Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

‘সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ড দুর্ঘটনায় অবহেলা প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা’

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে ট্যাংকারের ব্যালাস্ট ট্যাংক ছিদ্র করার সময় বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

সোমবার (৩১ আগস্ট) শিল্প মন্ত্রণালয়ে দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

গত ১৪ জুন সীতাকুণ্ডের ওই ইয়ার্ডে ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে কর্মরত শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণে সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ট্যাংক ছিদ্র করার সময় শ্রমিকদের গ্যাস মাস্ক বা স্বয়ংসম্পূর্ণ শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। ছুটির দিনে ইয়ার্ডে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারকারী দলও ছিল না। শ্রমিকদের হাজিরা তালিকায়ও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং সিসিটিভি না থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজী বলেন, দুর্ঘটনায় ইয়ার্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় চরম গাফিলতির চিত্র পাওয়া গেছে। তদন্তে ‘দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস, ২০১১’-এর একাধিক বিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি ইয়ার্ডের নিরাপত্তা দলের পেশাগত অবহেলার প্রমাণ মিলেছে। এ কারণে ওয়ার্ড মালিকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।

শিল্পমন্ত্রী বলেন, জাহাজ রিসাইক্লিংয়ের সময় একটি ব্যালাস্ট ট্যাংক ছিদ্র করার পর সেখান থেকে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলে থাকা শ্রমিকরা চেতনা হারান এবং হতাহতের ঘটনা ঘটে।

দুর্ঘটনার পর সরকার সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে আহত শ্রমিকদের চিকিৎসার ব্যবস্থা ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, পরবর্তী ঝুঁকি এড়াতে সেনাবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থল ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

মন্ত্রী আরও বলেন, ব্যালাস্ট ট্যাংক থেকে এ ধরনের প্রাণঘাতী গ্যাস নিঃসরণ করতে পারে, বিষয়টি এর আগে জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্প সংশ্লিষ্টদের জানা ছিল না। দুর্ঘটনার পরপরই বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করা হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, নতুন সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়েছে। তদন্তে কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি প্রমাণিত হলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তদন্ত কমিটির সদস্য ও বুয়েটের অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে অক্সিজেনের ঘাটতিপূর্ণ পরিবেশে পানিতে থাকা সালফেটের সঙ্গে অণুজীবীয় বিক্রিয়ার ফলে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস তৈরি হয়। ট্যাংক থেকে পানি নিষ্কাশন বা কাটার সময় ওই গ্যাস হঠাৎ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এর ঘনমাত্রা ১০০ পিপিএমের বেশি হলে তা জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ডি-ব্লাস্টিং বা পানি নিষ্কাশনের আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ এবং বাতাস ও পানিতে বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি পরীক্ষা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছেন তিনি।

তদন্ত কমিটি আরও সুপারিশ করেছে, শিপইয়ার্ডগুলোতে নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।

এমআর/এফএ