Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম মজুরি বৃদ্ধি, চাপে শ্রমজীবী মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম

দেশে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না শ্রমজীবী মানুষের মজুরি। আগস্টে জাতীয় পর্যায়ে মজুরি বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। একই সময়ে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ আগস্টে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০ দশমিক ২১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম ছিল।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আগস্ট  মাসের ভোক্তা মূল্যসূচক, মূল্যস্ফীতি ও মজুরি হার সূচকের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি বিবিএসের মূল্য ও মজুরি পরিসংখ্যান শাখা প্রকাশ করেছে।

বিবিএসের হিসাবে, আগস্টে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১৫১ দশমিক ৬৪। জুলাইয়ে এ সূচক ছিল ১৪৮ দশমিক ২১। এক মাসের ব্যবধানে সাধারণ মূল্যসূচক বেড়েছে ২ দশমিক ৩১ শতাংশ। আর এক বছর আগের আগস্টের তুলনায় সাধারণ মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।

অন্যদিকে জাতীয় মজুরি হার সূচক আগস্টে দাঁড়িয়েছে ১৪০ দশমিক ১৫। জুলাইয়ে এ সূচক ছিল ১৩৯ দশমিক ৪৮। এক বছরের ব্যবধানে আগস্টে মজুরি বৃদ্ধির হার হয়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে মজুরি সূচক বেড়েছে শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ।

এই দুই সূচক পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, আগস্টে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির হার মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি ছিল। ফলে নিম্ন মজুরির শ্রমিকদের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় একই আয়ে কম পণ্য ও সেবা কেনার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার চাপ রয়েছে। তবে বিবিএসের মজুরি হার সূচকটি সব ধরনের চাকরি বা কর্মসংস্থানের বেতনকে নির্দেশ করে না। এই সূচক মূলত নিম্ন মজুরির দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মজুরি পরিবর্তন পরিমাপ করে।

বিবিএস জানিয়েছে, মজুরি হার সূচক তৈরিতে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের মোট ৬৩টি পেশার তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর মধ্যে কৃষি খাতের ১৭টি, শিল্প খাতের ৩০টি এবং সেবা খাতের ১৬টি পেশা রয়েছে। সূচকটির ভিত্তিবছর ২০২১-২২।

মজুরি সূচকের তথ্য সংগ্রহ করা হয় দেশের ৬৪ জেলা থেকে। জেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের মাধ্যমে খাদ্যসহ এবং খাদ্য ছাড়া দিনমজুরদের মজুরি তথ্য সংগ্রহ করে বিবিএস। এরপর বিভিন্ন পেশা ও বিভাগের তথ্যের ভিত্তিতে মজুরি সূচক তৈরি করা হয়।

খাতভেদেও মজুরি বৃদ্ধিতে পার্থক্য রয়েছে। আগস্টে কৃষি খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে আগস্টে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। তবে মৎস্য খাতে এই হার ছিল তুলনামূলক কম, ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

শিল্প খাতে আগস্টে মজুরি বৃদ্ধির হার হয়েছে ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। শিল্প খাতের মধ্যে উৎপাদন খাতে আগস্টে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং নির্মাণ খাতে ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

সেবা খাতেও আগস্টে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের কিছুটা ওপরে ছিল। এ খাতে আগস্টে মজুরি বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ফলে তিনটি প্রধান খাতের মধ্যে আগস্টে কৃষি খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ, শিল্পে ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং সেবায় ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে।

এদিকে পণ্য ও সেবার বিভিন্ন শ্রেণিতে মূল্যস্ফীতির চাপ একরকম নয়। আগস্টে জাতীয় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। জুলাইয়ে তা ছিল ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি আগস্টে বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা জুলাইয়ের ৯ দশমিক ২৮ শতাংশের চেয়ে বেশি।

