images

শিক্ষা

৬৫ শতাংশ কাজ শেষে থমকে গেছে ‘হাওর’ শিক্ষা প্রকল্প

আব্দুল হাকিম

২০ মার্চ ২০২৬, ০৯:১২ এএম

  • ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৪৪ কোটি ৮০ লাখ
  • বাস্তব অগ্রগতি প্রায় ৬৫ শতাংশ
  • ছাত্রাবাস নির্মাণ ব্যয় ৩৯৮ কোটি
  • সীমানা প্রাচীর ও গেটে ব্যয় ৬০ কোটি
  • ছয়তলা বহুমুখী ভবনের কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ
  • ছাত্রীনিবাসের দরজার কাঠে মানের ঘাটতি

হাওরাঞ্চলের শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া ‘হাওর এলাকার নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পটি ৬৫ শতাংশ বাস্তব অগ্রগতির পর কার্যত থমকে গেছে। প্রায় ৯৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৬৫ শতাংশে পৌঁছালেও এরপর গতি হারিয়েছে বাস্তবায়ন কার্যক্রম। পরিকল্পনা কমিশনের পরিবীক্ষণ সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় একাধিক দুর্বলতা এই স্থবিরতার জন্য দায়ী।

সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পটি নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলার ১৬টি উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বহুমুখী ভবন, ছাত্রাবাস-ছাত্রীনিবাস, শিক্ষক ডরমেটরি, সীমানা প্রাচীর, গেট এবং স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত সুবিধা নির্মাণই এই প্রকল্পের মূল কাজ।

পরিকল্পনা কমিশনের পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি ও মানগত দুর্বলতা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ সরকারি কলেজে ছয়তলা বহুমুখী ভবনের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। লিফট স্থাপন না হওয়ায় ভবনটি ব্যবহার উপযোগী করা যায়নি। একইভাবে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার বাদশাগঞ্জ পাবলিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাসে দরজার কাঠ নির্ধারিত মানের তুলনায় কম পুরুত্বের পাওয়া গেছে, যা নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে আবাসন অবকাঠামোতে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ১০০ শয্যার ছাত্রাবাস বা ছাত্রীনিবাস নির্মাণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৩৯৮ কোটি ৫৩ লাখ ৯১ হাজার টাকা। ৫০ শয্যার আবাসনের জন্য বরাদ্দ প্রায় ৭৩ কোটি ৯৬ লাখ ১৯ হাজার টাকা। এছাড়া ৬ তলা বহুমুখী ভবনের জন্য ৪৩ কোটি ৬২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা এবং ৫ তলা ভবনের জন্য প্রায় ৫৯ কোটি ৩ লাখ ৫৯ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্যান্য বহুমুখী ভবন নির্মাণে প্রায় ১১২ কোটি ৬৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা, শিক্ষক ডরমেটরির জন্য ৫ কোটি ৭৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং সীমানা প্রাচীর ও গেট নির্মাণে প্রায় ৬০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে। নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৮২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে।

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, ঠিকাদারদের বিল পরিশোধে বিলম্ব প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একইসঙ্গে দীর্ঘদিন প্রকল্প পরিচালক পদ শূন্য থাকায় কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এ ধরনের বড় প্রকল্প পরিচালনা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি।

পরিকল্পনা কমিশন আরও বলছে, বন্যা, অতিবৃষ্টি এবং দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে নির্ধারিত সময়সূচি ধরে কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং করোনা-পরবর্তী শ্রমিক সংকট, যা প্রকল্পের গতি আরও শ্লথ করেছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে নতুন করে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, বিদ্যমান বাজেটের মধ্যেই অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

মেয়াদ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নির্মাণ সাইটগুলো জেলা সদর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় নিয়মিত তদারকি করা কঠিন। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য মাটি পরীক্ষা করে নকশা প্রস্তুত করা হলেও বাস্তবায়ন পর্যায়ে ভৌগোলিক ও পরিবহনসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যার কারণে দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকাও বিলম্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

2

এদিকে প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে। পরিকল্পনা কমিশনের পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্মাণকাজ, সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিল পরিশোধে নিয়ম না মানার কারণে লাখ লাখ টাকার অনিয়ম হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্র্যান্ড অ্যান্ড রি-ব্র্যান্ডকে নির্ধারিত শর্ত ছাড়াই প্রায় দুই কোটি টাকা ফি প্রদান করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগগুলোর বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্ধিত মেয়াদে প্রকল্প শেষ করতে হলে তদারকি কাঠামো শক্তিশালী করা ছাড়া বিকল্প নেই। বিশেষ করে মোহনগঞ্জ ও ধর্মপাশার অসম্পূর্ণ নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। একইসঙ্গে নির্মাণমান নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত উপকরণের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্পের আওতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ফার্নিচার ক্রয় কার্যক্রমও চলছে। মেয়াদ বৃদ্ধির পর এই কাজগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জেলা পর্যায়ে তদারকি জোরদারের মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকাগুলোতেও কাজের মান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন সুবিধা নিশ্চিত হবে। ১০০ ও ৫০ শয্যার ছাত্রাবাস, বহুমুখী ভবন, শিক্ষক ডরমেটরি এবং সীমানা প্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশে গুণগত পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক, নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা। তবে বর্তমান ধীরগতি, মানগত দুর্বলতা, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা এবং আর্থিক অনিয়মের বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হলে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে—এমনটাই আশা সংশ্লিষ্টদের।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, হাওরাঞ্চলে শিক্ষার হার ও মান উন্নয়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়; গড়পড়তা হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে এসডিজি অর্জনের হিসাব করলেই হবে না; পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, এসব অঞ্চলের উন্নয়ন ছাড়া সামগ্রিক জাতীয় অগ্রগতি টেকসই হবে না।

এই গবেষক বলেন, হাওরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত ও গুণগত পরিবর্তন জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি, আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। একইসঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

এএইচ/জেবি