সাখাওয়াত হোসাইন
১২ জুন ২০২৬, ০৭:০০ এএম
ঢাকার পূর্বাচলে হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) দ্বিতীয় ক্যাম্পাস। এই ক্যাম্পাসের আয়তন হবে ৬৬ একর। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানে থাকবে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা। এরই মধ্যে প্রকল্পটি চূড়ান্ত করতে সভা করেছেন সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও বৈঠক করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ও। যদিও পরিকল্পনাটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে ধীরে ধীরে তা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে ৫০০ থেকে ৭৫০ শয্যার একটি টিচিং হাসপাতাল থাকবে। সেখানে এআইভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রাখা হবে। প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকেরা এখানে ব্যবহারিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবেন। জরুরি ও ট্রমা-সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও থাকবে।
এ ছাড়া আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ, পিআইসিইউ, টেলিমেডিসিন ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা থাকবে পর্যাপ্ত পরিমাণে। আধুনিক রিহ্যাবিলিটেশন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের অনকোলজি (ক্যানসার) চিকিৎসাও নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ ও কার্ডিওভাসকুলার রোগের আধুনিক চিকিৎসাসেবাও পাওয়া যাবে।
গবেষণা ও উদ্ভাবন
এই ক্যাম্পাসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে গবেষণা ও উদ্ভাবন। এখানে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল পরবর্তীতে সারা দেশে প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য থাকবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ইউনিট ও বায়োব্যাংক।
আরও পড়ুন: শিগগিরই নিয়োগ হচ্ছে ৫ হাজার চিকিৎসক
গবেষণা কার্যক্রমকে আরও সমৃদ্ধ করতে স্থাপন করা হবে ওয়ান হেলথ ল্যাব এবং এনভায়রনমেন্টাল হেলথ ল্যাব। ওয়ান হেলথ ল্যাব মানবস্বাস্থ্য, প্রাণিস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত স্বাস্থ্যের সমন্বয়ে রোগ নির্ণয় ও গবেষণার কাজ করবে। অন্যদিকে এনভায়রনমেন্টাল হেলথ ল্যাব বাতাস, পানি, মাটি ও খাদ্যে দূষণ বা ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করে পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিরূপণ এবং তা থেকে মানবস্বাস্থ্য সুরক্ষার উপায় উদ্ভাবনে কাজ করবে।

এ ছাড়া গবেষণার মাধ্যমে দেশেই বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম, যেমন সার্জিক্যাল টুল, ইমপ্লান্ট বা মনিটরিং ডিভাইস তৈরির সুযোগ থাকবে। সরকার এটিকে উদ্ভাবনের একটি কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তুলতে চায়।
২৪ ঘণ্টা ক্যাম্পাসে থাকবেন চিকিৎসক ও শিক্ষক
এই ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক শিক্ষা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। চিকিৎসক ও শিক্ষকরা সব সময় ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। তাদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে। একই সুবিধা পাবেন নার্স ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরাও।
শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে আধুনিক আবাসিক হল এবং বিদেশি অতিথিদের জন্যও পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা রাখা হবে।
আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট শিক্ষা
দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের অন্যতম লক্ষ্য হবে দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি করা। এ জন্য দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। চালু থাকবে রেসিডেন্সি ও ফেলোশিপ প্রোগ্রাম।
পাশাপাশি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষা কার্যক্রমও চলবে। একই সঙ্গে স্কুল অব পাবলিক হেলথ, নার্সিং শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যবিজ্ঞান-সংশ্লিষ্ট যুগোপযোগী পাঠদান করা হবে। বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডিজিটাল হেলথ এডুকেশনের মতো আধুনিক ও বৈশ্বিক মানসম্পন্ন শিক্ষার ব্যবস্থাও থাকবে।
এআইভিত্তিক আধুনিক চিকিৎসা
আধুনিক বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। তবে বাংলাদেশে এআইভিত্তিক চিকিৎসার ব্যবহার এখনও সীমিত এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও পর্যাপ্ত নয়।
বিএমইউর দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে চিকিৎসাসেবার সর্বত্র এআই প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। চিকিৎসকদের জন্য থাকবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে জটিল রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা বৃদ্ধি, জটিল সার্জারি পরিচালনা, নতুন ওষুধ উদ্ভাবন এবং রোগীদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ সহজ হবে।

এ ছাড়া একাডেমিক শিক্ষা, ক্লিনিক্যাল সেবা, গবেষণা এবং ডিজিটাল হেলথ ইকোসিস্টেমের উন্নয়নে সমন্বিত ব্যবস্থা থাকবে। হাসপাতালে টারশিয়ারি পর্যায়ের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা এবং বিস্তৃত ক্লিনিক্যাল সেবা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিগগিরই প্রকল্পটি অনুমোদন পেতে পারে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সব কাজ চূড়ান্ত করতে সরকার কাজ করছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের নকশা উপস্থাপন এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় একাধিক সভা করেছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন যুগোপযোগী দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি হবে এবং চিকিৎসক-নার্সদের কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে দেশের মানুষ দেশেই এআইভিত্তিক আধুনিক চিকিৎসাসেবা পাবেন। এতে সরকারি মূল্যে উন্নত চিকিৎসা পাওয়া সহজ হবে এবং বিদেশমুখিতা কমবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই হাসপাতাল রোগীর সেবা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি এবং গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য একটি আদর্শ মডেল হয়ে উঠতে পারে।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রকল্পটি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। প্রাথমিক আলোচনা শেষ হয়েছে। শিগগিরই অনুমোদন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। দেশের মানুষ যাতে দেশেই উন্নত চিকিৎসা পান, সে লক্ষ্যেই প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আধুনিক চিকিৎসার অনেক সুবিধা এখনও দেশে সহজলভ্য নয়। ফলে অনেক রোগীকে বিদেশে যেতে হয়। সরকার স্বাস্থ্য খাতকে এমনভাবে সাজাতে চায়, যাতে প্রয়োজন ছাড়া কাউকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে না হয়। একই সঙ্গে দেশেই চিকিৎসকদের জন্য বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (উন্নয়ন ও গবেষণা) অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান হাওলাদার ঢাকা মেইলকে বলেন, কিছুদিন আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুপারিশ ও প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করা হয়েছে। একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবনায় অনেক নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটি এখনও বাস্তবায়ন পর্যায়ে পৌঁছেনি। এ নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে।
এএম/এআর