারও সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।

ফলে ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব ধরনের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। চলছে না প্রশাসনিক কার্যক্রমও। তবে শিক্ষকরা বলছেন, তারা অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ করেননি। শিক্ষার্থীরা না আসায় ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে শাটডাউন কর্মসূচির মুখে গত তিনদিন ধরে চট্টগ্রামে অবস্থান করেও চুয়েট ক্যাম্পাসে যেতে পারছেন না নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে উপাচার্যের দায়িত্ব নিতে পারছেন না।

এ ঘটনায় চট্টগ্রামের স্থানীয় সচেতন মহল ও রাজনীতিকদের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে, উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমে কেন এত ভরসা চুয়েট শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের। আর এ পদে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের কী সমস্যা রয়েছে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও শাটডাউডন কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষাথী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, নবনিযুক্ত উপাচার্যের ব্যক্তিগত বা একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই। মূলত কোনো কারণ ছাড়াই অধ্যাপক সায়েমকে অপসারণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেই তাদের এই আন্দোলন।

যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারহান হাসনাত আদিব ও শিক্ষার্থী অরিন্দম দেসহ অন্যান্যরা জানান, কোনো ধরনের দৃশ্যমান কারণ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই গত ২১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। স্বল্প সময়ের দায়িত্বে অধ্যাপক সায়েম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, সেই ধারাবাহিকতা রক্ষার্থেই তাকে পুনর্বহাল করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে এই আন্দোলনকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় দ্বন্দ্বের সঙ্গে না জড়ানোর জোর দাবি জানান তারা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শাটডাউন, গণ-অবস্থান ও প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।

CUET

চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, উনি (শরীফুল) আমার স্টুডেন্ট ছিলেন। আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। তবে আমি এখানে শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে একটি ফোরামের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমি ফোরামের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারি না।

সূত্র মতে, গত ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। কিন্তু গত ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে পরিবর্তন করে কুয়েটের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এই প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে চুয়েট ক্যাম্পাস। গত মঙ্গলবার ও বুধবার দুই দিন কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। সর্বশেষ আজ বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেও ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেন চুয়েটের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

সরকারের প্রতি দাবি মেনে নিয়ে ক্যাম্পাস সচল করার অনুরোধ জানিয়ে খোলা চিঠিতে শান্তির বার্তা লিখে পায়রা উড়িয়ে দেন তারা। এদিন দুপুরে সংবাদ সম্মেলন থেকে সন্ধ্যায় মশাল মিছিলের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত না হয়ে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সর্বাত্মক শাটডাউন চালিয়ে যাবার আহ্বান জানানো হয়।

চুয়েট শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকেও সকালে মিছিল নিয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে সংহতি জানানো হয়েছে। সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ জানান, সংবাদ সম্মেলন করে তারা শিক্ষক সমিতির চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণ করবেন।

উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর গত মঙ্গলবার রাতে খুলনা থেকে চট্টগ্রামে আসেন অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। বৃহস্পতিবার দুপুরে মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, আমি ইচ্ছে করলে যেকোনোভাবে জয়েন করতে পারি। কিন্তু জয়েন করাটা তো বড় বিষয় না। আমি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।

তিনি আরও বলেন, সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি দেখছে। তারা আন্দোলনের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে আমি অবশ্যই যাব।

CUET2

সিনিয়র শিক্ষক, ডিনদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য দিয়ে অধ্যাপক শরীফুল বলেন, শিক্ষক সমিতিতে সিনিয়র যারা আছেন তারা কেউ এ আন্দোলনের সঙ্গে একমত নন। জুনিয়র কিছু টিচার এই আন্দোলন করছে। আমি শিক্ষক সমিতির সভাপতির সঙ্গে কথা বলেছি। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্সের ডিন অধ্যাপক দোলন, সায়েন্স ফ্যাকাল্টির অধ্যাপক আবু কাউছারের সঙ্গে কথা বলেছি। ক্লাস-পরীক্ষা যেন বন্ধ না থাকে সেটা বলেছি। কারণ এটার জবাবদিহি কিন্তু পরে শিক্ষকদেরই করতে হবে। নিরাপত্তা শাখাকে বলেছি ক্যাম্পাস যেন নিরাপদ থাকে।

তিনি আরও বলেন, আন্দোলন করার অধিকার তাদের আছে। তবে নেগোসিয়েশনের পথ খোলা না রেখে আন্দোলন কাম্য নয়। আমি কুয়েটের টিচার। এজন্য চুয়েটে আমার নিয়োগ তো অবৈধ হতে পারে না। চুয়েট দেশের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। আমি নিজেও চুয়েটের ছাত্র। সরকার আমাকে যোগ্য মনে করেছে বলেই নিয়োগ দিয়েছে। আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন আছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

চুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. কাজী দেলোয়ার হোসেন বলেন, উনি (শরীফুল) আমাকে কল করেছিলেন। ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে আমরা কী করতে পারি ! আমরা তো এটা বন্ধ করিনি। ছাত্রছাত্রীরা যদি ক্লাসে না আসে আমরা কী করতে পারি! আলোচনার একটা পথ তৈরি করতে হবে। সেটা তো আমি পারব না। যারা দায়িত্বে আছেন তারা পারবেন।

চুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল। তবে অনিরাপদ নয়। হোস্টেলগুলোর কার্যক্রম ঠিকঠাকভাবে চলছে। আমরা শিক্ষকরা তো ক্লাসে যাচ্ছি। বৃহস্পতিবার দুপুরেও পরীক্ষার হলে শিক্ষকরা গেছেন। কিন্তু স্টুডেন্টরা বলছেন দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা ক্লাসে ফিরবেন না।

প্রতিনিধি/এফএ