মহিউদ্দিন রাব্বানি
১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে নিরাপত্তাঝুঁকি, বিমান চলাচলে বিঘ্ন এবং কর্মীদের যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় চাপের মুখে পড়েছেন প্রবাসী শ্রমিক, নিয়োগপ্রত্যাশী এবং তাদের পরিবার। ফ্লাইট বাতিলে কর্মস্থলে ফিরতে না পারা কর্মীদের চাকরি ও ভিসার মেয়াদ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। অন্যদিকে নতুন কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরব থেকে প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের শ্রমবাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশটিতে অবস্থান করছেন প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা দেশের মোট প্রবাসী আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেও দেশটি থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ এসেছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের উদ্দেশে গেছেন ২ লাখ ১৮ হাজার ৫০৮ জন বাংলাদেশি। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই দেশটিতে গেছেন ৩২ হাজার ৯১৫ জন কর্মী। ফলে দেশটির শ্রমবাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মীদের আয়ও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এরই মধ্যে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের প্রভাবে ঢাকা থেকে সৌদিগামী ও দেশটির সঙ্গে সংযুক্ত রুটের ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সর্বশেষ (১৬ অক্টোবর) তথ্য অনুযায়ী, ১০৭টি সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইটের চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৬ হাজার ৬২০ জন যাত্রী।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা-রিয়াদ ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। ঢাকা-দাম্মাম ফ্লাইট আপাতত বন্ধ থাকলেও তা চালুর কথা চিন্তা করছে বিমান। বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসও ঢাকা-রিয়াদ রুটের ফ্লাইট ২১ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করেছে। বিকল্প হিসেবে জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দর ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে অতিরিক্ত যাতায়াত ব্যয় ও টিকিটের অস্বাভাবিক দাম অনেক কর্মীকে আর্থিকভাবে চাপে ফেলেছে।
ফ্লাইট বাতিলের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীদের ওপর। নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে চাকরি হারানো, নিয়োগকর্তার অসন্তোষ, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া এবং আবাসন ও খাবারের বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। প্রথমবার বিদেশে যেতে আগ্রহী অনেক কর্মীর জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ, বিদেশে চাকরি নিশ্চিত করতে তাদের অনেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন, কেউ কেউ ঋণও নিয়েছেন।
সৌদি প্রবাসী হেলাল উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্য নানা সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দিন দিন সংকট মনে হয় আরও বাড়বে। বিমানবন্দরে হামলা, ফ্লাইট বন্ধসহ নানা জটিলতায় প্রবাসীদের মধ্যে একজনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকে ছুটিতে কিন্তু সময় মতো ফিরতে পারছেন না। এতে হয়তো অনেকেরই চাকরি চলে যাবে। আমরা যারা প্রবাসে আছি তারা নানা সংখ্যার মধ্যে দিনাতিপাত করছি। কারণ এখানে সংবাদ দেখা দিলে খরচ কমানোর অজুহাতেই কর্মচারী সংখ্যা রয়েছে।
রাজশাহীর পুঠিয়ার রিয়াদপ্রবাসী আব্দুর রহমান ছুটি শেষে কাজে ফেরার জন্য আগেই টিকিট কেটেছিলেন। নির্ধারিত দিনে বিমানবন্দরে পৌঁছে ফ্লাইট বাতিলের খবর পান। এখন কবে ফিরতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি। আবদুর রহমানই নয় তার মতো অনেক পড়েছেন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে ক্ষতি শুধু কয়েক দিনের আয় হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কর্মস্থলে যোগ দিতে বিলম্ব হলে ঋণের কিস্তি, পরিবারের ভরণপোষণ এবং চাকরি ধরে রাখার চাপ একসঙ্গে বাড়তে পারে। নতুন কর্মীদের ক্ষেত্রে চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেই বিনিয়োগ করা অর্থ হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যেতে পারে এবং একপর্যায়ে প্রবাসী শ্রমিকদের দেশে ফিরে আসতে হতে পারে। তাঁর মতে, এ মুহূর্তে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
অন্যদিকে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের পরিচালক শরিফুল হাসান মনে করেন, সৌদি আরবের শ্রমবাজারে দীর্ঘস্থায়ী সংকট দেখা দিলে প্রবাসী আয়েও সমস্যা তৈরি হতে পারে। যারা দেশটিতে যেতে পারছেন না, দেশে আটকে পড়েছেন কিংবা সেখানে কর্মরত রয়েছেন, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে সংকটের মুখে পড়েছেন।
