Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

‌‘১৮ কোটি মানুষের দেশে গ্রাহকপ্রতি গড় আয় দিয়ে বাজার বোঝা যাবে না’

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম

১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশে মোবাইল বাজারকে শুধু গ্রাহকপ্রতি গড় আয় (এআরপিইউ) দিয়ে মূল্যায়ন করা বাস্তবসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী। তিনি বলেছেন, ইউরোপের মতো তুলনামূলক কম জনসংখ্যার দেশে এআরপিইউ গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে, তবে বাংলাদেশের মতো বৃহৎ বাজারে মোট রাজস্ব ও সামগ্রিক বাজার বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘স্পেকট্রাম ফর এ কানেক্টেড বাংলাদেশ: এনাবলিং ইন্টারনেট ফর অল’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতকে শুধু গ্রাহক বা অপারেটরের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সমস্যার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। বরং মানুষ, ব্যবসা ও সরকার এই তিন পক্ষকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়েই নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। গত দুই বছর ধরে তিনি টেলিযোগাযোগ খাতের সমস্যাকে ‘স্টেকহোল্ডার ট্রায়াঙ্গেল’ হিসেবে দেখার কথা বলে আসছেন, যার তিনটি ভিত্তি হলো মানুষ, ব্যবসা ও সরকার।

সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে এমদাদ উল বারী বলেন, সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো কলড্রপ। তবে কোনো নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শতভাগ সঠিকভাবে পরিচালিত হলেও কলড্রপ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। কারণ এর পেছনে অসংখ্য কারিগরি কারণ রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) মানদণ্ডেও নির্দিষ্ট মাত্রার কলড্রপ গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

তিনি আরও বলেন, দেশে ১৮ কোটি মানুষের ২ শতাংশই প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ। ফলে যার কলড্রপ হচ্ছে, তার কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে গত দুই বছরে দেশে কলড্রপের হার ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা সেবার মানোন্নয়নের ইতিবাচক অগ্রগতি।

ডেটার মূল্য প্রসঙ্গে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের মোবাইল ডেটার দাম বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় এক-দশমাংশ। তবু দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাস্তবতা বিবেচনায় ডেটার মূল্য আরও কমানোর সুযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, মোবাইল অপারেটররা সাধারণত দুটি বিষয় তুলে ধরেন, স্পেকট্রামের উচ্চ মূল্য এবং অপারেটরদের কম এআরপিইউ। তবে বাংলাদেশের বাজার বিশ্লেষণে এআরপিইউকে একমাত্র সূচক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। বরং অপারেটরদের মোট বা গ্রস রাজস্ব বিবেচনা করলে বাজারের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।

চলমান ৮৫০ মেগাহার্টজ জিএসএম ব্যান্ডের স্পেকট্রাম বরাদ্দ প্রসঙ্গে এমদাদ উল বারী বলেন, এই ব্যান্ডে প্রায় ৮ থেকে ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম অব্যবহৃত রয়েছে। এর মধ্যে রবি প্রায় সাড়ে ৩ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম চেয়েছে। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, অন্য কোনো অপারেটরের চাহিদা না থাকলে নির্ধারিত মূল্যে তা বরাদ্দ দেওয়া যাবে। কিন্তু একাধিক অপারেটর আগ্রহ দেখানোয় নিলামের প্রয়োজন দেখা দেয় এবং সে কারণে একটি ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

তিনি জানান, যেহেতু এই স্পেকট্রাম প্রায় তিন বছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাই এর মূল্য কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সাধারণত স্পেকট্রাম ১৫ বছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ফেরতের প্রচলিত হিসাব এখানে প্রযোজ্য নয়।

এ কারণে সরকারের কাছে প্রায় ১০ শতাংশ মূল্য কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে জানান বিটিআরসি চেয়ারম্যান। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় সিগন্যাল ব্যবহারে গুরুতর ইন্টারফেরেন্সের সমস্যা থাকায় ওই অংশের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ২৫ শতাংশ মূল্য ছাড়েরও প্রস্তাব দেওয়া হয়।

রাজস্ব ক্ষতির যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর পর বলা হয়েছে মূল্য কমানো হলে সরকারের রাজস্ব কমে যাবে। কিন্তু নির্ধারিত উচ্চ মূল্যে যদি কোনো অপারেটর স্পেকট্রামই না নেয়, তাহলে সরকার কোনো রাজস্ব পাবে না। তাই শুধু পুরোনো মূল্যের সঙ্গে তুলনা করে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির হিসাব করা বাস্তবসম্মত নয়।

গোলটেবিল বৈঠকে টিআরএনবি সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিন সভাপতিত্ব করেন এবং সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসাইন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, এমটব সভাপতি ও রবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াদ সাতারা, গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান, বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইওহান বুসে, টেলিকম বিশেষজ্ঞ নূরুল কবির এবং এমটব মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ জুলফিকার প্রমুখ।

এএইচ/এফএ