Dhaka Mail Logo

শিক্ষা

কী হচ্ছে ডাকসুতে!

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) সাম্প্রতিক কয়েকটি কর্মকাণ্ড ঘিরে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন, তা ভাঙচুর ও ছিঁড়ে ফেলা, অনুমোদন ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং শিক্ষকদের মূল্যায়নে পৃথক ওয়েবসাইট চালুর ঘটনায় ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। একই সঙ্গে ডাকসুর কার্যক্রম নিয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সংস্কার শেষে ডাকসুর সংগ্রহশালা চালু করা হয়। সেখানে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলীয় ছবি, ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে জিন্নাহর ছবি সংবলিত পাকিস্তানের ডন পত্রিকার প্রতিবেদন এবং তার একটি একক ছবি ছিল।

ছবি প্রদর্শনের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টার দিকে ডাকসু ভবনের সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ভাঙচুর ও ছিঁড়ে ফেলেন আবু তৈয়ব হাবিলদার নামে এক প্রবীণ শিক্ষার্থী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী বলে দাবি করেছেন। নিজের দুই সন্তানকে নিয়ে সংগ্রহশালায় যাওয়ার পর একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে তিনি প্রথমে জিন্নাহর একটি একক ছবি ভেঙে ফেলেন। পরে ফ্রেম থেকে ছবিটি বের করে ছিঁড়ে ফেলেন। এরপর আরও দুটি ছবি মেঝেতে আছড়ে ভেঙে একইভাবে ছিঁড়ে ফেলেন।

আরও পড়ুন

ডাকসুর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ও অগ্রহণযোগ্য’: ঢাবি প্রশাসন

এ সময় আবু তৈয়ব হাবিলদার বলেন, ‘যা মন চায়, তা করতে দেওয়া হবে না। কেন এই খলনায়কের ছবি ডাকসুতে থাকবে? আমরা ’৭১ ও ভাষা সংগ্রাম ভুলিনি।’

ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েমের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘সাদিক কায়েম, তুমি কি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাও?’

ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা আবুল কাসেমের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ হরতাল পালিত হয়েছিল। ওই সময় অনেক ছাত্র গ্রেফতার হন। তার দাবি, ভাষার বিরোধিতাকারী জিন্নাহর ছবি ডাকসুতে স্থান পেতে পারে না।

প্রসঙ্গত, এর আগে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে আবু তৈয়ব হাবিলদার সবচেয়ে প্রবীণ প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন এবং তিনি ১০ ভোট পান। 

Daksu2
জিন্নাহর ছবি ভাঙচুর করেন ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেওয়া সাবেক এই শিক্ষার্থী। ছবি: সংগৃহীত

এদিকে সংগ্রহশালায় ছবি প্রদর্শনের ব্যাখ্যা দিয়েছে ডাকসু কর্তৃপক্ষ। সোমবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সরাসরি বাংলা ভাষার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এ অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। জিন্নাহর সেই অবস্থান বোঝাতেই তার ছবি ও বক্তব্যের প্রেক্ষাপট সংগ্রহশালায় তুলে ধরা হয়েছে।

ফরহাদ বলেন, ছবির নিচে জিন্নাহর বক্তব্যের ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে, তার ওই অবস্থানের পরই বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। তার ভাষ্য, জিন্নাহর ছবি না রাখলে অনেকে অভিযোগ করতেন যে, তার বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থান আড়াল করা হচ্ছে এবং তাকে দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।

ছাত্রদলের সমালোচনার জবাবে ডাকসুর জিএস বলেন, জিন্নাহর ছবি সরানোর দাবি জানিয়ে ছাত্রদল মূলত তার বাংলা ভাষাবিরোধী ভূমিকা আড়াল করতে চাইছে। তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রদল হয়তো ইতিহাস জানে না, অথবা জেনেও তা লুকাতে চাইছে।

তবে ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সোমবার ছাত্রদলের দফতর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার ওই বক্তব্যের বিরুদ্ধে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ছাত্রদল বলেছে, বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের সূতিকাগার ডাকসুর সংগ্রহশালায় ভাষা ও স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত একজন নেতার ছবি প্রদর্শন ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের প্রতি অবমাননা। সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্ব শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন, ন্যায্য অধিকার আদায় ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং তারা ডাকসুকে নির্দিষ্ট দলীয় ও আদর্শিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত করছে।

মধুর ক্যান্টিনের নাম পরিবর্তন করে ‘ইশরাত মজলিস’ করার উদ্যোগ এবং সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রসঙ্গ তুলে ছাত্রদল বলেছে, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির প্রতি বর্তমান ডাকসু নেতৃত্বের অনুরাগ প্রকাশ পাচ্ছে। সংগঠনটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এক যৌথ বিবৃতিতে অবিলম্বে সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি অপসারণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শচর্চার স্থান হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুন

ডাকসুর জিএস পদ ফিরে পেলেন রাশেদ খাঁন

ছাত্রদল আরও ঘোষণা দিয়েছে, মধুর ক্যান্টিনসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ঐতিহাসিক স্মারক, চেতনা ও ঐতিহ্য বিকৃতির যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দিতে তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

এদিকে ডাকসুর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও কঠোর অবস্থান জানিয়েছে। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের উপপরিচালক ফররুখ মাহমুদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ডাকসু-সংক্রান্ত কয়েকটি কর্মকাণ্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।

প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ ও তার চেতনাকে ধারণ করে গত ৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মলচত্বরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্য এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে এ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।

Duksu3
শিক্ষক মূল্যায়নে ওয়েবসাইট চালু নিয়েও চলছে বিতর্ক। ছবি: সংগৃহীত

তবে ডাকসু কলাভবন-সংলগ্ন ডাকসু ভবনের পশ্চিম পাশে এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে যে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট বা উপাচার্যের অনুমতি ছাড়াই করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেও স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর ২৪(এ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিন্ডিকেটের ওপর ন্যস্ত। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ ও প্রবিধানের চতুর্দশ অধ্যায়ের ৪ নম্বর ধারার নোট অনুযায়ী, ছাত্র সংসদকে যেকোনো সিদ্ধান্ত উপাচার্যের নির্দেশনা সাপেক্ষে গ্রহণ করতে হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ ডাকসুর এখতিয়ারবহির্ভূত বলে দাবি করেছে প্রশাসন।

ডাকসু সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টিও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশাসন বলেছে, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

সাদিক কায়েমকে নিয়ে গুজব

শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ডাকসুর পক্ষ থেকে অনুমোদন ছাড়া পৃথক একটি ওয়েবসাইট চালুর বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রশাসনের ভাষ্য, শিক্ষক মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ছাত্র সংসদ নিজেদের উদ্যোগে পৃথক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে পারে না।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ওই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, যা আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে এবং তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত। নীতিমালাটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তাই অনুমোদিত ব্যবস্থার বাইরে পৃথক শিক্ষক মূল্যায়ন চালুর উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলেছে, ডাকসু একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হলেও এর সব কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের দ্বৈত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে কোনো সমান্তরাল কাঠামো বা প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করা হবে না। অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেবি