নিজস্ব প্রতিবেদক
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৬ এএম
দেশের অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বাড়ছে নাকি কমছে, কিংবা সামনে কোনো ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না, এসব বিষয়ে আগাম ধারণা দিতে পারে পারচেজিং ম্যানেজারস’ ইনডেক্স (পিএমআই)। সরকারি বিভিন্ন অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান প্রকাশের আগেই ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবর্তনের আভাস পাওয়ায় স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে সূচকটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানের মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে উপস্থাপিত প্রেজেন্টেশনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এমসিসিআই ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ যৌথভাবে সেমিনারটির আয়োজন করে।
সেমিনারে যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডাম অ্যাস্পডেন, এমসিসিআইয়ের মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আহাম্মাদ এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হাসনাত আলম উপস্থিত ছিলেন।
পিএমআই মূলত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের গতি ও পরিবর্তন পরিমাপের একটি সূচক। নতুন আদেশ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, উপকরণের দাম, সরবরাহকারীদের পণ্য সরবরাহের সময়, মজুত, অসম্পন্ন আদেশ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এ সূচক তৈরি করা হয়।
জরিপে প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মাসের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি, অপরিবর্তন বা অবনতির কথা জানায়। সাধারণভাবে পিএমআই ৫০-এর ওপরে থাকলে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ এবং ৫০-এর নিচে থাকলে সংকোচন বোঝায়।
পিএমআইয়ের বড় সুবিধা হলো এর দ্রুত প্রকাশ। জিডিপি, শিল্প উৎপাদন কিংবা কর্মসংস্থানের মতো সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশে সময় লাগলেও পিএমআই তুলনামূলক দ্রুত পাওয়া যায়। ফলে অর্থনীতিতে পরিবর্তন শুরু হওয়ার আগেই তার প্রাথমিক সংকেত পাওয়া সম্ভব।
সেমিনারের প্রেজেন্টেশনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পিএমআইয়ের ওঠানামায় অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের ধাক্কার প্রভাবের কথাও তুলে ধরা হয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন, কারফিউ ও ১০ দিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকার প্রভাবে পিএমআই আগের মাসের তুলনায় ২৭ পয়েন্ট কমে ৩৬ দশমিক ৯-এ নেমে আসে। এতে ওই সময়ে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের সংকোচনের চিত্র ফুটে ওঠে।
২০২৫ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে দীর্ঘ সরকারি ছুটি, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কসংক্রান্ত চাপ এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতার প্রভাবে পিএমআই ৮ দশমিক ৮ পয়েন্ট কমে যায়। একই বছরের অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মধ্যে বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হওয়া, রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া এবং জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিনিয়োগ স্থগিত রাখার কারণে সূচক কমে ৭ দশমিক ৮ পয়েন্ট।
চলতি বছরের মে থেকে জুনেও পিএমআই কমেছে। দীর্ঘ ঈদের ছুটি, বর্ষার শুরু, ঈদের আগে চাহিদা কমে যাওয়া এবং নতুন ১৫ শতাংশ ভ্যাটের প্রভাবে সূচক ৯ দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে ৫২ দশমিক ৯-এ দাঁড়ায়। তবে ৫০-এর ওপরে থাকায় ওই সময়ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ইঙ্গিত ছিল।
বাংলাদেশের পিএমআই তৈরিতে প্রতি মাসে কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের মোট ৪০০টি প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে কৃষি খাতের ৪৬টি, উৎপাদন খাতের ৯২টি, নির্মাণ খাতের ৫০টি এবং সেবা খাতের ২১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
নতুন আদেশ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, উপকরণের দাম, সরবরাহকারীদের সরবরাহের সময়, অসম্পন্ন আদেশ ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মতো বিষয়গুলো জরিপে বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ প্রত্যাশারও একটি ধারণা পাওয়া যায়।
সেমিনারে আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, পিএমআইয়ের সঙ্গে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোজোনের ক্ষেত্রে পিএমআই এবং সর্বশেষ জিডিপি অনুমানের মধ্যে ৮২ শতাংশ পর্যন্ত সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মহামারির আগের সময়ে ত্রৈমাসিক পিএমআই এবং জিডিপির প্রথম অনুমানের মধ্যেও এ সম্পর্ক ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত ছিল।
এ কারণে সরকারি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান প্রকাশের আগেই অর্থনীতির সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি বুঝতে পিএমআই ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে চাহিদা, উৎপাদন, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড এবং সরবরাহব্যবস্থায় চাপের মতো বিষয়গুলো দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।
পিএমআইয়ের তথ্য অর্থনীতির সম্ভাব্য দুর্বলতা বা ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে। নতুন আদেশ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ধারাবাহিক দুর্বলতা দেখা দিলে তা অর্থনীতিতে সম্ভাব্য মন্দার সংকেত দিতে পারে। বিপরীতে উৎপাদন ও নতুন আদেশে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
একইভাবে উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়া কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের তথ্য ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির সম্ভাবনাও আগেভাগে বুঝতে সাহায্য করতে পারে। এসব তথ্য মুদ্রানীতি, শিল্পনীতি, বাণিজ্যনীতি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নীতিনির্ধারকদের সহায়তা করতে পারে।
পিএমআই শুধু সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেই নয়, বেসরকারি খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সরবরাহকারী নির্বাচন, দরকষাকষি, উৎপাদন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কৌশল এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানগুলো এ সূচকের তথ্য ব্যবহার করতে পারে।
এ ছাড়া সম্পদ ব্যবস্থাপনা, শেয়ার ও বন্ডবাজার, বৈদেশিক মুদ্রা এবং পণ্যবাজারের প্রবণতা বিশ্লেষণেও পিএমআই সহায়ক হতে পারে। বাজারের চাহিদা, উৎপাদন সক্ষমতা ও সম্ভাব্য ব্যয়চাপ সম্পর্কে দ্রুত ধারণা পাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও এটি কাজে আসতে পারে।
বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধি খাতগুলোর বিষয়ে আরও নির্দিষ্ট ধারণা পেতে খাতভিত্তিক পিএমআইয়ের পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সেমিনারে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সেবা খাতের জন্য আরও বিস্তৃত ও নির্ভরযোগ্য পিএমআই তৈরি করা গেলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে বলে প্রেজেন্টেশনে উল্লেখ করা হয়।
পাশাপাশি ব্যবসায়িক আস্থা সূচকের সঙ্গে পিএমআই সমন্বয় করা গেলে অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা, উভয় দিকের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
সেমিনারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক তথ্যের প্রাপ্যতা, সময়ানুবর্তিতা ও বিশ্লেষণ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিয়মিত ও দ্রুত জরিপের মাধ্যমে অর্থনীতির পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির আগাম তথ্য পাওয়া গেলে নীতিনির্ধারণ আরও তথ্যনির্ভর করা সম্ভব বলে মত দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোজোন, চীন, ভারত ও জাপানের মতো প্রধান অর্থনীতিতে নিয়মিত পিএমআই প্রকাশ ও ব্যবহার করা হয়। সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আন্তর্জাতিক সংস্থা, গবেষক, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা এসব দেশে স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বুঝতে এ সূচক অনুসরণ করেন।
বাংলাদেশের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতেও তাই পিএমআইয়ের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।
অর্থনীতিতে বড় কোনো ধাক্কা এলে সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশের অপেক্ষা না করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দ্রুত পরিস্থিতির আভাস পাওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে খাতভিত্তিক পিএমআইয়ের পরিধি ও তথ্যের মান বাড়ানো গেলে অর্থনৈতিক পূর্বাভাস, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ আরও কার্যকর হতে পারে।
এমআর/এমআই