Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

এআই ও অবকাঠামো খাতে কোরিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অবকাঠামো, উন্নত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ খাতে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। প্রচলিত উন্নয়ন সহায়তার বাইরে গিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও বিস্তৃত করতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্প অংশীদারত্ব ও বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সফরের দ্বিতীয় কর্মদিবসে দেশটির সরকারি কর্মকর্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল এসব বৈঠকে অংশ নেয়।

আলোচনায় বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি, শিল্প অংশীদারত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তুলে ধরা হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (কেক্সিম) চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোয়াং কিয়নের সঙ্গে বৈঠকে ২০২৩ থেকে ২০২৭ মেয়াদের ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল (ইডিসিএফ) কাঠামো পর্যালোচনা করা হয়। এ সময় অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ঢাকা এমআরটি লাইন-৫-এর দক্ষিণ অংশ, মতলব উত্তর-গজারিয়া সেতু এবং ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

আরও পড়ুন:

‘বাংলাদেশ-কোরিয়া সিইপিএ অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে’

কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ: রফতানিতে নতুন সম্ভাবনা দেখছে এফবিসিসিআই

পোশাকের বাইরে নতুন শিল্প খাতে দ. কোরিয়ার বিনিয়োগ চায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হুন্দাই গ্লোভিস ও হানওয়া ওশান

বড় পরিসরে ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী স্যামসাং

কেক্সিম জানায়, বর্তমানে ইডিসিএফের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কোরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্প প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা হবে। বাংলাদেশ অবশিষ্ট অর্থ ব্যবহারে একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরির প্রস্তাব দেয়। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, স্মার্ট অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর মতো নতুন ক্ষেত্রেও সহযোগিতার আগ্রহ জানায়।

দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থ ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় ভাইস মিনিস্টার চ্যাং হুর সঙ্গে পৃথক বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কৌশলগত পর্যায়ে নেওয়ার আহ্বান জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। এ সময় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নত উৎপাদনশিল্প, জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সহযোগিতার সুযোগ তুলে ধরা হয়।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইজিএনডি) উদ্যোগের মহাপরিকল্পনা তৈরিতে দক্ষিণ কোরিয়ার কারিগরি সহায়তার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ এ উদ্যোগের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে কোরিয়ার আরও বিস্তৃত অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়। কোরীয় পক্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, বিকল্প অর্থায়ন এবং ভবিষ্যৎ ইডিসিএফ সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে।

বাংলাদেশে অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক খাতে কোরীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। কোরিয়া ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনের (কেআইসি) সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হয়।

এ সময় ১ থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য আকারের বাংলাদেশ সার্বভৌম তহবিল গঠনের প্রস্তাব আলোচনায় আসে। পাশাপাশি কোরিয়া এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের অর্থায়নের সঙ্গে কেআইসির ইকুইটি বিনিয়োগ যুক্ত করার সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করা হয়। এক্ষেত্রে কোরীয় তহবিল ব্যবস্থাপকদের যুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় ছিল।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এলজি এআই রিসার্চের সঙ্গে বৈঠকে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের সংস্কৃতির উপযোগী বৃহৎ ভাষা মডেল তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদনশিল্প ও সরকারি সেবায় এআই ব্যবহারের সম্ভাবনাও তুলে ধরে বাংলাদেশ।

পাশাপাশি আঞ্চলিক এআই ও ডেটা সেন্টার কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়। ফিউরিওসাএআইয়ের সঙ্গে বৈঠকে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী এআই প্রযুক্তির পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়। কেক্সিমও এআই প্রযুক্তি সংযুক্ত অবকাঠামো প্রকল্পের সম্ভাবনা যাচাইয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে।

কোরীয় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ, উন্নত উৎপাদনশিল্প, নগর উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল।

স্যামসাং সিঅ্যান্ডটির সঙ্গে বৈঠকে অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নগর উন্নয়ন, পর্যটন ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে ছাদ ও বড় পরিসরের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং নির্বাচিত নগর উন্নয়ন উদ্যোগও ছিল। প্রতিষ্ঠানটি শুধু নির্মাণকাজের ঠিকাদারি নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগেও আগ্রহ প্রকাশ করে। অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলো নিয়ে কারিগরি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়।

এ ছাড়া ইয়ংওনের আয়োজনে কোরীয় বিনিয়োগবিষয়ক এক ব্যবসায়িক বৈঠকে বাংলাদেশের হালকা প্রকৌশল ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। এ খাতে যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কোরিয়ার সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।

সামগ্রিক আলোচনায় উন্নয়ন সহযোগিতার প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও যৌথ অর্থনৈতিক সুযোগের ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে উভয় পক্ষ। এসব আলোচনা বাস্তব প্রকল্প ও বিনিয়োগ অংশীদারত্বে রূপ দিতে পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া।

এএইচ/এএম