Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

অপমানের জবাব সাফল্যে, আন্তর্জাতিক ফিনটেক অঙ্গনে তানভীর

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম

একসময় থাকার জন্য অন্যের দরজায় দাঁড়াতে হয়েছে তাকে। স্বজনদের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে অপমানের কথা। কখনো ঘরের এক কোণে রাত কাটিয়েছেন, কখনো টিউশন শেষে ফিরে খাবার পাননি। এমনও দিন গেছে, টিউশন থেকে ফিরে দেখেছেন বাড়ির বাইরে পড়ে আছে তার কাপড়চোপড়ের ব্যাগ। জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল—সেখানে আর থাকা যাবে না।

জীবনের সেই কঠিন সময় পেরিয়ে আজ আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশের সৈয়দ তানভীর আহমেদ। ওমানভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ডিবি ইনভেস্টিং গ্রুপের গ্রুপ জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে তার দায়িত্ব এখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত।

তবে তানভীরের এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। বাবাকে হারানোর শোক, আর্থিক সংকট, আশ্রয় হারানোর কষ্ট, স্বজনদের অপমান এবং বিপুল অর্থের দায়—সবকিছুর মধ্য দিয়েই তাকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। আর প্রতিকূলতার সেই অভিজ্ঞতাগুলোকে ধীরে ধীরে নিজের শক্তিতে পরিণত করেছেন তিনি।

তানভীরের জীবনের কঠিন অধ্যায়ের শুরু বাবাকে হারানোর মধ্য দিয়ে। কিডনি রোগে বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ভেঙে পড়ে। পড়াশোনা চালিয়ে নিতে শুরু করেন টিউশন। একপর্যায়ে আশ্রয় নেন নানাবাড়িতে।

তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানেও স্বস্তি মেলেনি। থাকার জায়গা নিয়ে অনিশ্চয়তা, পারিবারিক টানাপোড়েন ও নানা অপমানের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হয়েছে তাকে। কখনো ঘরের এক কোণে রাত কাটিয়েছেন, কখনো টিউশন বা কোচিং থেকে ফিরে খাবারও পাননি।

একপর্যায়ে সেই আশ্রয়ও হারাতে হয় তাকে। তানভীরের জীবনের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতিগুলোর একটি সেই দিনটির। টিউশন শেষে বাড়ি ফিরে দেখেন, বাড়ির বাইরে পড়ে আছে তার কাপড়চোপড়ভরা একটি ব্যাগ। তার দাবি, আপন মামারা তাকে জানিয়ে দেন—সেখানে আর থাকা যাবে না।

বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন প্রতিবেশীরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদলায়নি। তানভীরের ভাষ্য, পারিবারিক সম্পত্তি ও আর্থিক পাওনা নিয়ে টানাপোড়েনও সে সময় সামনে আসে। তার বাবার পাওনা অর্থ এবং মায়ের প্রাপ্য অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলায় পরিবারের একাংশের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলেও তিনি মনে করেন।

আরও পড়ুন

এমবিবিএসের চার পরীক্ষাতেই প্রথম হওয়া ডা. আফিফের গল্প

এর মধ্যেই জীবনে আসে আরেকটি বড় সংকট। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা সংগ্রহ করে এক বন্ধুর হাতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য দিয়েছিলেন তানভীর। কিন্তু ওই বন্ধু টাকা নিয়ে বিদেশে চলে গেলে পুরো দায় এসে পড়ে তার ওপর।

পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি তা করেননি। বরং নিজেই সেই অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব নেন। একদিকে থাকার জায়গা নেই, অন্যদিকে বিপুল অর্থের দায়—সব মিলিয়ে তখন তার সামনে ছিল অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এরপরও থেমে যাননি তিনি।

আশ্রয় হারানোর পর ঢাকায় এসেও থাকার সংকটে পড়তে হয় তানভীরকে। জীবনের এক পর্যায়ে ঢাকার রাস্তায় ও ফুটপাতে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতাও হয়েছে তার। কিন্তু পরিস্থিতিকে নিজের ভবিষ্যতের নিয়তি হিসেবে মেনে নেননি। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লড়াইও অব্যাহত রাখেন।

DB

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন্যান্সে এমবিএ সম্পন্ন করার পর শুরু হয় তার পেশাগত জীবনের নতুন অধ্যায়। কর্মজীবনের শুরুতে সেলস ও ব্যবসা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। জিএমআইতে বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করার পর জারা এফএক্সে সেলস ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তী সময়ে ওয়ানরয়্যাল-এ যোগ দিয়ে আঞ্চলিক ব্যবসা উন্নয়ন, কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং নতুন বাজার তৈরির কাজে যুক্ত হন। ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ব্যবসা সম্প্রসারণের অভিজ্ঞতা তার পেশাগত পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে। প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি আঞ্চলিক ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আরও পড়ুন

হতাশা কাটিয়ে সফল ফ্রিল্যান্সার শাহিনুর

২০২৫ সালে ফোর্বস মধ্যপ্রাচ্যের একটি ফিচারে ওমানের বাজারে ওয়ানরয়্যালের কার্যক্রম এবং সেখানে তানভীরের নেতৃত্বের ভূমিকা উঠে আসে।

২০২৬ সালে তার ক্যারিয়ারে আসে নতুন মোড়। ডিবি ইনভেস্টিংয়ে চিফ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসেবে যোগ দেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের দায়িত্ব পান। যোগদানের কয়েক মাসের মধ্যেই তার দায়িত্বের পরিধি আরও বাড়ে। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির গ্রুপ জেনারেল ম্যানেজার।

একসময় নিজের থাকার জন্য অন্যের দরজায় দাঁড়াতে হয়েছে যাকে, আজ তার দায়িত্ব একাধিক আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের নেতৃত্ব দেওয়া। একসময় স্বজনদের অপমান-অবহেলার কারণে যাকে আশ্রয় ছাড়তে হয়েছিল, আজ তিনি নিজের পেশাগত পরিচয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত।

তানভীরের গল্প কেবল একজন ফিনটেক পেশাজীবীর ক্যারিয়ার সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। আশ্রয় হারানোর কষ্ট, প্রিয়জনকে হারানোর শোক, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিপুল অর্থের দায় এবং অপমান—সবকিছুকে তিনি পরিণত করেছেন এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণায়।

মানুষের জীবনে কিছু অপমান এমন দাগ রেখে যায়, যা সহজে মুছে যায় না। তানভীরও হয়তো সেই দাগ মুছে ফেলতে পারেননি। তবে সেই অভিজ্ঞতাগুলোকে তিনি নিজের শক্তিতে পরিণত করেছেন।

জেবি