নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম
দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের হয়রানি, বয়কট, বুলিং, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মব-সহিংসতা এবং হল থেকে বহিষ্কারের ঘটনার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন অধিকারকর্মী, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আট দফা দাবি তুলে ধরেছেন তারা।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতের ৮ দফা দাবি সম্বলিত ১৩৫ জন নাগরিকের স্বাক্ষরিত একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।
রাজধানীতে রিপোটার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘সচেতন নাগরিকবৃন্দ’ এর উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই বিবৃতি ও দাবিগুলো তুলে ধরেছেন বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ডুয়েট, হাবিপ্রবি এবং বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে সংঘটিত সাম্প্রতিক হয়রানি ও বহিষ্কারের ঘটনাগুলোর তীব্র নিন্দা জানানো হয়।
সভাপতির বক্তব্যে ডাইভার্স ফেমিনিস্টের আহ্বায়ক ও শিক্ষক নির্ণয় ইসলাম বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা। ক্যাম্পাসে কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব; আর জনসমক্ষে পুলিশের উপস্থিতিতে নাগরিক হয়রানির শিকার হলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শিক্ষকের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীদের পক্ষপাতহীন মূল্যায়নের ওপরও জোর দেন তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে বহ্নিশিখার আহ্বায়ক তাসাফী হোসেন বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা কেবল নীতিগত ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না, এর জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিতা। আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, নারী ও এলজিবিটিকিউআইএ+ সহ সব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের আহ্বায়ক মারজিয়া প্রভা বলেন, মৌলিক অধিকার কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় বা গোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ হতে পারে না। পরিচয় একটি সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। কারও অধিকার দাবি করার অর্থ অন্যকে আক্রমণ বা সহিংসতার অধিকার দাবি করা নয়।
হিজড়া ও ট্রান্স শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে ট্রান্সজেন্ডার মানবাধিকার কর্মী জয়া শিকদার বলেন, সমাজ একদিকে হিজড়াদের নির্দিষ্ট পেশা নিয়ে অভিযোগ তোলে, অন্যদিকে তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত করে রাখে। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়তে হলে এই দ্বৈত অবস্থানের পরিবর্তন জরুরি।
ব্যাঞ্জনা ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক মুনতাসীর রহমান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ পাওয়া কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি স্বাভাবিক অধিকার। পরিচয় বা যৌনতা নিয়ে অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অনিশ্চিত করে দেওয়া হচ্ছে, যা কাম্য নয়।
মন্দ্রের আহ্বায়ক মো. হাসিবুর রহমান ঔপনিবেশিক আমলের পেনাল কোডের ৩৭৭ ধারার সমালোচনা করে বলেন, এটি একটি বৈষম্যমূলক আইন। ৬০০ আলেমের দেওয়া একটি বিবৃতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শিশু সুরক্ষার প্রয়োজনকে ব্যবহার করে সম্মতিমূলক যৌন সম্পর্ক বা লিঙ্গ পরিচয়কে যৌন নির্যাতনের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। সব ভুক্তভোগীদের আইনি সুরক্ষার দাবি জানাই।
এক প্রশ্নের জবাবে বক্তারা স্পষ্ট করেন, কোনো শিক্ষার্থীর পরিচয় বা অধিকারকে কেন্দ্র করে তাকে হয়রানি, বর্জন বা সহিংসতার মুখে ঠেলে দেওয়াকে অন্য শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই। মতপার্থক্য মোকাবিলার জন্য নিরাপদ ও বৈষম্যহীন প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেন তারা।
‘সচেতন নাগরিক’ পরিচয়ের বিষয়ে তারা জানান, এটি কোনো একক সংগঠন নয়; বরং শিক্ষক, অধিকারকর্মী ও নাগরিকদের একটি যৌথ উদ্যোগ।
বিবৃতিতে যা বলা হয়েছে
১৩৫ নাগরিকের স্বাক্ষরিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়, এলজিবিটিকিউআইএ+ পরিচয় বা ‘সমকামিতা’র অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীদের জিনিসপত্র লুট করা, সম্মতি ছাড়া গোপনে ভিডিও ধারণ ও প্রচারের ঘটনা ঘটছে। অথচ এগুলোকে ‘অনৈতিক’ বা শাস্তিযোগ্য আচরণ হিসেবে চিহ্নিত না করে উল্টো ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদেরই হল থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, ‘এই দ্বৈত নীতি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি বৈষম্য ও সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার আরেকটি রূপ। অনলাইন হোক বা আবাসিক হল— শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না।’
৮ দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলন থেকে শিক্ষার্থীদের অধিকার সুরক্ষায় ৮টি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া দেওয়া সব বহিষ্কারাদেশ অবিলম্বে বাতিল করে শিক্ষার্থীদের হল ও ক্লাসে ফেরা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রাইভেসি লঙ্ঘন, মোবাইল তল্লাশি, ব্ল্যাকমেইলিং ও ভিডিও প্রচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও মবের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া নিষিদ্ধ করা।
এ ছাড়াও সংঘবদ্ধ হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নীরব না থেকে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
ক্যাম্পাসে সব শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মানসিক সুরক্ষা এবং বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার শিক্ষার্থীদের সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের দাবিও জানান তারা।
বিবৃবিতে দাবি করা হয়, মব জাস্টিস বন্ধ করে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হবে এবং সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে হবে।
এই বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, শিল্পী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী স্বাক্ষর করেছেন। উদ্যোগটির সঙ্গে রয়েছে ডাইভার্স ফেমিনিস্ট, বহ্নিশিখা, রেড ফেমিনিস্ট ব্লক, ব্যাঞ্জনা ফাউন্ডেশন ও মন্দ্র।
দাবিগুলো নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম হিসেবে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টায় একটি গোলটেবিল আলোচনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আরএনবি/এফএ