Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

রেমিট্যান্স-রিজার্ভে স্বস্তি, জ্বালানি-মূল্যস্ফীতিতে বাড়ছে চাপ

মহিউদ্দিন রাব্বানি

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৯ এএম

 

  • রেমিট্যান্স ৮.০২ বিলিয়ন ডলার, রিজার্ভ ৩৬.৩২ বিলিয়ন
  • ৮.২৬% মূল্যস্ফীতির বিপরীতে মজুরি বেড়েছে ৮.০৫%
  • জ্বালানির দামে রেকর্ড, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়ের শঙ্কা
  • ‘বড় সরবরাহ পুশ’ ছাড়া মূল্যস্ফীতি কমানো কঠিন: আবদুর রাজ্জাক

রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম পৌনে তিন মাসে প্রবাসী আয় এসেছে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে বৈদেশিক খাতের এই স্বস্তির বিপরীতে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয়, দুর্বল বিনিয়োগ ও ব্যাংক খাতের চাপ এখনো রয়ে গেছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ায় উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৮ দশমিক ০২২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৭ দশমিক ০৬৪ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৩ দিনেই এসেছে ২ দশমিক ১৯৬ বিলিয়ন ডলার।

রেমিট্যান্সের এই প্রবাহের সঙ্গে বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতও। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৬ সেপ্টেম্বরের হিসাবে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময়ের তুলনায় পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এই স্বস্তি এখনো অর্থনীতির সবখানে পৌঁছায়নি। কারণ, রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স বাড়লেও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ব্যবসার উৎপাদন খরচ কমছে না।

রেমিট্যান্সে রেকর্ড, রিজার্ভেও পুনরুদ্ধার

রেমিট্যান্সের প্রবাহে গত অর্থবছরও শক্তিশালী ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়তে থাকে।

চলতি অর্থবছরেও সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই ও আগস্ট মিলিয়ে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৫ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বরের ২৩ দিন পর্যন্ত আরও ২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার এসেছে। ফলে অর্থবছরের শুরু থেকে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি এখনো দুই অঙ্কে রয়েছে।

রেমিট্যান্স বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ছে। এতে আমদানি দায় মেটানো এবং বৈদেশিক লেনদেন সামলানোর সক্ষমতা কিছুটা শক্তিশালী হচ্ছে। মুডিসও বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করার সময় শক্তিশালী রিজার্ভ ও রেকর্ড রেমিট্যান্সকে ইতিবাচক কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে রেমিট্যান্সের এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এখনো বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে। জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় বাড়লে রেমিট্যান্স থেকে আসা ডলারের ওপরও চাপ তৈরি হবে।

মূল্যস্ফীতি কমেছে, স্বস্তি পুরোপুরি ফেরেনি

মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও কিছুটা উন্নতির চিত্র রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠেছিল। অর্থাৎ মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ১৬ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে।

তবে মূল্যস্ফীতি কমলেও পণ্যের দাম কমে যাওয়ার অর্থ এটি নয়। বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা জুলাইয়ে ছিল ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আগস্টে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ২৬ শতাংশের বিপরীতে মজুরি বেড়েছে কিছুটা কম হারে। এতে আয় করা মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতায় চাপ থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

ফলে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে স্বস্তি এলেও সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক স্বস্তি কতটা ফিরেছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

নতুন চাপ জ্বালানি তেলে

এর মধ্যে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা করা হয়েছে। কেরোসিনের দামও ১৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ টাকা করা হয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি কৃষি, শিল্প, নির্মাণ ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ে। ফলে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি আগামী মাসগুলোতে নতুন করে মূল্যচাপ তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় একসঙ্গে বাড়ে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি বাজারে পণ্য পৌঁছানোর ব্যয়ও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর একটি অংশ ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে।

প্রবৃদ্ধি বাড়লেও গতি নিয়ে প্রশ্ন

অর্থনীতির এই টানাপোড়েনের মধ্যে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও প্রত্যাশার তুলনায় কমছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। জুলাইয়ে সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

অর্থাৎ গত অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়তে পারে, কিন্তু পুনরুদ্ধারের গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। এডিবির হিসাবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে আছে।

একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের গতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ফিরছে না। ফলে অর্থনীতির বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ দুই অংশে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।

রিজার্ভ বাড়ছে, কিন্তু বিনিয়োগ কতটা বাড়ছে?