আরও পড়ুন

পে স্কেলে স্বস্তি, বাজার নিয়ে নতুন শঙ্কা

খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতির মধ্যে পোশাক ও জুতার ক্ষেত্রে আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। বাসস্থান, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

পরিবহন খাতে এ হার ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং যোগাযোগ খাতে ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। শিক্ষা খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

অন্যদিকে রেস্তোরাঁ ও হোটেল খাতে আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। বিবিধ পণ্য ও সেবায় মূল্যস্ফীতি ছিল আরও বেশি, ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনযাপনের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ও আনুষঙ্গিক খাতে মূল্য বৃদ্ধির চাপ জাতীয় গড় মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি ছিল।

গ্রাম ও শহরের মধ্যেও মূল্যস্ফীতির পার্থক্য রয়েছে। আগস্টে গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। শহর এলাকায় এ হার ছিল ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। অর্থাৎ আগস্টে শহরের তুলনায় গ্রামে মূল্যস্ফীতির চাপ শূন্য দশমিক ১১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি ছিল।

Bazar3

গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ফলে উভয় ক্ষেত্রেই খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্য বৃদ্ধির চাপ খাদ্যের তুলনায় বেশি ছিল।

মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও অঞ্চলভেদে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। আগস্টে ঢাকা বিভাগে সাধারণ মজুরি সূচক ছিল ১৩৭ দশমিক ৫৬ এবং এক বছরের ব্যবধানে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ।

রাজশাহী বিভাগে আগস্টে সাধারণ মজুরি সূচক দাঁড়িয়েছে ১৩৯ দশমিক ৪৬। এক বছরের ব্যবধানে এ অঞ্চলে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ। কৃষি খাতে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং শিল্প খাতে ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

তবে মজুরি হার সূচকের তথ্যকে দেশের সব চাকরিজীবীর বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। বিবিএস স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই সূচকে বেতনভুক্ত এবং উচ্চ চুক্তিভিত্তিক আয়ের কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এখানে মূলত নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টায় দৈনিক মজুরি বা ঘণ্টাভিত্তিক আয় করা নিম্ন মজুরির শ্রমিকদের তথ্য বিবেচনা করা হয়।

আরও পড়ুন

বাজেটের প্রতিশ্রুতি অধরা, মূল্যস্ফীতিতে দিশেহারা মানুষ

বিবিএসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মজুরি হার সূচক মূলত সময়ের সঙ্গে নিম্ন মজুরির দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মজুরির পরিবর্তন পরিমাপ করে। ৬৩টি পেশার মজুরি তথ্যের পাশাপাশি আট বিভাগের ওজন বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় মজুরি সূচক তৈরি করা হয়। এ তথ্যের ওজন নির্ধারণে শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭সহ বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির এই ব্যবধান শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশের বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। তবে মজুরি সূচকের আওতাভুক্ত নির্দিষ্ট পেশার শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বেড়েছে, তা নির্ধারণে শুধু জাতীয় মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির হার যথেষ্ট নয়। কারণ ব্যক্তি ও পরিবারের ব্যয়ের ধরন, আয়, পেশা এবং ভোগের পণ্যভেদে মূল্যস্ফীতির প্রভাব আলাদা হতে পারে।

বিবিএসের তথ্য বলছে, আগস্টে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। জুলাই পর্যন্ত ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতিও ছিল ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ, মে পর্যন্ত ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং জুন পর্যন্ত ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬ শতাংশের আশপাশে রয়েছে।

অন্যদিকে বিবিএসের মজুরি সূচকের দীর্ঘমেয়াদি তথ্যেও দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় সাধারণ মজুরি সূচকের বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও একই হার ছিল ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

ফলে সাম্প্রতিক সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার মোটামুটি ৮ শতাংশের ঘরে থাকলেও মূল্যস্ফীতির চাপ একই সময়ে ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধির হার জাতীয় মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেশি হওয়ায় শ্রমজীবী মানুষের ওপর ব্যয়ের চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এএইচ/জেবি