মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম
- শিক্ষার্থীদের আমানত ২ হাজার ২৮ কোটি টাকা
- ৫৩ লাখ ছাড়িয়েছে ব্যাংক হিসাব
- এক মাসে আমানত বেড়েছে ৪ কোটি ৬ লাখ টাকা
- চার মাস ধরে ধারাবাহিক বাড়ছে সঞ্চয়
- এক মাসে নতুন হিসাব ১ লাখ ৪৪ হাজার
- মাত্র ১০০ টাকায় হিসাব খোলার সুযোগ
উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সংসারের ব্যয় বাড়লেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা কমেনি। বরং পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে ব্যাংকে টাকা জমাচ্ছেন তারা। ফলে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব ও আমানতের পরিমাণ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত টানা চার মাস শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবে সঞ্চয় বেড়েছে। একই সময়ে নতুন হিসাব খোলার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস শেষে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। আগের মাস এপ্রিল শেষে এ পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে শিক্ষার্থীদের আমানত বেড়েছে ৪ কোটি ৬ লাখ টাকা।
তবে শুধু মে মাসেই নয়, বছরের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারি শেষে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবে জমা ছিল ১ হাজার ৯৬৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এপ্রিলে বেড়ে হয় ২ হাজার ২৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এরপর মে মাসে তা আরও ৪ কোটি ৬ লাখ টাকা বেড়ে ২ হাজার ২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।
অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে মে—চার মাসে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবে আমানত বেড়েছে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা। মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবারগুলোর ব্যয় যখন বাড়ছে, তখন শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট সঞ্চয় ধরে রাখার প্রবণতা বাড়াকে আর্থিক সচেতনতার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবে থাকা আমানতের বড় অংশই শহরের শিক্ষার্থীদের। মে মাস শেষে শহরের শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবে জমা ছিল ১ হাজার ৪৪১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। আর গ্রামের শিক্ষার্থীদের হিসাবে জমা ছিল ৫৮৭ কোটি ২১ লাখ টাকা।
আমানত বাড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব খোলার প্রবণতাও বাড়ছে। মে মাস শেষে ব্যাংকগুলোতে শিক্ষার্থীদের হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৯৪টি। আগের মাস এপ্রিল শেষে এ সংখ্যা ছিল ৫১ লাখ ৮১ হাজার ৯৮৮টি। অর্থাৎ এক মাসে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬০৬টি।
মে মাস শেষে শিক্ষার্থীদের মোট হিসাবের মধ্যে ছেলেদের হিসাব রয়েছে ২৭ লাখ ১২ হাজার ৮৪৪টি এবং মেয়েদের ২৬ লাখ ১৩ হাজার ৭৫০টি। এপ্রিলে ছেলেদের হিসাব ছিল ২৬ লাখ ৪৪ হাজার ৮৪টি এবং মেয়েদের হিসাব ছিল ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৯০৪টি। ফলে এক মাসের ব্যবধানে ছেলে ও মেয়ে উভয় শিক্ষার্থীর হিসাবই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং কার্যক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয় ও অর্থ ব্যবস্থাপনার অভ্যাস গড়ে তুলতে ২০১০ সালে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কার্যক্রম শুরুর পরের বছর, অর্থাৎ ২০১১ সাল থেকে শিক্ষার্থীরা এ ধরনের হিসাবে অর্থ জমা রাখার সুযোগ পায়। ওই বছর ২৯ হাজার ৮০টি স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয়েছিল।
বর্তমানে দেশের ৫৯টি ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শুরুতে ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা এ হিসাব খোলার সুযোগ পেত। তবে চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন নির্দেশনা জারি করে শিক্ষার্থী ব্যাংক হিসাব খোলার বয়সসীমা বাড়িয়ে ২৫ বছর করে। এর ফলে স্কুল পর্যায়ের পাশাপাশি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও এ ব্যবস্থার আওতায় আসার সুযোগ পেয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নতুন নির্দেশনা জারির পর চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেই ১৩ লাখ ৪২ হাজার শিক্ষার্থী নতুন করে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বয়সসীমা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং সুবিধাও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ফলে হিসাব খোলার প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিংয়ে উৎসাহিত করতে এসব হিসাবে নানা ধরনের সুবিধা রাখা হয়েছে। স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে বিভিন্ন ধরনের ফি ও চার্জে রেয়াত, বিনামূল্যে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ন্যূনতম স্থিতির বাধ্যবাধকতায় ছাড় এবং স্বল্প খরচে ডেবিট কার্ড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। মাত্র ১০০ টাকা জমা দিয়েও শিক্ষার্থীদের হিসাব খোলার সুযোগ রয়েছে।
এছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর প্রতিটি শাখাকে তাদের আশপাশের অন্তত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় আনার নির্দেশনা দিয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের কাছে ব্যাংকিং সেবা আরও সহজলভ্য হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি ব্যাংকিং সেবা পাওয়া গেলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের হিসাব খোলার আগ্রহ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব বাড়ার পেছনে বিভিন্ন ধরনের বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের ব্যাংক, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সংস্থা প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা দেয়। এসব অর্থের বড় একটি অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলে শিক্ষার্থীদের হিসাবে জমা হয়। ফলে হিসাব খোলার পাশাপাশি এসব হিসাবে আমানতের পরিমাণও বাড়ছে। স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করা এবং অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ঢাকা মেইলকে বলেন, বিভিন্ন উৎসব আয়োজনে শিক্ষার্থীরা স্বজনদের কাছ থেকে উপহার ও সেলামি হিসেবে যে অর্থ পায়, তা যাতে অপচয় বা ক্ষতিকর কাজে ব্যয় না হয়, সে বিষয়েও ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব। উপযুক্ত দিকনির্দেশনা না থাকলে এসব অর্থ অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় হতে পারে। ব্যাংকে টাকা জমা রাখার সুযোগ থাকায় শিক্ষার্থীরা অর্থ সঞ্চয় ও ব্যবস্থাপনার বাস্তব শিক্ষা পাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের ব্যাংকে জমানো অর্থ ভবিষ্যতের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি। কোনো শিক্ষার্থীর কম্পিউটার বা শিক্ষার প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার প্রয়োজন হলে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত থাকলেও নিজের সঞ্চয় থেকে সেই প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট সঞ্চয় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব ও আমানত বাড়ার বিষয়টি শুধু সঞ্চয়ের পরিমাণ বৃদ্ধির হিসাব নয়; এর সঙ্গে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও জড়িত। জীবনের শুরুতেই ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সঞ্চয়, লেনদেন, ডিজিটাল ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন আর্থিক সেবার সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারবেন।
সব মিলিয়ে, মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব ও সঞ্চয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক প্রবণতা। সহজ শর্তে হিসাব খোলার সুযোগ, বয়সসীমা বাড়ানো, বৃত্তি ও উপবৃত্তির অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাংকমুখী হওয়ার সুযোগ বাড়ছে। ছোটবেলা থেকে তৈরি হওয়া এই সঞ্চয়ের অভ্যাস ভবিষ্যতে তাদের ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশের সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ভিত্তিকেও আরও শক্তিশালী করতে পারে।
টিএই/জেবি