অর্থনীতির জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো, রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের উন্নতি কতটা উৎপাদন ও বিনিয়োগে রূপ নিচ্ছে। রিজার্ভ বাড়ার অর্থ হলো বৈদেশিক লেনদেন সামলানোর সক্ষমতা বাড়ছে। কিন্তু এর সঙ্গে যদি মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি, নতুন কারখানা, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগ না বাড়ে, তাহলে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা শক্তিশালী হবে না।

সাম্প্রতিক তথ্যেও বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতার বিষয়টি উঠে আসছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও মূলধন সংকটের পাশাপাশি উচ্চ ঋণব্যয় উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে সতর্ক করে রাখছে। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তাও শিল্প খাতের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।

সামনে বড় পরীক্ষা মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগে

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন একই সঙ্গে স্বস্তি ও চাপের দুটি চিত্র দেখা যাচ্ছে। রেমিট্যান্স বাড়ছে, রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং বৈদেশিক লেনদেনের সক্ষমতা আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি এবং জ্বালানি তেলের নতুন মূল্যবৃদ্ধি সামনে আরও চাপ তৈরির ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

এডিবি চলতি অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। ফলে বর্তমান ৮ দশমিক ২৬ শতাংশের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও আগামী মাসগুলোতে জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয়ের প্রভাব কতটা পড়ে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

অর্থনীতির জন্য তাই এখন শুধু রেমিট্যান্স বা রিজার্ভ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। এই বৈদেশিক স্বস্তিকে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বৈদেশিক খাতের স্বস্তি যদি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির গতি বাড়াতে পারে, তবেই চলমান পুনরুদ্ধার আরও টেকসই হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও সতর্ক হওয়ার দরকার। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সরকারের ব্যয় নীতিতে আরও সতর্কতা প্রয়োজন ছিল। অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

তারা বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের আরও সতর্ক ও সংযত নীতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল। সরকার যে ধরনের আর্থিক সম্প্রসারণমূলক নীতি নিচ্ছে, তারও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব থাকবে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ পদ্ধতি নেওয়া উচিত ছিল, আমরা হয়তো সেভাবে নিতে পারিনি।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকায় সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি এখনই বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর জন্য বড় ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন।

তারা বলছেন, চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি এভাবে উচ্চ থাকা খুবই অস্বাভাবিক। মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এখন একটা বড় ধরনের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ দরকার। প্রথমত, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে কতটা পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব এবং সেই পণ্য কত দ্রুত বাজারে আনা যায়, সেটা দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিবেশী দেশ—ভারত, পাকিস্তান কিংবা আরও কিছুটা দূরের থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার বাজারে পণ্যের দাম কেমন, তা নিয়মিত তুলনা করতে হবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলেপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক ঢাকা মেইলকে বলেন, রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের পরিস্থিতি ইতিবাচক হলেও জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে প্রয়োজনের সময় দ্রুত জ্বালানি আমদানি করে দেশে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যাও জ্বালানি সরবরাহে কিছুটা জটিলতা তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক গবেষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘রিজার্ভ ভালো হচ্ছে, কিন্তু এটাকে আরও মজবুত করতে হবে—এটা সত্যি কথা। জ্বালানির ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছেই। যেহেতু বৈশ্বিকভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে, সেটাই একটি বড় বিষয়। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। ফলে অনেক সময় দ্রুত জ্বালানি কেনা এবং দেশে নিয়ে আসাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এলএনজি টার্মিনালে কিছু কারিগরি সমস্যার কারণেও আমাদের কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে।’

অন্তবর্তী সরকারের সময়ে গঠিত অর্থনৈতিক টাস্কফোর্সের সদস্য আবদুর রাজ্জাক বলেন, দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে আরও বেশি জ্বালানি আমদানি করতে হবে। এতে আমদানি ব্যয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হলে সামগ্রিক আমদানি বিলও বেড়ে যাবে।

ঢাবির সাবেক এই  শিক্ষক বলেন, সামনের দিনগুলোতে, হয়তো এ বছর বা আগামী বছর থেকে আমাদের আরও বেশি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। যেমন সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সম্প্রসারণ করা যায় কি না, সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন। এতে কিছুটা হলেও জ্বালানির ওপর চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। সরকারের জন্য এখন একটি মধ্যমেয়াদি নীতি জরুরি—কোন কোন ক্ষেত্রে জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ করা যায়, তা দ্রুত নির্ধারণ করতে হবে।

মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকরভাবে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয়নি। জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

