মহিউদ্দিন রাব্বানি
৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এর মধ্যেই সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৪ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে উৎপাদন ও পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো। সরকারের সম্মতি না মিললেও খুচরা বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপের কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে, সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগও রয়েছে। ফলে একদিকে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব, অন্যদিকে বাজারে বাড়তি দামের চাপ, এই দুইয়ের মধ্যে পড়ে নতুন করে ভোগান্তির আশঙ্কায় রয়েছেন ভোক্তারা।
বর্তমানে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২০৪ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৮৫ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব অনুযায়ী, বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২১৮ টাকা, পাঁচ লিটারের বোতল ১ হাজার ৭০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৯৯ টাকা করতে চায় তারা। অর্থাৎ এক লিটার বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ১৪ টাকা করে। পাঁচ লিটারের বোতলে বাড়তি দাম চাওয়া হয়েছে ৭০ টাকা।
গত ১৩ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের কাছে এ বিষয়ে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। চিঠিতে ২৫ অক্টোবর থেকে নতুন দাম কার্যকরের কথা জানানো হলেও সরকার প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি।
তবে এরই মধ্যে খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ২০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সে হিসাবে নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। ফলে নতুন মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত না এলেও বাজারে তার চাপ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলোর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান দামে তেল বাজারজাত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সংগঠনটির নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম মোল্লা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্যারিফ কমিশনে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেন, গত ছয় মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। প্রতি টনের দাম ১ হাজার ৩০০ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩২৫ ডলারে উঠেছে।
কোম্পানিগুলোর হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান দর বিবেচনায় প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের খরচ প্রায় ২৩৩ টাকা দাঁড়ায়। এর সঙ্গে দেশের জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় যুক্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দাম সমন্বয় না হলে লোকসান দিয়ে সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হবে বলে দাবি তাদের।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, গত ২ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের সময় দ্রুত আবার দাম পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন দাম না বাড়ায় কোম্পানিগুলো আর্থিক চাপে রয়েছে। দ্রুত মূল্য সমন্বয় না হলে সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে, যার প্রভাব আসন্ন রমজানে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে কোম্পানিগুলোর ব্যয় বৃদ্ধির দাবি থাকলেও খুচরা বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তেল বিক্রির অভিযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে। মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব ও বাজারে বিদ্যমান দামের মধ্যে এই ব্যবধান ভোক্তাদের উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে।
সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত ১১ জুলাই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা বাড়িয়ে ২০৯ টাকা, পাঁচ লিটারের বোতল ১ হাজার ১৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৮ টাকা বাড়িয়ে ১৮৮ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিল কোম্পানিগুলোর সংগঠন। একই সঙ্গে খোলা পাম তেলের দাম ১৩ টাকা বাড়িয়ে ১৮৩ টাকা করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ সেপ্টেম্বর সরকার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণ করা হয় ১৮৫ টাকা। সেই সমন্বয়ের দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আবারও দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করেছে কোম্পানিগুলো।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের একটি সয়াবিন তেলের ব্র্যান্ডের ডিলার জানিয়েছেন, দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের পাশাপাশি ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। কোম্পানি থেকে পর্যাপ্ত তেল না পেলে ডিলারদের পক্ষে খুচরা বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তার দাবি, আগেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে রমজান সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। গত বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের আগে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সাংবাদিকদের জানান, এই মুহূর্তে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।
মন্ত্রী বলেন, আসন্ন রমজানে ভোজ্যতেল, ছোলা, ডাল ও চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব পণ্যের পর্যাপ্ত পরিমাণ আমদানির পাইপলাইনে রয়েছে। রমজান কিংবা এর আগে-পরে বাজারে পণ্যের ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
সরকারের এই আশ্বাসের মধ্যেও সয়াবিন তেলের দাম ও সরবরাহ নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রমজানের আগে চাহিদা বাড়ার সময় সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের সংসার খরচে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সয়াবিন তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে শুধু মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানই যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের প্রকৃত দর, আমদানি ব্যয়, শুল্ক, পরিশোধন খরচ, পরিবহন ব্যয়, মজুত এবং বাজারে সরবরাহের তথ্য যাচাই করাও জরুরি। একই সঙ্গে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ভোক্তারা বলেন, কোম্পানিগুলো সত্যিই ব্যয় বৃদ্ধির কারণে লোকসানে থাকলে সেই হিসাব স্বচ্ছভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। আবার দাম বাড়ানোর প্রস্তাবকে সামনে রেখে সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হলে তার বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
রমজানের আগে সয়াবিন তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই শুধু দাম ১৪ টাকা বাড়বে কি না, তা নয়। বরং নির্ধারিত দামে ভোক্তারা নিয়মিত তেল পাবেন কি না, সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকবে কি না এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপের যৌক্তিকতা কতটা স্বচ্ছভাবে যাচাই করা হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে সয়াবিন তেল নিয়ে আমদানিকারক ও পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কারসাজির যেন শেষ নেই বলে মন্তব্য করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, রমজানকে সামনে রেখে তারা আবারও দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। চলতি বছর ইতোমধ্যে দুই দফা দাম বাড়ানো হয়েছে। রমজানের আগেই দাম বাড়াতে পারলে পুরো রমজান মাসে এ নিয়ে নতুন করে চাপ তৈরি হবে না, সেই সুযোগ কাজে লাগাতেই ব্যবসায়ীরা আগেভাগে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।
নাজের হোসাইন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, যখনই আমদানিকারকরা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেন, তখনই বাজারে সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। এ নিয়ে হইচই শুরু হলে একপর্যায়ে সরকার তাদের প্রস্তাব মেনে নেয়। গুটিকয়েক আমদানিকারকের হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকায় বারবার এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে প্রতিযোগিতা কমিশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। সয়াবিন তেল, চিনি ও গমের মতো পণ্যে আমদানিকারকের সংখ্যা কম হওয়ায় তারা নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছেন। সয়াবিন তেলের দাম বাড়তে থাকায় এবং রান্নার কাজে এর ব্যবহার ও চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষকে বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
ক্যাবের এই নেতা বলেন, আমদানিকারকরা যে দামে পণ্য আমদানি করছেন, সেই মূল্য ও সংশ্লিষ্ট সব খরচ নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শুধু আমদানিকারক ও সরকারের ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের প্রতিনিধিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ভোক্তা ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদেরও যুক্ত করা উচিত। এতে আমদানিকারকরা প্রকৃত খরচের তথ্য দিচ্ছেন, নাকি নিজেদের স্বার্থে সরকারকে বিভ্রান্ত করছেন, তা যাচাই করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, রমজানে সয়াবিন তেলের চাহিদা বাড়ে। ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে আগেভাগেই দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। একবার দাম বাড়ানোর অনুমোদন পেয়ে গেলে তারা বিপুল পরিমাণ বাড়তি মুনাফা করার সুযোগ পান। তাই ব্যবসায়ীদের নানা কৌশল ও আশ্বাসে প্রভাবিত না হয়ে দেশের ১৮ কোটি মানুষের ভোক্তা অধিকার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় বা পোশাকের আড়ালে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে সরকারকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। এবারও এমন চেষ্টা হতে পারে। তাই সরকারকে সতর্ক থেকে বাজারে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থের চেয়ে সাধারণ ভোক্তার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এমআর/জেবি