ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাম্প্রতিক কয়েকটি কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অনুমোদন ছাড়া স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, সংগ্রহশালায় বিতর্কিত ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন এবং শিক্ষকদের মূল্যায়নে পৃথক ওয়েবসাইট চালুর বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে প্রশাসন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের উপপরিচালক ফররুখ মাহমুদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ অবস্থান তুলে ধরা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ডাকসু-সংক্রান্ত কয়েকটি সংবাদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ ও এর চেতনাকে ধারণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মলচত্বরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্য ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে এ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অর্ডার, ১৯৭৩-এর অনুচ্ছেদ ২৪(এ) অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিন্ডিকেটের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অর্ডিন্যান্সেস অ্যান্ড রেগুলেশনস-এর চ্যাপ্টার ১৪-এর ধারা ৪-এর নোট অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ যেকোনো সিদ্ধান্ত উপাচার্যের নির্দেশনা সাপেক্ষে গ্রহণ করবে।
তবে ডাকসু ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে কলাভবন-সংলগ্ন ডাকসু ভবনের পশ্চিম পাশে এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে যে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেছে, তা সিন্ডিকেট বা উপাচার্যের অনুমতি কিংবা তাঁদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই করা হয়েছে বলে দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রশাসনের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ ডাকসুর এখতিয়ারবহির্ভূত।
ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টিও কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ছাড়া ডাকসুর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য অনুমোদন ছাড়া একটি ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, এ উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রশাসন জানায়, শিক্ষক মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ছাত্র সংসদ নিজেদের উদ্যোগে পৃথক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে পারে না। একই সঙ্গে ওয়েবসাইট চালুর মাধ্যমে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, যা আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে এবং তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত হয়েছে। নীতিমালাটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ফলে অনুমোদিত ব্যবস্থার বাইরে পৃথক শিক্ষক মূল্যায়ন চালুর উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করার শামিল।
বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের দ্বৈত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। ডাকসু একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হলেও এর সব কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে কোনো সমান্তরাল কাঠামো বা প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন আরও জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করা হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সবশেষে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডাকসুর এ ধরনের কর্মকাণ্ড অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত ও অগ্রহণযোগ্য।
এম/এআর




