Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

নতুন বিদেশি পুঁজি আসছে না, পুনর্বিনিয়োগেই বাড়ছে এফডিআই

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম

বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) নতুন মূলধনের প্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নতুন বিদেশি ইক্যুইটি বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। তবে পুরোনো বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের কারণে বছরওয়ারি হিসাবে মোট নিট এফডিআই বেড়েছে ১২ শতাংশ। অন্যদিকে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে মোট নিট এফডিআই কমেছে ২২ শতাংশ।

রোববার (১১ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত এফডিআই-সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। ২০২৫ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে নতুন বিদেশি মূলধনের প্রবাহ কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ।

তবে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ, পুনর্বিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ এবং আন্তপ্রতিষ্ঠান ঋণ—এই তিন উপাদান মিলিয়ে দ্বিতীয় প্রান্তিকে মোট নিট এফডিআই দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। ফলে বছরওয়ারি হিসাবে মোট নিট এফডিআই বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে তা ২২ শতাংশ কমেছে।

বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসা থেকে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ বাংলাদেশে রেখে নতুন করে বিনিয়োগ করলে তাকে পুনর্বিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ বলা হয়। এ ধরনের বিনিয়োগ সামগ্রিক এফডিআইয়ের পরিমাণ বাড়ালেও নতুন বিদেশি উদ্যোক্তাদের আগমন বা নতুন প্রকল্পে মূলধন বিনিয়োগের চিত্র সরাসরি তুলে ধরে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে পুনর্বিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ বেড়ে ২৬ কোটি ৯১ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার। অর্থাৎ মোট এফডিআইয়ের বড় অংশ এসেছে আগে থেকে ব্যবসা পরিচালনা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে।

আলোচ্য প্রান্তিকে পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা বাবদ মোট অর্থপ্রবাহ ছিল ৬৬ কোটি ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার। বিপরীতে এ খাতে অর্থের বহিঃপ্রবাহ ছিল ৪০ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ফলে পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা থেকে নিট অর্থপ্রবাহ দাঁড়ায় ২৬ কোটি ৯ লাখ ডলারের কিছু বেশি।

অন্যদিকে, আন্তপ্রতিষ্ঠান ঋণের নিট প্রবাহেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এ খাতে নিট প্রবাহ ছিল ২ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে তা ৬৭ দশমিক ০৪ শতাংশ কমে ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলারে নেমে এসেছে। আগের বছরের একই প্রান্তিকের ৫ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার ডলারের তুলনায় এ প্রবাহ কমেছে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে আন্তপ্রতিষ্ঠান ঋণ বাবদ মোট অর্থপ্রবাহ ছিল ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। তবে একই সময়ে এ খাতে অর্থের বহিঃপ্রবাহও ছিল উল্লেখযোগ্য, যার পরিমাণ ৩২ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। ফলে আন্তপ্রতিষ্ঠান ঋণ থেকে নিট বিদেশি বিনিয়োগে অবদান সীমিত থেকেছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে আগে থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো অর্জিত মুনাফার একটি অংশ পুনর্বিনিয়োগ করছে। কিন্তু নতুন বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। কারণ, নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে সরাসরি নতুন বিদেশি মূলধন আসে। এ খাতে ধারাবাহিক দুর্বলতা নতুন প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের ঋণমান বা সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বারবার কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটি দেশের ঋণমান ও আর্থিক ঝুঁকি বিবেচনা করেন। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণের হারও দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে।

এসব কারণে নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাদের মতে, বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের ফলে মোট এফডিআইয়ের পরিমাণ বাড়লেও নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগের দুর্বলতা দেশে নতুন বিদেশি মূলধন আকর্ষণের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের বিষয়টি সামনে আনছে।

টিএই/এএস