বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০১ এএম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এ এফ রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাছলিম উদ্দীনের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত ও জোরপূর্বক আবাসিক শিক্ষার্থী উচ্ছেদের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় আসন বরাদ্দ নীতিমালা অনুযায়ী ছাত্রত্ব বহাল থাকা সত্ত্বেও মাস্টার্স পরীক্ষার্থীদের হল ত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
বিশেষ করে মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা ও ভাইভা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি কার্যত হল ত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মতে, এ সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং মানবিক দিক থেকেও চরম অমানবিক।
একাধিক নোটিশ, একটাই নির্দেশ, হল ছাড়তে হবে
গত ২৯ নভেম্বর এ এফ রহমান হলে টাঙানো প্রভোস্ট স্বাক্ষরিত এক লিখিত বিজ্ঞপ্তিতে মাস্টার্সের পরীক্ষা শেষ করা শিক্ষার্থীদের ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যারা হল ছাড়েননি, তাদেরকে গত ২৯ ডিসেম্বর আবারও নোটিশ দিয়ে ১ জানুয়ারির মধ্যে হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়।
নোটিশে বলা হয়, ২৭.১১.২০২৫ তারিখের বিজ্ঞপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে এ. এফ. রহমান হলের সকল আবাসিক ছাত্রের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, ইতোমধ্যে যে সকল শিক্ষার্থী মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে, গত ০৪.১২.২০২৫ তারিখে তাদের নামে বরাদ্দ করা কক্ষ খালি করার শেষ সময় থাকা সত্ত্বেও যারা কক্ষ খালি করেনি, তাদেরকে আগামী ০১.০১.২০২৬ তারিখের মধ্যে কক্ষ খালি করার নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে। অন্যথায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বারবার এ ধরনের নোটিশে হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। যারা রেজাল্ট প্রকাশ পর্যন্ত হলে থাকতে চান, তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক। এমনকি হল প্রশাসনের এই আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে অনেক শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে হল অ্যালামনাই হিসেবে যুক্ত না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে হল ছাড়ছেন বলেও জানা গেছে।
ছাত্রত্ব বহাল, তবুও উচ্ছেদ, কোন আইনে?
হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্নাতকোত্তর পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বহাল থাকে। এমনকি থিসিস, মানোন্নয়ন পরীক্ষা কিংবা ফেল থাকলেও ছাত্রত্ব বাতিল হয় না। সে ক্ষেত্রে ছাত্রত্ব থাকা অবস্থায় জোরপূর্বক হল ছাড়তে বাধ্য করা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত।
হলের একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বললে তারা বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, প্রভোস্ট স্যার ইতোমধ্যেই অনেককে হল ছাড়তে বাধ্য করেছেন। বাকিদেরও এক সপ্তাহের মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। অথচ, রেজাল্ট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ছাত্রত্ব বৈধভাবেই থাকে।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই মাস্টার্স শিক্ষার্থীদের কক্ষে অন্য কাউকে আসন বরাদ্দের অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হওয়া শিক্ষার্থীদের তাদের কক্ষ থেকে বের করে দিয়ে সে কক্ষগুলোতে অন্যদের উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই মাস্টার্সের এক শিক্ষার্থীর কক্ষে অন্য শিক্ষার্থীকে উঠিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের ওই শিক্ষার্থী বলেন, আমাদেরকে অনেকটা ফোর্স করেই হল ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। পরীক্ষার পর আর একদিনও হলে থাকা যাবে না, এই কথা বলে রুম অলরেডি আরেকজনকে বরাদ্দ দিয়ে দিয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে, তুমি ভাইভা দিয়েই রুম ছাড়বা।
মানবিক সংকট: রেজাল্ট, থিসিস, ভবিষ্যৎ সবই অনিশ্চিত
বাধ্য হয়ে হল ছেড়ে দেওয়া রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আপেল মাহমুদ বলেন, প্রভোস্ট স্যার অন্যের মতামতকে গ্রহণ করতে একেবারেই নারাজ, সেটা যত যুক্তিসিদ্ধই হোক। উনি যেটা মনে করেন সেটাই করেন। এতে কার মন্দ হলো, কার ভালো হল এসবে উনার যায়-আসে না। আমাদের মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে আমাদেরকে হল ত্যাগ করার নোটিশ পেতে হয়েছে, এটা যে কতটা প্যাথেটিক, তা শুধু আমরাই বুঝেছি। আমাদেরকে একপ্রকার বাধ্য হয়ে হল ত্যাগ করতে হয়েছে ৷
আরেক শিক্ষার্থী রাকিব হাসান বলেন, রেজাল্ট প্রকাশিত না হলে একজন শিক্ষার্থী কেনো হল ছাড়বে। পরীক্ষার পর অনেকের থিসিস থাকে, কারো মানোন্নয়ন পরীক্ষা থাকতে পারে, কেউ ফেলও করতে পারে। সে যদি পরীক্ষার পরই সিটটা ছেড়ে দেয়। তাহলে পরবর্তীতে সে আর সিটটা পাবে? তখন সে কই থাকবে? কই থেকে পরীক্ষা দিবে?
