বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতা, গণহত্যাকে সমর্থন, শিক্ষার্থীদের নামে অন্যায়ভাবে মামলা ও নিয়মিত হয়রানি করা এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে মাদকের আসর বসানোসহ বেশকিছু অভিযোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আইন বিভাগের শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানকে আটক করে প্রক্টরিয়াল বডির হাতে তুলে দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) নেতারা৷
শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ১ নং গ্যালারি থেকে পালাতে গিয়ে আটক হন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুরে চবির বি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন করছিলেন হাসান মোহাম্মদ রোমান। এসময় হঠাৎ তিনি পরীক্ষার কেন্দ্র ছেড়ে পালাতে থাকেন। পালানোর সময় চাকসু প্রতিনিধিরা তাকে আটক করে প্রক্টরিয়াল বডির হাতে তুলে দেন।
এসময় চাকসুর আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফাজলে রাব্বি তাওহিদ, দফতর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান, ক্যারিয়ার ও ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক সম্পাদক মেহেদী হাসান এবং নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
চাকসুর আইন বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি তৌহিদ বলেন, তার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের গণহত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে তিনি সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থীদের ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে মামলা করেন। আইন অনুষদের এক শিক্ষার্থী জুবায়েরের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাকে জেলে পাঠান। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে তার রুমে মদ-জুয়ার আসর ও নারীদের যৌন হয়রানিও করতেন নিয়মিত।
তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষক ছাত্রলীগকে সরাসরি সহায়তা দিতেন এবং বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডে দিকনির্দেশনা দিতেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে আইন বিভাগ থেকে বয়কট করা হয়েছে। এরপর তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন। তদন্ত চলমান থাকা সত্ত্বেও ভর্তি পরীক্ষায় দায়িত্ব পেয়ে ক্যাম্পাসে আসলে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করলে তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। পালাতে গিয়ে পড়ে গেলে শিক্ষার্থীরা তাকে আটক করে।
এর আগে ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট জুলাইয়ের ‘গণহত্যা’কে সমর্থনের অভিযোগে আইন বিভাগের এই সহকারী অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর হাসান মুহাম্মদ রোমানকে অব্যাহতি প্রদান অথবা তার পদত্যাগ চেয়ে আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা ডিন বরাবর একটি অভিযোগ করেন।
এর পরদিন ২১ আগস্ট দুপুরে আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা চবি সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে পতন হওয়া ফ্যাসিস্ট সরকারের কর্মকাণ্ড এবং ২৪ এর গণহত্যাকে সমর্থন দেওয়া, ফ্যাসিস্টদের দোসর হিসেবে কাজ করা, ছাত্রদের নিজের বাসায় ডেকে মাদকের আসর বসানো, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছাত্রদের ব্যক্তিগত জীবন ও আইন বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষকদের নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা, ছাত্রদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করা, ছাত্রলীগকে মদদ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হুমকি দেওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করা, ক্লাস পরিচালনাকালীন সময়ে এবং নিজ অফিসকক্ষে ডেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শিক্ষার্থীদের জামায়াত-শিবির ট্যাগ দেওয়া, ক্লাসের মধ্যে ছাত্রদের টার্গেট করে হেয়প্রতিপন্ন করা এবং সহকারী প্রক্টর থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্যাম্পাসের চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের মদদ দিয়ে সাধারণ ছাত্রদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে শিক্ষক রোমান শুভর বিরুদ্ধে।

অভিযুক্ত শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমান শুভ বলেন, হলে দায়িত্ব পালনের সময় আমার সহকর্মীরা আমাকে হঠাৎ চলে যেতে বলেন। তাদের কথায় আমি বের হয়ে চলে আসি। পেছনে চিৎকার-চেঁচামেচি চলছিল। ২ নং গেটে আমার একজন কলিগের বাসায় আশ্রয় নিতে চেয়েছিলাম। ওখান থেকে আমাকে কয়েকজন ধরে নিয়ে আসে।
এসময় তিনি তার বিরুদ্ধে আসা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ বলা হচ্ছে, সেসবের সঙ্গে আমি জড়িত না।
প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, তিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের একজন সৈনিক ছিলেন। তখন তিনি ক্যাম্পাসে ‘প্রবলেম বয়’ নামে পরিচিত ছিলেন। দুনিয়ার সব সমস্যায় তিনি জড়িত ছিলেন। আজ ভর্তি পরীক্ষার সময় কিছু শিক্ষার্থীর উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি পালাতে চেয়েছিলেন। তখন তাকে ধরে প্রক্টর অফিসে নিয়ে আসা হয়। তার ওপর কোনো হামলা বা মব করা হয়নি। তিনি এখন প্রক্টর অফিসে রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
প্রতিনিধি/এসএস