আব্দুল হাকিম
২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং বৃষ্টির পানি মাটির নিচে পর্যাপ্ত পরিমাণে জমা না হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়ায় খাবার পানি সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে একদিকে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা কমছে, অন্যদিকে কৃষিকাজ ও দৈনন্দিন ব্যবহারের পানির চাহিদা পূরণেও চাপ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, অপর্যাপ্ত পুনর্ভরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-এর প্রতিবেদনে সুপেয় পানির প্রাপ্যতার বিবেচনায় দেশের ছয়টি অঞ্চলকে সংকটপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলের অবস্থান দ্বিতীয়। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত পুনর্ভরণ না হওয়ায় এ অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট বাড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পানির চাহিদা বাড়লেও সেই অনুপাতে নিরাপদ পানির উৎস ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণে ১ হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তাব করেছে সরকার। স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ১ হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব রয়েছে। এর আওতায় রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলার ১২৩টি উপজেলার মানুষের জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় রয়েছে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ এ সুবিধার বাইরে রয়েছে। স্যানিটেশন সুবিধার ঘাটতি পূরণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নত ল্যাট্রিন স্থাপন এবং জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য শৌচাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বিভিন্ন ধরনের পানির উৎস স্থাপন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় দরিদ্র মানুষের জন্য ৫৯ হাজার ৭৭৮টি উন্নত ল্যাট্রিন স্থাপন করা হবে। এছাড়া ৪ হাজার ৩৯৪টি কমিউনিটিভিত্তিক পানি সরবরাহ ইউনিট, ২২ হাজার ১৭৬টি অগভীর নলকূপ এবং সাবমারসিবল পাম্প ও জলাধারসহ ১ হাজার ৩৯৯টি অগভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ৪ হাজার ৮২৯টি গভীর নলকূপ এবং সাবমারসিবল পাম্প ও জলাধারসহ ১ হাজার ১১৩টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় আরও ১ হাজার ৬৮টি রিংওয়েল, ১ হাজার ৭৯৭টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং পুকুর পুনঃখননের মাধ্যমে ১৬টি পুকুরভিত্তিক বালু পরিস্রাবণ ব্যবস্থা নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য ১২৫টি শৌচাগার নির্মাণ করা হবে। এসব অবকাঠামোর মাধ্যমে নিরাপদ পানির উৎস বাড়ানো, স্যানিটেশন সুবিধার ঘাটতি কমানো এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির সংকট নিরসনে শুধু নতুন নলকূপ স্থাপন যথেষ্ট হবে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার কারণে কোনো কোনো স্থানে গভীর নলকূপ থেকেও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে নতুন পানির উৎস স্থাপনের পাশাপাশি পানির উৎসের স্থায়িত্ব, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং বিকল্প উৎস ব্যবহারের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানির চাহিদা কীভাবে পূরণ হবে এবং স্থাপিত অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদে সচল থাকবে কি না, তার ওপর প্রকল্পের কার্যকারিতা নির্ভর করবে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের আওতায় প্রকল্পটি নিয়ে গত ২৬ জানুয়ারি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আধুনিক ও নিরাপদ জনপদ গড়ে তোলার বিষয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে প্রকল্পটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। আগামী ২৫ অক্টোবর একনেক সভায় অনুমোদন পেলে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প পানির উৎস তৈরি করা জরুরি। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে পানির সংকট আরও ভয়াবহ হতে পারে। ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পানির উৎসগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলায় উদ্যোগ নিতে হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট মোকাবিলায় দ্রুত ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প উৎস তৈরি করতে হবে। এ জন্য খাঁড়ি ও পুকুর খনন-পুনঃখনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বরেন্দ্র অঞ্চল উঁচু হওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচের দিকে চলে যায়। তাই খাঁড়িতে আড়াআড়ি বাঁধ বা ক্রসডেম নির্মাণ করে পানি ধরে রাখতে হবে।
তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে আমন ধান চাষের সময়ও এ অঞ্চলে খরা দেখা দেয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যতটা সম্ভব নদীর পানি ব্যবহার করতে হবে। বোরো ধান চাষের শুরুতে পুকুর ও খাঁড়ির পানি কাজে লাগিয়ে পরে প্রয়োজন অনুযায়ী ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে হবে। কোনোভাবেই নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা যাবে না।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বৃষ্টির পানি পরিশোধন করে মাটির নিচে প্রবেশ করানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে ভূ-উপরিস্থ পানির সব ধরনের উৎস কাজে লাগাতে হবে। পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি, যাতে ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ করা যায়।
এএইচ/এএইচ