মাস্টার্সের আরেক আবাসিক শিক্ষার্থী বায়েজিদ হাসান অভি বলেন, আসলে লেখাপড়া শেষ হলে অযথা কেউই ক্যাম্পাসে থাকে না। কিন্তু রেজাল্ট পাওয়া, সবকিছু গোছানো, সার্টিফিকেট তোলা এসবের কারণে একটু সময় তো লাগেই। তাছাড়া, আমার নিজেরই থিসিস আছে। তিনমাস লাগবে। এমতাবস্থায় রুম ছাড়ার নির্দেশ, কিছুই বলার নাই।
ছাত্র সংসদের আপত্তি, উপেক্ষিত মতামত
এ এফ রহমান হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মো. তামিম চৌধুরী বলেন, প্রভোস্ট স্যার যখন নোটিশটা দিয়েছেন, তখনই স্যারের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। স্যার বলেছেন, আইন এরকমই। কিন্তু আমরা আইনটা দেখিনি।
হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) কাজী শাহরিয়ার বলেন, ছাত্র সংসদকে না জানিয়ে প্রভোস্ট স্যার এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। একজন শিক্ষার্থীর রেজাল্ট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তার ছাত্রত্ব বহাল থাকে। যতক্ষণ ছাত্রত্ব থাকবে, ততক্ষণ সে হলের বৈধ আবাসিক শিক্ষার্থী। তাকে বের করে দেওয়ার সুযোগ নেই। পরে কথা বললে প্রভোস্ট স্যার বলেছেন, হলের আইন নাকি এমনই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন তো আলাদা।
প্রভোস্টের বক্তব্য: ‘ভাইভার সাথে সাথেই সিট অটো বাতিল’
ছাত্রত্ব বহাল থাকা সত্ত্বেও মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কেনো হলত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে এ এফ রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাছলিম উদ্দীন বলেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী নোটিশ দিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম হচ্ছে, যাদের মাস্টার্সের ভাইভা শেষ হয়ে গেছে, তাদের সিট অটো বাতিল। এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম।
মাস্টার্সের রেজাল্ট প্রকাশের আগে আসন বাতিল হয়, আসন বরাদ্দ নীতিমালায় এমন কোনো বিধান নেই, এ কথা জানালে তিনি প্রতিবেদককে নীতিমালা আবার পড়তে বলেন। তিনি বলেন, আমার কাছেও নীতিমালা আছে। মাস্টার্সের ভাইভা হলে সিট অটো বাতিল। এসময় তার কাছে থাকা নীতিমালার কপিটি চাইলে তিনি কোনো নীতিমালা না দেখিয়ে প্রতিবেদককে পাশ কাটিয়ে চলে যান।
নীতিমালা কী বলছে? প্রভোস্টের আইন কি নিজস্ব?
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃত নীতিমালার সঙ্গে এ এফ রহমান হল প্রভোস্টের সিদ্ধান্ত সরাসরি সাংঘর্ষিক। কেননা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলসমূহ এবং হোস্টেলে শিক্ষার্থীদেরকে কেন্দ্রীয়ভাবে আসন বরাদ্দ দেওয়ার নীতিমালা’য় মাস্টার্স পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের আগে হল ছাড়ার কোনো বিধানের উল্লেখ নেই। বরং মাস্টার্সের রেজাল্ট প্রকাশের পর শিক্ষার্থীর আসন বাতিল হবে। নীতিমালার ২০ (ঙ) নম্বর ধারায় উল্লেখ আছে, ‘মাস্টার্স এর রেজাল্ট/এম.ফিল ও পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসন বরাদ্দ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।’
এছাড়াও একই নীতিমালার ২৪ নম্বর ধারায় বলা হয়, ‘মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার পর/এমফিল ও পিএইচ.ডি এর ফাইনাল কোর্স ওয়ার্ক এর পর বরাদ্দপ্রাপ্ত আসন খালি করে দেওয়ার জন্য হল কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে তাগাদা দিতে পারবে।’ অর্থাৎ ধারা দু’টি প্রমাণ করে যে, মাস্টার্স পরীক্ষার পর আবাসিক শিক্ষার্থীকে হল ছাড়ার জন্য তাগাদা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও জোরপূর্বক উচ্ছেদের কোনো বিধান নেই। বিপরীতে হলের প্রভোস্ট ভাইভার সঙ্গে সঙ্গেই হল ছাড়ার যে আইনের কথা বলছেন, সেটি একান্তই তার নিজস্ব।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান
শিক্ষার্থীদেরকে জোরপূর্বক হলত্যাগের বিষয়টি কীভাবে দেখছেন জিজ্ঞেস করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, এক শিক্ষার্থী চার-পাঁচ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। হল ছাড়ার জন্য তার ন্যূনতম একটা প্রস্তুতির বিষয় আছে। তাকে যেনো ভাইভা পরীক্ষা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হলত্যাগে বাধ্য করা না হয়। তাছাড়া, প্রভোস্ট যেনো আসন বরাদ্দ নীতিমালা ফলো করেন। আমরা কোনভাবেই চাই না, একজন শিক্ষার্থী খারাপ অভিজ্ঞতা নিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়ুক। তাদের সঙ্গে যেনো সর্বোচ্চ সহনশীলতার আচরণ করা হয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও কেন্দ্রীয় আসন বরাদ্দ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, মাস্টার্সের রেজাল্ট প্রকাশের আগে কাউকে জোরপূর্বক হলত্যাগে বাধ্য করার সুযোগ নেই। তবে, তাকে হল ছাড়ার জন্য তাগাদা দিতে পারবেন প্রভোস্ট। থিসিস, মানোন্নয়ন বা অন্য কোনো কারণে সে থাকতে চাইলে তাকে থাকতে দিতে হবে।
প্রতিনিধি/টিবি