‘মূল্যস্ফীতি আমরা কমাতে পারছি না। এখন আবার তেলের দাম বাড়ছে, ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ পড়বে। মূল্যস্ফীতি এত বেশি থাকার একটি কারণ হলো আমরা পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছি না। স্বাভাবিক সময়ে এ ধরনের পরিস্থিতিতে বেশি বেশি আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো গেলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমানো সম্ভব।’

রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হলেও আমদানি নীতির ক্ষেত্রে এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে উল্লেখ করে আবদুর রাজ্জাক বলেন, প্রতিষ্ঠিত অনেক আমদানিকারক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সংকটে থাকায় বাজারে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন আমদানিকারকেরা প্রয়োজনীয় পরিমাণে পণ্য এনে বাজারে সরবরাহ করতে না পারলে সংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে। রিজার্ভ ভালো হলেও এখনো এমন পর্যায়ে যাওয়া হয়নি যে আমদানির ক্ষেত্রে সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা সতর্কতা তুলে দেওয়া যায়। যারা প্রতিষ্ঠিত আমদানিকারক ছিলেন, তাদের অনেকের ব্যবসা-বাণিজ্য এখনো নানা সমস্যার মধ্যে আছে। অন্যদিকে নতুন আমদানিকারকেরা যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে পণ্য এনে বাজারে সরবরাহ করতে না পারেন, তাহলে এই সমস্যা থেকেই যাবে।

বাজারে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেশনের মতো বিষয়ও মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

তার ভাষায়, দেশের মধ্যে পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থায় অনেক সমস্যা আছে। চাঁদাবাজি আছে, সিন্ডিকেশন আছে। অনেক সময় যে দাম হওয়ার কথা নয়, তার চেয়ে বেশি দাম বাড়ানো হয়।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিবেশী দেশগুলোর বাজারদরের সঙ্গে বাংলাদেশের দামের তুলনা করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। আবদুর রাজ্জাক বলেন, কাছাকাছি দেশগুলোর বাজারে একই পণ্যের দাম তুলনামূলক কম হলে বাংলাদেশের বাজারে কেন বেশি—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশই তাদের প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে পণ্যের দাম তুলনা করে। আমাদেরও সেটা করা উচিত। ভারত যদি কোনো পণ্যের দাম কম থাকে, তাহলে বাংলাদেশে সেই পণ্যের দাম কেন বেশি হবে—এটা দেখতে হবে। মুদ্রা বিনিময় হারের পার্থক্য বাদ দিলে দুই দেশের বাজারদর মোটামুটি কাছাকাছি থাকার কথা।

তিনি আরও বলেন, যদি ভারতে মূল্যস্ফীতির হার কম থাকে এবং দুই দেশের মানুষের ভোগের পণ্যও অনেকটা একই ধরনের হয়, তাহলে আমাদের এখানে মূল্যস্ফীতি এত বেশি কেন—এটা বিশ্লেষণ করা দরকার। প্রয়োজন হলে কাছের দেশগুলো থেকে আরও বেশি আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। পেঁয়াজ, মরিচসহ বিভিন্ন পণ্য ভারত থেকে আমদানি করা সম্ভব। কাছের দেশ থেকে আমদানি করলে পরিবহন ব্যয়ও তুলনামূলক কম হয়।

দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নির্ভর করে তাৎক্ষণিকভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ উৎপাদন বাড়াতে নতুন মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি, পর্যাপ্ত জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ এবং বিনিয়োগ প্রয়োজন।

আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘অনেকে মনে করেন, আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে ঠিক হতে পারে। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে গেলে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হবে। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি ও গ্যাসও প্রয়োজন, যা এই মুহূর্তে আমাদের নেই। তাই আজকে উৎপাদন বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এটি একটি মধ্যম থেকে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।’

আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আপনি বলতে পারেন, আমরা সুদের হার বাড়িয়ে রাখছি—অনেকদিন সেটি ছিল। কিন্তু এর সঙ্গে অন্যান্য পরিপূরক নীতি, যেমন সরকার কম খরচ করতে পারে কি না, ব্যাংক থেকে সরকারের কম ঋণ নেওয়া যায় কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া দরকার ছিল। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের দুর্বল ব্যাংকগুলোকে এখনো তারল্য সহায়তা দিতে হচ্ছে। এটিও অর্থ সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি করছে।

তার মতে, জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো, প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি সহজ করা এবং জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত নীতি প্রয়োজন।

এমআর/এএস