মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম
দেশে কার্ডের বিস্তারের সঙ্গে ক্যাশলেস তথা নগদবিহীন লেনদেনও দ্রুত বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা ৯৭ শতাংশ বেড়ে ৫ কোটি ২৪ লাখ ছাড়িয়েছে। একই সময়ে এসব কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। তবে ডিজিটাল লেনদেনের এই সম্প্রসারণের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, প্রতারণা, আর্থিক জ্ঞানের ঘাটতি ও নগদনির্ভরতার মতো চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে গত পাঁচ বছরে কার্ডের ব্যবহার, দেশীয় লেনদেন, বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যবহার এবং বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের কার্ড ব্যবহারের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্টে দেশে মোট কার্ড ছিল ২ কোটি ৬৫ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৯টি। এর মধ্যে ডেবিট কার্ড ২ কোটি ৩৮ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৮টি, ক্রেডিট কার্ড ১৭ লাখ ৪৬ হাজার ৭৬৩টি এবং প্রিপেইড কার্ড ৯ লাখ ৮১ হাজার ১৫৮টি।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে মোট কার্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৯৭টিতে। এর মধ্যে ডেবিট কার্ড ৪ কোটি ৬ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৫টি, ক্রেডিট কার্ড ২৭ লাখ ২ হাজার ৬৯৩টি এবং প্রিপেইড কার্ড ৯০ লাখ ৮১ হাজার ৩২৯টি। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১৬৮ শতাংশ। একই সময়ে ডেবিট কার্ড ৩৬ শতাংশ এবং ক্রেডিট কার্ড ২৮ শতাংশ বেড়েছে।
কার্ডের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি লেনদেনেও বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২১ সালের আগস্টে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডে মোট লেনদেন ছিল ২২ হাজার ৭৮৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৪৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ফলে পাঁচ বছরে কার্ড লেনদেন বেড়েছে ১০৮ শতাংশ।
জুলাইয়ে দেশে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৩২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আগের মাস জুনে এ পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের সবচেয়ে বড় অংশ হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে, ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা বা মোটের ৫০ দশমিক ৩১ শতাংশ। খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ৪৮৭ কোটি ৯০ লাখ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধে ৩৭৭ কোটি ১০ লাখ এবং নগদ উত্তোলনে ৩৩৪ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
জুলাইয়ে দেশীয় ক্রেডিট কার্ডের ৯০ দশমিক ৬৯ শতাংশ লেনদেন হয়েছে পণ্য ও সেবা কেনাকাটায়। নগদ উত্তোলনের অংশ ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং অর্থ স্থানান্তরের অংশ ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। কার্ডভিত্তিক লেনদেনে ভিসার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি; জুলাইয়ে দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের ৭৬ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে ভিসা কার্ডে।
বিদেশেও বাংলাদেশি কার্ডধারীদের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। জুলাইয়ে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডে বিদেশে মোট ১৭ লাখ ৪৪ হাজার ৩০টি লেনদেন হয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ ৯৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৫২৫ কোটি ৯০ লাখ, ডেবিট কার্ডে ৪০১ কোটি ১০ লাখ এবং প্রিপেইড কার্ডে ৫৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
বিদেশে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, ৯৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। এরপর থাইল্যান্ডে ৬১ কোটি ৪০ লাখ, যুক্তরাজ্যে ৫৪ কোটি ৪০ লাখ এবং সিঙ্গাপুরে ৩৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। ডেবিট কার্ডেও যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি, ৫৩ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
অন্যদিকে বিদেশে ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে জুলাইয়ে বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকেরা ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৪টি লেনদেন করেছেন, যার পরিমাণ ২৩৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। লেনদেনের সংখ্যার হিসাবে বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যবহার বিদেশিদের বাংলাদেশে ব্যবহারের তুলনায় প্রায় ৪ দশমিক ২০ গুণ। বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ড ব্যবহারের সবচেয়ে বড় অংশ হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে, ৮২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। নগদ উত্তোলনে ৫৬ কোটি ৩০ লাখ এবং পরিবহনে ৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই সময়ে দেশে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার ৪০ দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে দেশের বাইরে ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন বেড়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের কার্ড ব্যবহারের ব্যয় বেড়েছে ২৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ৪৮টি তফসিলি ব্যাংক ও একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডে অনুমোদিত মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বকেয়া বা স্থিতি রয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে কার্ড ব্যবহারের প্রবৃদ্ধিকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গ্রামাঞ্চলে সীমিত ডিজিটাল অবকাঠামো, আর্থিক জ্ঞানের ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা ও প্রতারণার ঝুঁকি, ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর আস্থার ঘাটতি, নগদনির্ভরতা এবং তুলনামূলক বেশি লেনদেন ব্যয়কে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি ঢাকা মেইলকে বলেন, কার্ডের লেনদেন প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তরের দিকে আরও অগ্রসরমানের ইঙ্গিত বহন করে। তবে ক্যাশলেস লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার পরিমাণ ও ধরনও বড় হতে পারে। তাই এখানে মূল চ্যালেঞ্জ শুধু লেনদেন বাড়ানো নয়, প্রতিটি লেনদেনকে নিরাপদ করা। বিশেষত রিয়েল-টাইম ফ্রড শনাক্তকরণ, পরিচয় যাচাই, ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা এবং গ্রাহক সচেতনতাসহ সার্বিক বিষয়ে গুরুত্ব বাড়াতে হবে। এছাড়া বর্তমান বাস্তবতায় ক্যাশলেস অর্থনীতির প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কার্ডের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রতারণা প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার এবং গ্রাহকদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল লেনদেন নিশ্চিত করা গেলে নগদনির্ভরতা কমিয়ে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের বিস্তার আরও বাড়তে পারে।
টিএই/জেবি