তবে এখন পর্যন্ত প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত নয়। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং কর্মীদের যাতায়াত ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৩৫ শতাংশ সৌদি আরব থেকে আসায় দেশটির সঙ্গে যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন অর্থনীতিতে আরও চাপ তৈরি করতে পারে।
সৌদি আরবের শ্রমবাজারে অস্থিরতা বাংলাদেশের অভিবাসননীতির দীর্ঘদিনের একটি দুর্বলতাও সামনে এনেছে। বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা ও প্রবাসী আয়ের পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শ্রমিকদের নিরাপত্তা, চুক্তির নিশ্চয়তা, বেতন এবং আইনি সুরক্ষার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক ড. সেলিম রেজা তার এক বিশ্লেষণে বলেছেন, সৌদি আরবের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। তবে দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তর ও শ্রমনীতির পরিবর্তনে নিয়োগের ধরন বদলাতে পারে। তাই সৌদি আরবের সুযোগ ধরে রাখার পাশাপাশি একটি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো জরুরি।
তার মতে, ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য ভাষাশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বীকৃত সনদ এবং নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি কাজ, পর্যটন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
ড. সেলিম রেজার বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় শুধু কর্মী নিয়োগ বাড়ানো নয়, বকেয়া বেতন আদায়, চুক্তি বাস্তবায়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আইনি সহায়তা ও সংকটে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করাও জরুরি। অভিবাসনের সাফল্য শুধু কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন, তা দিয়ে নয়; তাদের অধিকার ও মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত হলো, তা দিয়েও বিচার করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের সহায়তা, দেশে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসন এবং বিকল্প শ্রমবাজার তৈরিতে সরকার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, ফ্লাইট বাতিলের কারণে আটকেপড়া কর্মীদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কাতারসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ভিসা বা কোম্পানির মেয়াদসংক্রান্ত জটিলতায় পড়া কর্মীদের কর্মস্থলে ফেরানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিতে আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা এবং নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশ ও বাংলাদেশ দূতাবাস সহযোগিতা করছে। যেসব কর্মীর ভিসার মেয়াদ নিয়ে জটিলতা রয়েছে, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।
নুর জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের অগ্রাধিকার দিয়ে প্রায় ১০ হাজার কর্মীকে বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নুরুল হক নুরের ভাষ্য, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রমে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধানেও সরকার কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি, দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, ফ্লাইট বাতিলের কারণে আটকেপড়া কর্মীদের তালিকা তৈরি করে তাদের ভিসা, চাকরি ও আর্থিক ক্ষতির বিষয়ে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কর্মীদের চাকরির বৈধতা, বেতন, ক্ষতিপূরণ ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা আদায়ে উদ্যোগী হতে হবে।
একই সঙ্গে তারা মনে করেন, বিকল্প শ্রমবাজারে প্রবেশ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষাশিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। দেশে ফিরে আসা কর্মীদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সৌদি আরবের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। তবে একক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকটকে আরও গভীর করতে পারে। তাই প্রবাসী আয় ও কর্মসংস্থান সুরক্ষায় এখনই প্রয়োজন কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ, শ্রমিকবান্ধব নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন পরিকল্পনা।
অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর জানান, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়মিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির তথ্য সংগ্রহ করা উচিত। কোন এলাকায় ঝুঁকি বাড়ছে, কোথায় বাংলাদেশি কর্মীদের অবস্থান বেশি এবং তাদের কর্মস্থল ও আবাসন কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তা চিহ্নিত করে নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। এসব তথ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আদান-প্রদানের পাশাপাশি সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও সমন্বয় করা দরকার।
এমআর/জেবি